অতিরিক্ত ঘুমে কীভাবে জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে প্রায় ১৮০০ দিন

সমস্যা ঘুমে নয়, সমস্যাটি অতিরিক্ততায়ছবি: এআই/বন্ধুসভা

মানুষের জীবনে কিছু বাক্য থাকে, যেগুলো উচ্চারিত হওয়ার মুহূর্তে সাধারণ মনে হলেও সময়ের দীর্ঘ পরিক্রমায় সেগুলোই একদিন আত্মজিজ্ঞাসার আয়না হয়ে দাঁড়ায়। জীবনের একপর্যায়ে উপলব্ধি হয়, আমরা আসলে সময়কে ব্যয় করি না; সময়ই জীবনকে ধীরে ধীরে ব্যয় করে। প্রতিটি সূর্যোদয় আমাদের আয়ু থেকে একটি দিন সরিয়ে নেয়, প্রতিটি সূর্যাস্ত আমাদের অস্তিত্বের ভান্ডার থেকে একটি সম্ভাবনা মুছে দেয়। অথচ আমরা নির্বিকারভাবে ভাবি, সময় তো এখনো অনেক বাকি।

ঘুম মানুষের জৈবিক অস্তিত্বের অপরিহার্য অনুষঙ্গ। নিদ্রা শরীরকে পুনর্গঠন করে, মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দেয়, ক্লান্ত সত্তাকে পুনরায় কর্মক্ষম করে। কিন্তু প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিদ্রা যখন অভ্যাসে পরিণত হয়, তখন বিশ্রাম আর পুনর্গঠনের মাধ্যম থাকে না; তা হয়ে ওঠে সময়ের নীরব অপহরণ। সমস্যা ঘুমে নয়, সমস্যাটি অতিরিক্ততায়; বিশ্রামে নয়, অচেতন অভ্যাসে।

ধরা যাক, একজন মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় প্রতিদিন মাত্র দুই ঘণ্টা অতিরিক্ত ঘুমিয়ে কাটালেন। দুই ঘণ্টা শুনতে সামান্য; কিন্তু জীবন কখনো একক মুহূর্তের হিসাব নেয় না, সে সমষ্টির নির্মম অঙ্কে আমাদের সামনে আয়না ধরেছে। প্রতিদিন দুই ঘণ্টা অতিরিক্ত ঘুম মানে বছরে ৭৩০ ঘণ্টা। অর্থাৎ প্রায় ৩০ দিন ১০ ঘণ্টা। দশ বছরে ৭ হাজার ৩০০ ঘণ্টা, প্রায় ৩০৪ দিন। আর ষাট বছরে এই অতিরিক্ত সময় দাঁড়ায় ৪৩ হাজার ৮০০ ঘণ্টা, অর্থাৎ প্রায় ১ হাজার ৮২৫ দিন বা পূর্ণ ৫ বছর।

ভাবুন, জীবনের পাঁচটি বছর যদি কেবল অতিরিক্ত নিদ্রার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে থাকে, তবে সেই পাঁচ বছর আসলে কত অদৃশ্য সম্ভাবনার সমাধি! পাঁচ বছরে একজন মানুষ অসংখ্য গ্রন্থ পাঠ করতে পারেন, নতুন কোনো ভাষা আয়ত্ত করতে পারেন, গবেষণা করতে পারেন, শিল্পচর্চা করতে পারেন, অসংখ্য মানুষের জীবন স্পর্শ করতে পারেন, অথবা নিজের ভেতরে এমন এক জ্ঞানলোক নির্মাণ করতে পারেন, যার আলো মৃত্যুর পরও অন্যের পথকে আলোকিত করবে।

সময়ের অপচয় নিছক কয়েকটি ঘণ্টার অপচয় নয়; এটি সম্ভাবনার অপমৃত্যু। যে মুহূর্তটি আমরা অবহেলায় বিসর্জন দিই, তার সঙ্গে কেবল বর্তমানই হারায় না, হারিয়ে যায় সেই মুহূর্ত থেকে জন্ম নিতে পারত এমন অসংখ্য ভবিষ্যৎ।

