নীল রং কোথা থেকে এল, কীভাবে ছড়িয়ে পড়ল পৃথিবীতে
যে রংটা দেখলেই মনে হয় আকাশটা একটু বেশি দূরে চলে গেছে, আর সমুদ্রটা একটু বেশি গভীর; সেই নীলের জন্মকথা শুরু হয়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব হাজার হাজার বছর আগে বর্তমান আফগানিস্তানের বাদাখশানের পাহাড়ে। সেখানে একটা পাথর পাওয়া যেত লাজওয়ার্দ, ল্যাপিস লাজুলি নামে। পাথরটা গুঁড়া করে যখন কাচের গলানো মণ্ডে মেশানো হতো, আগুনে ঝলসে উঠত এক আশ্চর্য রং—রঙের রাজা ‘আলট্রামেরিন’। মিসরের ফারাওরা এই নীল দিয়ে মুখোশ রাঙাত। রোমানরা বলত, আকাশের টুকরা পৃথিবীতে পড়ে গেছে। একসময় প্রাকৃতিক আলট্রামেরিন এতই দামি ছিল যে অনেক জায়গায় এর দাম সোনার সমান; কখনো সোনার চেয়েও বেশি।
১৮৮৮ সাল। আরল। ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ আলট্রামেরিন কিনতে পারছিলেন না। দোকানদার বলেছিল, আগে টাকা, তারপর নীল। ভ্যান গঘ পাগলের মতো চিৎকার করে বলেছিলেন, নীল ছাড়া আমি বাঁচব না! যদিও তাঁর কান কেটে রাখার গল্পটা শিল্পীজীবনের কিংবদন্তি অংশ। তিনি সত্যিই নীলকে বাঁচার মতো প্রয়োজনীয় ভাবতেন। আজ সেই নীল ‘স্টারি নাইট’-এ ঝলমল করছে। কানের গল্পটা রয়ে গেছে ইতিহাসের আড়ালে।
মধ্যযুগে নীল ছিল স্বর্গের রং। কুমারী মেরির চাদর নীল। রাজারাও নীল পরত। গরিবরা স্বপ্নেও ভাবতে পারত না। কিন্তু ১৮৫৬ সালে লন্ডনের এক কিশোর উইলিয়াম পার্কিন কয়লার টার থেকে বানিয়ে ফেলল এক নতুন কৃত্রিম রং—মউভিন। দাম পড়ল আগের ষোলো ভাগের এক ভাগ। রাতারাতি নীল সবার হয়ে গেল। শ্রমিকের জামা, নাবিকের ইউনিফর্ম, জিনসের নীল। স্বর্গের রং নেমে এল রাস্তায়, মানুষের গায়ে।
বাংলার নদীয়ায় ছিল নীলকুঠি। ১৮৫৯–৬০। ইংরেজরা চাষিদের জোর করে নীল চাষ করতে বাধ্য করত। ধানের বদলে নীল। যে চাষি না করত, তার ঘরে আগুন। সাপ্তাহিক বাজারে নীলকরেরা বন্দুক হাতে বসে থাকত। শেষে চাষিরা বিদ্রোহ করল—নীল বিদ্রোহ। ব্রিটিশরা পিছিয়ে গেল। নীলকুঠিগুলো ভেঙে ফেলা হলো। আজ সেই জমিতে ধান হয়। কিন্তু গ্রামের নাম এখনো নীলডাঙ্গা।
১৯০৩ সাল। প্রথম রঙিন ফিল্ম ‘এ ট্রিপ টু দ্য মুন’। তখন রং বলতে নীল আর সবুজ। পরিচালক জর্জ মেলিয়েস প্রতিটি ফ্রেম হাতে নীল রং করতেন। দিনে ১৬ ঘণ্টা। চোখ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তিনি বলতেন, নীল ছাড়া চাঁদের রং হয় না।
১৯৪৭ সাল। ইসরায়েলের পতাকার নীল খোঁজা হচ্ছিল। ঐতিহাসিক ‘টেকহেলেত’—ইহুদি ঐতিহ্যের পবিত্র নীল—তার অনুপ্রেরণা। বলা হয়, পতাকা তৈরির সময় নীল কাপড়ের টানাটানি ছিল, আর বিভিন্ন জায়গা থেকে কাপড় আনা হয়েছিল। কেউ কেউ বলেন ভারত থেকেও এসেছিল সেই কাপড়ের একটি চালান। আজ ইসরায়েলের পতাকায় যে নীল, তার রঙিন যাত্রাপথ পৃথিবীর নানা দেশের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
২০০৯ সাল। জাপানের একটি রেলস্টেশনে আত্মহত্যা বেড়ে গিয়েছিল। তারা স্টেশনের সব আলো নীল করে দিল। এরপর আত্মহত্যা ৮০ শতাংশের বেশি কমে গেল বলে প্রতিবেদনে বলা হলো। নীল মানুষকে শান্ত করে। আজ বিশ্বের অনেক হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটার নীল।
আজ আমরা যখন স্ক্রিনে নীল আলো দেখি, তখন আসলে একধরনের সাদা এলইডি আলোর নীল তরঙ্গ দেখি, ঠিক সেই পুরোনো নীল নয়। আসল নীল আজ বিরল। বাদাখশানের ল্যাপিস লাজুলি খনি প্রায় শেষের পথে। প্রাকৃতিক আলট্রামেরিন এখন অমূল্য, আর আমাদের নীল তৈরি হয় ল্যাবে।
কিন্তু যখন রাতে আকাশের দিকে তাকাই, তখনো মনে হয় ভ্যান গঘের সেই নীল ঝলমল করছে।
নীল কখনো শোক ছিল। কখনো বিদ্রোহ। কখনো স্বাধীনতা। আজ নীল হলো স্ক্রিনের আলো। কিন্তু যে নীলের জন্য শিল্পী পাগলের মতো চেয়েছিল, যে নীলের জন্য চাষি বন্দুক তুলেছিল, সেই নীল এখনো আছে আকাশে, সমুদ্রে, আমাদের চোখের গভীরে। যেখানে কেউ কখনো পৌঁছাতে পারবে না।