যেখানে পুরুষেরা সন্তান গর্ভধারণ ও জন্ম দেয়

সমুদ্রঘোড়া বা সি–হর্সছবি: বিগ ফার্ম

সমুদ্রের নিচে আলো-ছায়ার খেলা। সামুদ্রিক ঘাসগুলো ধীরে ধীরে দুলছে। সেই ঘাসের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল ছোট্ট এক প্রাণী—মাথাটা ঘোড়ার মতো, লেজটা প্যাঁচানো, আর পেটের কাছে ক্যাঙারুর মতো একটি থলে। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, সমুদ্রের ভেতর কোনো রূপকথার ঘোড়া ঘুরে বেড়াচ্ছে।

কিন্তু না। এটি আসলে একটি মাছ—সমুদ্রঘোড়া বা সি–হর্স। আর সবচেয়ে অবাক করা অংশটি তার চেহারা নয়; বরং প্রেম, সংসার আর সন্তান জন্ম দেওয়ার পদ্ধতি।

সমুদ্রের নিচে প্রেমের গল্প
সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে দুলতে থাকা সামুদ্রিক ঘাসের ভিড়ে সমুদ্রঘোড়ার জীবন কেটে যায়। তারা খুব দ্রুত সাঁতার কাটতে পারে না। সামুদ্রিক ঘাস আর প্রবালের আড়ালে এই মাছ এমন নিঃশব্দে হারিয়ে থাকে, যেন একই সমুদ্রের ভেতর থেকেও একে অপরকে খুঁজে পাওয়া কঠিন।

একদিন নীল জলের নীরবতায় একটি স্ত্রী সমুদ্রঘোড়া ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে এক সম্ভাব্য পুরুষ সঙ্গীর কাছে। মুখোমুখি হতেই দুজন যেন থেমে যায় নিজেদের ছোট্ট এক জগতে। কিছুক্ষণ চলে নীরব পর্যবেক্ষণ—কোনো শব্দ নেই, অথচ সেই নীরবতার মাঝেই যেন প্রশ্ন ভেসে আসে, ‘তোমার সঙ্গেই কি পথ চলব?’

উত্তর আসে শরীরের রঙে, ভঙ্গিতে, আর ধীরে ধীরে বদলে যাওয়া আচরণে। তারা পাশাপাশি সাঁতার কাটে, ঢেউয়ের তালে দুলতে থাকে, লেজ জড়িয়ে থাকে। এই নাচের সময় অনেক প্রজাতির সমুদ্রঘোড়ার শরীরের রংও বদলে যেতে পারে। এই রং বদল শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়; এটি তাদের মধ্যে বন্ধন তৈরি করতে এবং প্রজননের সময় একে অপরের সঙ্গে সমন্বয় করতেও সাহায্য করে।

প্রেমের নাচের পর শুরু হয় আরও বিস্ময়কর এক অধ্যায়। স্ত্রী সমুদ্রঘোড়া তার ডিমগুলো তুলে দেয় পুরুষ সমুদ্রঘোড়ার বিশেষ প্রজনন থলিতে। এর পর থেকে ডিমগুলোর দেখভালের দায়িত্ব নেয় পুরুষটি। থলির ভেতরেই ধীরে ধীরে বেড়ে উঠতে থাকে অনাগত সন্তানগুলো। প্রজাতিভেদে সময়ের কিছুটা পার্থক্য থাকলেও, অনেক সমুদ্রঘোড়ার ক্ষেত্রে এই সময়টা প্রায় দুই সপ্তাহের মতো হতে পারে।

সন্তান ধারণ করে, কিন্তু পাকস্থলী নেই!
সমুদ্রঘোড়ার বিস্ময় এখানেই শেষ নয়। শরীরের গঠনেও লুকিয়ে আছে প্রকৃতির এক অদ্ভুত রহস্য। সমুদ্রঘোড়ার কোনো পাকস্থলী নেই। তাই খাবার জমিয়ে রাখার মতো কোনো জায়গাও তাদের শরীরে নেই। ছোট ছোট শিকার, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ক্রাস্টেশিয়ান ও বিভিন্ন প্ল্যাঙ্কটনিক প্রাণী তারা খুব দ্রুত হজম করে ফেলে। ফলে পেট ভরে দীর্ঘ সময় থাকার সুযোগ নেই; খাবারের সন্ধানে তাদের দিনে বারবার শিকার করতে হয়।

সমুদ্রঘোড়া বা সি–হর্স
ছবি: সংগৃহীত

শিকার ধরার মুহূর্তটিই সবচেয়ে চমকপ্রদ। সমুদ্রঘোড়া খুব ধীরে ধীরে শিকারের কাছে এগিয়ে যায়। এতটাই নিঃশব্দে যে শিকারটি অনেক সময় বিপদ বুঝতেই পারে না। তারপর হঠাৎ তার লম্বা মুখ দিয়ে তৈরি হয় এক শক্তিশালী টান। মুহূর্তের মধ্যেই শিকার চলে যায় মুখের ভেতর।

এই ধীরগতির প্রাণীটির শরীরেই রয়েছে অবিশ্বাস্য দ্রুততার আরেক গল্প। তার পাখনাগুলো এত দ্রুত নড়তে পারে যে মনে হয় ছোট্ট শরীরের ভেতরে লুকিয়ে আছে এক ক্ষুদ্র ইঞ্জিন!

বাবার আশ্রয় থেকে নীল পৃথিবীতে
দিন যেতে থাকে। বাবার প্রজনন থলি ধীরে ধীরে ভারী হয়ে ওঠে। তার ভেতরেই বেড়ে উঠতে থাকে একের পর এক নতুন জীবন।

আরও পড়ুন

অবশেষে আসে সেই প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। পুরুষ সমুদ্রঘোড়া শরীরকে বারবার সংকুচিত করতে থাকে। একের পর এক শক্তিশালী সংকোচনের পর তার প্রজনন থলি থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করে ছোট ছোট সমুদ্রঘোড়া। বাচ্চাগুলো ছড়িয়ে পড়ে বিশাল নীল সমুদ্রের অজানা জগতে।

বাবা শুধু তাদের জন্মই দেয় না, শেষ মুহূর্তে নিজের শরীরের নিরাপদ আশ্রয়টুকুও ছেড়ে দেয় তাদের জন্য।

সি ড্রাগন
সি ড্রাগনের জীবনও কম আশ্চর্যের নয়। তারাও একই সিংনাথিডি (Syngnathidae) পরিবারের সদস্য। পুরুষ সি ড্রাগনও স্ত্রী থেকে পাওয়া ডিম নিজের শরীরে বহন করে। তবে সমুদ্রঘোড়ার মতো আলাদা থলে থাকে না; ডিমগুলো পুরুষের লেজের নিচের বিশেষ প্রজনন থলিতে আটকে থাকে এবং সেখানেই বিকশিত হয়।

শিক্ষার্থী, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি