বিশ্বকাপ ফুটবলে আমরা যা দেখি, তা কতটা সত্য
২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে। নতুন চ্যাম্পিয়নের হাতে ট্রফি উঠেছে, ইতিহাসে আরেকটি অধ্যায় যোগ হয়েছে। কিন্তু প্রতিটি বিশ্বকাপ যেমন একটি ট্রফির গল্প লিখে যায়, তেমনি কিছু প্রশ্নও রেখে যায়। এবারের আসরও তার ব্যতিক্রম নয়।
একটি প্রশ্ন কি কখনো আমাদের ভাবিয়েছে? মাঠে যে ৯০ মিনিট আমরা দেখি, সেটিই কি পুরো সত্য? নাকি সেই দৃশ্যপটের আড়ালেও থাকে আরও বড় কোনো গল্প—যেখানে ফুটবলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে জটিল সমীকরণ।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিশ্বকাপ শুধু খেলার ইতিহাস নয়; এটি ক্ষমতার ইতিহাসও।
গত ১০০ বছরে বিশ্বকাপের মঞ্চে এমন বহু ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ফুটবলের বাইরের শক্তিগুলো রাজনীতি, স্বৈরশাসন, যুদ্ধ, কূটনীতি, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক ক্ষমতার সমীকরণ আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। কোথাও বিশ্বকাপকে ব্যবহার করা হয়েছে শাসকের প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে, কোথাও জাতীয় সংকট আড়াল করার জন্য, আবার কোথাও একটি ম্যাচ পরিণত হয়েছে দুই দেশের রাজনৈতিক সংঘাতের প্রতীকী লড়াইয়ে। এসবের অনেকগুলোই আর নিছক বিতর্ক নয়; ইতিহাসবিদদের গবেষণা, সরকারি নথি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যে সেগুলো আজ ইতিহাসের অংশ।
এই নিবন্ধ সেই প্রশ্নগুলোর সরাসরি উত্তর দেওয়ার দাবি করছে না। কারণ, কোনো অভিযোগকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রমাণের দায়িত্ব থাকে। তবে একটি বিষয় অনস্বীকার্য-বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন অনেক ঘটনা রয়েছে, যেগুলো কেবল ফুটবলের ভেতরে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিভিন্ন সময়ে রাজনীতি, যুদ্ধ, স্বৈরশাসন, অর্থনীতি, বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক ক্ষমতার সমীকরণ বিশ্বকাপকে ঘিরে আলোচনায় এসেছে। সেই ঐতিহাসিক বাস্তবতার আলোকে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ নতুন করে দেখার চেষ্টা করাই এই লেখার উদ্দেশ্য।
যদি ১৯৩০, ১৯৩৪, ১৯৩৮, ১৯৭৮, ১৯৮৬ কিংবা ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপ নিয়ে আজও গবেষণা হয়, বিতর্ক হয় এবং নতুন দলিল সামনে আসে, তাহলে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ নিয়েও প্রশ্ন তোলার অধিকার ইতিহাসই আমাদের দেয়। তাই এই নিবন্ধের মূল প্রশ্ন একটিই—বিশ্বকাপ কি সব সময় শুধু ফুটবলের গল্প ছিল? নাকি কখনো কখনো এটি বিশ্বরাজনীতিরও একটি বড় মঞ্চ হয়ে উঠেছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে প্রায় ১০০ বছর আগে, বিশ্বকাপের জন্মের ইতিহাসে।
১৯২০-এর দশকে অলিম্পিক ফুটবলে মূলত অপেশাদার খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল। অনেক দেশের পেশাদার ফুটবলার এতে খেলতে পারতেন না। ফলে একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ইউরোপ, দক্ষিণ আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ফুটবল তত দিনে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সেই জনপ্রিয়তাকে বৈশ্বিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে ফিফা একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা চালু করতে চেয়েছিল। তৎকালীন ফিফা সভাপতি জুলে রিমে বিশ্বাস করতেন, ফুটবল বিভিন্ন দেশের মানুষকে একত্র করতে পারে। তাঁর নেতৃত্বেই ১৯২৮ সালে ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং ১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়।