মানুষের সবচেয়ে বিস্ময়কর আত্মপ্রবঞ্চনা হলো, সে নিজের মৃত্যুকে জানে, কিন্তু সময়ের সীমাবদ্ধতাকে অনুভব করে না। আমরা জানি জীবন অনিত্য, তবু আচরণ করি যেন আমাদের হাতে অনন্তকাল জমা আছে। আগামীকালকে এমন এক সম্পদ মনে করি, যার ওপর আমাদের অবিচ্ছেদ্য মালিকানা রয়েছে। অথচ আগামীকাল কখনো প্রতিশ্রুত নয়; প্রতিশ্রুত কেবল এই মুহূর্ত।

আরও পড়ুন

সময়ের প্রকৃতি বড় নির্মম। সে কারও দুঃখে থামে না, কারও সাফল্যে দ্রুততর হয় না, কারও অনুতাপে ফিরে তাকায় না। রাজা ও ভিখারি, জ্ঞানী ও অজ্ঞ, সফল ও ব্যর্থ—সবার জন্য সময়ের প্রবাহ অভিন্ন। পার্থক্য শুধু এই যে, কেউ সময়ের স্রোতে নিজের অস্তিত্বের অর্থ নির্মাণ করে, আর কেউ সেই স্রোতের ভাসমান আবর্জনার মতো অচিহ্নিতভাবে বিলীন হয়ে যায়।

আমরা প্রায়ই বলি, ‘সময় পাচ্ছি না।’ প্রকৃত সত্য অনেক সময় আরও নির্মম। সময় নেই তা নয়, সময়ের যথার্থ বিন্যাস নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনন্ত বিচরণ, উদ্দেশ্যহীন আলাপ, অকারণ বিলম্ব, অতিরিক্ত নিদ্রা, অনিয়ন্ত্রিত বিনোদন—এসব আমাদের জীবন থেকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ কেটে নেয়। আশ্চর্য হলো, একটি দিন থেকে দশ মিনিট হারালে আমরা উদ্বিগ্ন হই না; কিন্তু সেই দশ মিনিটের পুনরাবৃত্তিই একদিন কয়েক মাস, কয়েক বছর হয়ে আমাদের সামনে দাঁড়ায়।

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ অর্থের হিসাবের চেয়ে সময়ের হিসাব নিয়েই বেশি অনুতপ্ত হয়। তখন বোঝা যায় যে অর্থ হারিয়েছিলাম, তা হয়তো আবার অর্জন করা সম্ভব ছিল; যে সুযোগ হারিয়েছিলাম, তা হয়তো আর ফিরে আসেনি; কিন্তু যে সময় চলে গেছে, তার পুনর্মুদ্রণ নেই।

আরও পড়ুন

অতএব সময়কে মূল্য দেওয়া মানে সারাক্ষণ কর্মব্যস্ত থাকা নয়। সময়ের প্রতি শ্রদ্ধা মানে জীবনের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা। কখন বিশ্রাম প্রয়োজন, কখন অধ্যয়ন, কখন সৃজন, কখন নীরব আত্মসমীক্ষা এবং কখন মানুষের জন্য নিজেকে উজাড় করে দিতে হবে—এই বোধই সময়জ্ঞান।

মানুষের হাতে সময়কে বন্দী করার কোনো যন্ত্র নেই, অতীতকে পুনরুদ্ধারের কোনো মন্ত্র নেই। আছে কেবল বর্তমান। এই বর্তমানই ভবিষ্যতের অতীত হয়ে যাবে মাত্র একটি মুহূর্তের ব্যবধানে। তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিত নয়—‘আমার হাতে কত সময় আছে?’
বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—‘যে সময়টুকু আমার হাতে আছে, তার কতটা অর্থবহ করে তুলছি?’

শেষ বিচারে জীবন দীর্ঘতার কাছে নয়, গভীরতার কাছে ঋণী। সময় একদিন আমাদের ছেড়ে যাবে, এটাই অনিবার্য। কিন্তু সময় চলে যাওয়ার আগে আমরা সময়ের মধ্যে কী রেখে যেতে পারলাম, সেটিই হয়ে থাকবে অস্তিত্বের প্রকৃত স্বাক্ষর। সময়কে যে মানুষ কেবল অতিবাহিত হতে দেয়, সে বয়স পায়; আর যে মানুষ সময়কে অর্থ দেয়, সে উত্তরাধিকার রেখে যায়।

শিক্ষক, কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ, চাঁদপুর

* মতামত লেখকের নিজস্ব