চা-বাগান থেকে ‘মুল্লুকে চলো’—কী ঘটেছিল ১৯২১ সালে

চা-বাগানে কাজ করছে শ্রমিকেরাছবি: সংগৃহীত

সিলেটের সবুজ চা-বাগান বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র। কিন্তু এই সবুজের আড়ালে রয়েছে ঔপনিবেশিক শোষণ, দূরদূরান্ত থেকে শ্রমিক এনে বসতি গড়ানো এবং অধিকার আদায়ের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। উনিশ শতকের মাঝামাঝি বাণিজ্যিক চা চাষের সূচনা থেকে ১৯২১ সালের ‘মুল্লুকে চলো’ আন্দোলন পর্যন্ত প্রায় সাত দশকে সিলেটের চা–বাগানগুলো শুধু একটি অর্থনৈতিক শিল্পে পরিণত হয়নি, এখানে গড়ে উঠেছিল একটি স্বতন্ত্র শ্রমিক সমাজও।

বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ‘সিলেটের মালনীছড়া চা-বাগান ১৮৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং ১৮৫৭ সালে সেখানে বাণিজ্যিকভাবে চা উৎপাদন শুরু হয়।’ সংগঠনটির ইতিহাসবিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, এটিই তৎকালীন পূর্ববঙ্গের বাণিজ্যিক চা–শিল্পের অন্যতম প্রাথমিক কেন্দ্র।

অন্যদিকে বাংলাপিডিয়ার ‘টি ইন্ডাস্ট্রি’ নিবন্ধে বলা হয়েছে, ‘চট্টগ্রামে ১৮৪০ সালে পরীক্ষামূলকভাবে চা চাষ শুরু হলেও সিলেটের সুরমা উপত্যকাই পরে পূর্ববঙ্গের প্রধান চা উৎপাদন অঞ্চলে পরিণত হয়।’

চা-বাগান বাড়তে থাকলেও দেখা দেয় শ্রমিকের সংকট। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বড় অংশকে দীর্ঘ সময়ের চা চাষের কাজে নিয়োগ করা কঠিন হওয়ায় ব্রিটিশ বাগানমালিকেরা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শ্রমিক সংগ্রহ করতে শুরু করেন। গবেষণাভিত্তিক ইতিহাসে ছোটনাগপুর, বিহার, ওডিশা, মধ্যপ্রদেশ ও বর্তমান অন্ধ্র প্রদেশ অঞ্চলের বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে শ্রমিক নিয়োগের কথা পাওয়া যায়। তাঁদের মধ্যে মুন্ডা, সাঁওতাল, ওঁরাও, হো, গন্ডসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষ ছিলেন।

‘টি গার্ডেন কমিউনিটির’ ইতিহাসবিষয়ক সংকলনে এই নিয়োগকে কঠোর চুক্তিনির্ভর শ্রমব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে এবং শ্রমিক সংগ্রহে ‘আরকাট্টি’ বা নিয়োগকারী দালালদের প্রতারণা ও জবরদস্তির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন
শ্রমিকদের মজুরি প্রদান করা হচ্ছে
ছবি: সংগৃহীত

শ্রমিকদের জীবনও ছিল কঠিন। চা–বাগানের সঙ্গে তাঁদের বসতি গড়ে উঠত এবং কাজ, বাসস্থান ও দৈনন্দিন জীবন অনেকাংশে বাগান কর্তৃপক্ষের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ত। ঔপনিবেশিক শ্রমব্যবস্থায় চুক্তি ভঙ্গের জন্য শাস্তির বিধানও ছিল। গবেষণামূলক সূত্রে জানা যায়, ১৮৫৯ সালের ‘ওয়ার্কম্যান’স ব্রিচ অব কন্ট্রাক্ট অ্যাক্ট’-এর কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ‘চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকের পালিয়ে যাওয়া বা কাজ ছেড়ে দেওয়ার ওপর কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা ছিল।’
এ ছাড়া চা–শ্রমিকদের ‘টি টোকেন’ প্রদান করা হতো, যা শুধু তাঁদের নির্দিষ্ট চা–বাগানের সীমানার মধ্যেই ব্যবহার করতে হতো। অর্থাৎ পরিপূর্ণভাবে চা–শ্রমিকদের একই বাগানের মধ্যে বন্দী করে রাখা হচ্ছিল।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই বিশ শতকের শুরুতে চা–শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। ১৯২০ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে তার প্রভাব আসামের চা–বাগান অঞ্চলেও পৌঁছে যায়। ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘১৯২১ সালের মে মাসের শুরুতে কংগ্রেসের উদ্যোগে কাছাড় অঞ্চলে সভা হয় এবং চা–শ্রমিকদের মধ্যে নিজেদের “মুল্লুক”-এ ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আরও সংগঠিত হয়ে ওঠে।’

এই ‘মুল্লুক’ মানে হচ্ছে নিজেদের জন্মস্থান। প্রথম আলোর একই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ‘১ ও ২ মে ১৯২১ কাছাড়ের রাতারবাড়ী বাজারে সভার পর আন্দোলন তীব্র হয়। ৩ মে আনিপুর চা-বাগানের প্রায় ৭৫০ শ্রমিক স্ত্রী-সন্তানসহ বাগান ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন। পরে বিভিন্ন চা-বাগানের শ্রমিক তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল পূর্বপুরুষের ভূমিতে ফিরে যাওয়া। এই প্রত্যাবর্তনের ডাকই শ্রমিকদের ভাষায় পরিচিত হয় “মুল্লুকে চলো” নামে।’ ইতিহাসবিদদের কাছে ঘটনাটি আবার ‘চরগোলা এক্সোডাস’ নামেও পরিচিত।

আন্দোলন দ্রুত বড় আকার ধারণ করে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে সরকারি হিসাব উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ‘চরগোলা ও লঙ্গাই উপত্যকা থেকে ৮ হাজার ৭৯৯ জন শ্রমিক বেরিয়ে এসেছিলেন।’ অন্যদিকে বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন ও ঐতিহাসিক বর্ণনায় বৃহত্তর সিলেটের কাছাড় অঞ্চল থেকে আন্দোলনে অংশ নেওয়া শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ পোস্টের ২০২১ সালের এক প্রতিবেদনেও সিলেট অঞ্চলের প্রায় ৩০ হাজার চা-শ্রমিকের চাঁদপুরের দিকে যাত্রার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন
ঘরমুখী শ্রমিকদের প্রধান গন্তব্য হয়ে ওঠে চাঁদপুর
ছবি: সংগৃহীত

ঘরমুখী শ্রমিকদের প্রধান গন্তব্য হয়ে ওঠে চাঁদপুর। তাঁদের পরিকল্পনা ছিল, সেখান থেকে স্টিমারে নদীপথে এবং পরে রেলপথে নিজেদের পূর্বপুরুষের এলাকায় ফিরে যাওয়া। কিন্তু ব্রিটিশ প্রশাসন ও চা–বাগান মালিকদের স্বার্থে তাঁদের যাত্রা বাধাগ্রস্ত করা হয়। ২০ মে ১৯২১, চাঁদপুরে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক আটকা পড়েন। দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ওই দিন প্রায় ৩ হাজার চা-শ্রমিক চাঁদপুর রেলস্টেশনে অপেক্ষা করছিলেন। পরে তাঁদের সঙ্গে তৎকালীন পুলিশের সংঘর্ষ ও দমন-পীড়ন শুরু হয়।’

চাঁদপুর সেই রাতেই রক্তাক্ত আন্দোলনে পরিণতি পায়। বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও সংবাদসূত্রে ব্রিটিশ বাহিনীর হামলা, গুলিবর্ষণ এবং শ্রমিকদের হতাহতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নিহত শ্রমিকের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলোর মধ্যে ঐকমত্য নেই। সে কারণে ইতিহাসভিত্তিক প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ না করে বলা অধিক নিরাপদ যে বহু শ্রমিক নিহত ও আহত হন এবং অনেকে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন। পরবর্তী সময়ে অনেক শ্রমিককে আবার চা–বাগানে ফিরতে বাধ্য করা হয়।

আরও পড়ুন

‘মুল্লুকে চলো’ তাই কেবল ঘরে ফেরার একটি ব্যর্থ যাত্রা ছিল না, এটি ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক চা চাষ ব্যবস্থায় শ্রমিকদের জীবন, মজুরি, স্বাধীনতা ও মর্যাদার প্রশ্নে এক বৃহৎ প্রতিবাদ। ১৯২১ সালের সেই পদযাত্রা সিলেট ও আসামের চা–শ্রমিকদের ইতিহাসে ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।

সিলেটের চা-বাগানের সবুজ পাতার দিকে তাকালে তাই শুধু একটি কৃষিশিল্পের ছবি দেখা যায় না; বরং উঠে আসে বহু দূর থেকে আনা শ্রমিকদের প্রজন্মের ইতিহাস, তাঁদের হারানো ঘরের স্মৃতি এবং ‘মুল্লুকে চলো’ অর্থাৎ নিজের মাটিতে ফিরে যাওয়ার সেই অসমাপ্ত আকাঙ্ক্ষা। এই ইতিহাসকে আমরা যাতে না ভুলে যাই, তাই ২০২৬ সালে এসে মেঘদল ব্যান্ড প্রকাশ করে ‘মুল্লুক’ গানটি, যা ১৯২১ সালের চা–শ্রমিকদের ‘মুল্লুকে চলো’ আন্দোলন থেকে বর্তমান সময়ের চা–শ্রমিকদের সংগ্রাম ও অধিকারবঞ্চনার ধারাবাহিকতা তুলে ধরে। গানটিতে ঐতিহ্যবাহী চা–শ্রমিক লোকগানের আবহ ব্যবহার করে তাঁদের শোষণ, ঘরে ফেরার আকাঙ্ক্ষা ও সংগ্রামের ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা হয়েছে। এভাবেই ইতিহাস সর্বদা সাহিত্য ও সংস্কৃতির মাধ্যমেই সংরক্ষিত থেকে যায়।

সভাপতি, ড্যাফোডিল বন্ধুসভা