এই ইতিহাসটুকু মানুষ জানে। কিন্তু এর বিপরীতে যে ভিন্ন ইতিহাস রয়েছে, সেটা খুব কম মানুষ জানেন। বিশ্বকাপ যেমন শুরু হয়েছিল শান্তির বার্তা নিয়ে, ঠিক তেমনি এর পেছনে রয়েছে আরেকটি অন্ধকার অধ্যায়। বিশ্বকাপ শুরুর পেছনে একটি বড় উদ্দেশ্য ছিল তৎকালীন ক্ষমতাধর স্বৈরশাসকদের দমন-পীড়নকে বৈশ্বিক দৃষ্টির আড়ালে রাখা এবং সেই শাসনকে বৈধতা দেওয়া।
ব্রিটিশ ফুটবল ঐতিহাসিক ডেভিড গোল্ডব্লাট তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য বল ইজ রাউন্ড: আ গ্লোবাল হিস্ট্রি অব ফুটবল’ (২০০৬)-এ লিখেছেন, বিশ্বকাপের জন্ম নিছক খেলার আনন্দ থেকে নয়, বরং এর পেছনে ছিল রাজনৈতিক ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ। তিনি দেখিয়েছেন, ১৯৩০-এর দশক থেকেই বিভিন্ন দেশের স্বৈরশাসকেরা বিশ্বকাপকে নিজেদের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
অ্যামেরিকান লেখক ফ্র্যাংকলিন ফোয়ার তাঁর ‘হাউ সকার এক্সপ্লেইনস দ্য ওয়ার্ল্ড’ (২০০৪) গ্রন্থে এই সম্পর্ককে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, ফুটবল কখনো কখনো জাতীয়তাবাদ ও রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে এতটাই মিশে যায় যে খেলা ও রাজনীতির মধ্যে সীমারেখা বলতে কিছু থাকে না।
ডেভিড গোল্ডব্লাট ‘দ্য বল ইজ রাউন্ড’ গ্রন্থে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ রেখেছেন। তিনি লিখেছেন, বিশ শতকের ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, যখনই কোনো দেশে রাজনৈতিক সংকট বা স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে জনরোষ তীব্র হয়েছে, তখনই ফুটবল বা বড় ক্রীড়া আসর সেই মনোযোগকে অন্যদিকে সরিয়ে দিয়েছে।
চলমান ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের মধ্যেই শুরু হয়েছিল ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ। প্রায় দেড় মাস ধরে বিশ্বকাপ চলাকালে সেই সংঘাত অব্যাহত থাকলেও বৈশ্বিক গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের মনোযোগের বড় অংশ ছিল বিশ্বকাপের মঞ্চে। এটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়, এটা একটি পরিচিত ধারা, যার শিকড় রয়েছে ১৯৩০-এর দশকেই।
১৯৩০ বিশ্বকাপ: প্রথম আসরেই বিতর্ক
বিশ্বকাপের প্রথম ফাইনাল মাঠে গড়ানোর আগেই একটি অভূতপূর্ব বিবাদ তৈরি হয়েছিল। বেলজিয়ান রেফারি জন ল্যাঙ্গেনাস পরে স্মৃতিচারণায় লিখেছেন, ‘দুই দেশের মধ্যে অসাধারণ বিদ্বেষ স্পষ্ট হয়ে উঠল যখন ম্যাচের বল বাছাই করার সময় এল। দুই দলই নিজেদের বলে খেলার দাবি জানাল।’
ফিফা সভাপতি জুল রিমে শেষ পর্যন্ত মাঝামাঝি সিদ্ধান্ত নেন। আর্জেন্টিনার ‘তিয়েন্তো’ বল প্রথমার্ধে এবং উরুগুয়ের স্কটল্যান্ড থেকে আমদানি করা ‘টি-মডেল’বল দ্বিতীয়ার্ধে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়। এটি ছিল ফুটবল ইতিহাসের একমাত্র বিশ্বকাপ ফাইনাল যেখানে দুটি ভিন্ন বল ব্যবহার করা হয়।
দুটি বলের মধ্যে পার্থক্য ছিল মৌলিক। আর্জেন্টিনার ‘তিয়েন্তো’ তৈরি হয়েছিল ১২টি লম্বা চামড়ার প্যানেল দিয়ে, যা ভারী এবং কম স্থিতিস্থাপক ছিল। উরুগুয়ের ‘টি-মডেল’ ছিল তুলনামূলকভাবে হালকা ও দ্রুতগতি।
ফলাফলে এর প্রতিফলন স্পষ্ট। প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার বলে খেলে আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে এগিয়ে যায়। টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা গিইয়ের্মো স্তাবিলে বিরতির ঠিক আগে দ্বিতীয় গোল করে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে রাখেন।
কিন্তু বিরতিতে বল বদলের সঙ্গে সঙ্গে ম্যাচের গতিপথও বদলে যায়। উরুগুয়ের হালকা বলে দ্বিতীয়ার্ধে উরুগুয়ে সম্পূর্ণ আধিপত্য বিস্তার করে। ৫৭তম মিনিটে পেদ্রো সিয়া সমতা ফেরান, ৬৮তম মিনিটে সান্তোস ইরিয়ার্তে উরুগুয়েকে এগিয়ে দেন। শেষ বাঁশির ঠিক আগে হেক্তোর কাস্ত্রো চতুর্থ গোল করেন।
ফাইনালের পর বুয়েনস এইরেসে উরুগুয়ের কনস্যুলেটে পাথর ছোড়া হয়েছিল, ক্ষুব্ধ আর্জেন্টাইন সমর্থকদের একটি দল কনস্যুলেট ভবনে হামলা চালায়। বলের এই বিতর্ক শুধু একটি ম্যাচের বিতর্ক নয়, এটি দুই প্রতিবেশী দেশের ১০০ বছরের ফুটবল দ্বন্দ্বের বীজ বপন করেছিল।
ডেভিড গোল্ডব্লাট ‘দ্য বল ইজ রাউন্ড’ গ্রন্থে এই বল-বিতর্ককে বিশ্বকাপের প্রথম প্রশাসনিক বিতর্ক হিসেবে নথিভুক্ত করেছেন; এবং দেখিয়েছেন, মাঠের বাইরের সিদ্ধান্ত কীভাবে মাঠের ভেতরের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে। প্রথম বিশ্বকাপেই সেই শিক্ষা পাওয়া গিয়েছিল।
মুসোলিনির বিশ্বকাপ: ১৯৩৪ ও ১৯৩৮
১৯৩৪ সালের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় ফ্যাসিবাদী ইতালিতে। ইতিহাসবিদ সাইমন মার্টিন তাঁর গবেষণাগ্রন্থ ‘ফুটবল অ্যান্ড ফ্যাসিজম: দ্য ন্যাশনাল গেম আন্ডার মুসোলিনি’ (২০০৪) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, মুসোলিনি এই আসরে ৩৫ লাখ লিরা বিনিয়োগ করেছিলেন। উদ্দেশ্য একটাই, ফ্যাসিবাদকে বৈশ্বিক মঞ্চে বৈধতা দেওয়া।
কিন্তু সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্যটি হলো রেফারি নিয়ে। ১৯৩৪ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে সুইডিশ রেফারি ইভান একলিন্ড ম্যাচ পরিচালনা করেছিলেন। ম্যাচের আগের রাতে মুসোলিনি তাঁকে ব্যক্তিগত নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানান, কথিত আছে ‘কৌশল আলোচনার’ জন্য। পরদিন ইতালি অস্ট্রিয়াকে ১-০ গোলে হারায়। অস্ট্রিয়ার কিংবদন্তি স্ট্রাইকার জোসেফ বিকান মৃত্যুর আগপর্যন্ত দাবি করে গেছেন, একলিন্ড ঘুষ নিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, রেফারি নিজেই একবার বল স্পর্শ করে সেটি ইতালীয় খেলোয়াড়ের দিকে দিয়ে দিয়েছিলেন।
এরপর সেই একই রেফারি একলিন্ডকেই ফাইনালে নিয়োগ দেওয়া হয়। ফাইনালের আগে তাঁকে ভিআইপি বক্সে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ইতালি ফাইনালে চেকোস্লোভাকিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়।
১৯৩৮ সালের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় ফ্রান্সে। কিন্তু মুসোলিনির ছায়া সেখানেও ছিল। প্রতিটি ম্যাচের আগের রাতে মুসোলিনি নিজে হাতে প্রতিটি খেলোয়াড়কে একটি করে চিঠি পাঠাতেন। চিঠির বক্তব্য সংক্ষিপ্ত কিন্তু ভয়াবহ, ‘জিতে আসো, নইলে মরো।’
স্পোর্টসকিডার (Sportskeeda) ঐতিহাসিক প্রতিবেদনে নথিভুক্ত আছে, হাঙ্গেরির গোলরক্ষক আন্তাল জাবো ১৯৩৮ ফাইনালে চারটি গোল হজম করার পরও বলেছিলেন, ‘আমি চারটি গোল খেয়েছি ঠিকই, কিন্তু ইতালীয় খেলোয়াড়দের জীবন বাঁচিয়েছি।’ ইতালি সেই ফাইনালে হাঙ্গেরিকে ৪-২ গোলে হারিয়ে পরপর দুটি বিশ্বকাপ জয়ী দল হয়।
ইতিহাসবিদ ডেনিস ম্যাক স্মিথ তাঁর ‘মুসোলিনি’ (১৯৮৩) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, মুসোলিনির কাছে ক্রীড়া ছিল রাজনৈতিক প্রচারণার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। দুটি বিশ্বকাপ জয় ইতালিতে ফ্যাসিবাদী শাসনকে জনমানসে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল।
ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ আর জে বি বসওয়ার্থ তাঁর ‘মুসোলিনিজ ইতালি: লাইফ আন্ডার দ্য ফ্যাসিস্ট ডিক্টেটরশিপ’ (২০০৫) গ্রন্থে লিখেছেন, মুসোলিনি বিশ্বকাপকে তাঁর শাসনের বৈধতার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। ইতালির জয়কে ফ্যাসিবাদী আদর্শের বিজয় হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল।
মুসোলিনি ছিলেন বিশ শতকের অন্যতম কুখ্যাত স্বৈরশাসক। তাঁর আমলে রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ, সামরিক আগ্রাসন এবং নাৎসি জার্মানির সঙ্গে জোট গঠনের মাধ্যমে ইতালি পরিণত হয়েছিল একটি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে। ১৯৪৫ সালের ২৮ এপ্রিল ইতালীয় প্রতিরোধ যোদ্ধারা তাঁকে গুলি করে হত্যা করে।
১৯৭৮ বিশ্বকাপ: স্টেডিয়ামের পাশেই ছিল নির্যাতনকক্ষ
১৯৭৬ সালের ২৪ মার্চ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জেনারেল হোর্হে রাফায়েল ভিদেলার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনায় সামরিক জান্তা ক্ষমতা দখল করে। এরপর শুরু হয় ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অধ্যায়, যা ‘ডার্টি ওয়ার’ বা ‘গেরা সুসিয়া’ নামে পরিচিত।
আর্জেন্টিনার মানবাধিকার সংস্থা কোনাডেপের (CONADEP) ১৯৮৪ সালের সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন Nunca Más (আর কখনো নয়)-এ নথিভুক্ত হয়েছে, এই সময়ে অন্তত ৩০ হাজার মানুষকে গুম, নির্যাতন ও হত্যা করা হয়েছিল। এই প্রতিবেদন আজও আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার দলিল হিসেবে স্বীকৃত।
ব্রিটিশ সাংবাদিক জোনাথন উইলসন তাঁর ‘অ্যাঞ্জেলস উইথ ডার্টি ফেসেস: দ্য ফুটবলিং হিস্ট্রি অব আর্জেন্টিনা’ (২০১৬) গ্রন্থে লিখেছেন, ১৯৭৮ বিশ্বকাপ আয়োজন ছিল ভিদেলা সরকারের একটি সুচিন্তিত রাজনৈতিক প্রকল্প। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আর্জেন্টিনাকে একটি স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে উপস্থাপন করাই ছিল মূল লক্ষ্য।
সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্যটি হলো, বুয়েনস এইরেসের যে মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের ম্যাচ হয়েছিল, তার মাত্র কয়েক শ মিটার দূরে ছিল নৌবাহিনীর কুখ্যাত নির্যাতন কেন্দ্র ইএসএমএ। মানবাধিকার গবেষক মার্গুয়েরিতে ফেইতলোউইৎজ তাঁর গ্রন্থ ‘আ লেক্সিকন অব টেরর: আর্জেন্টিনা অ্যান্ড দ্য লেগাসিজ অব টর্চার’ (১৯৯৮, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস)-এ বেঁচে ফেরা বন্দীদের সাক্ষ্য তুলে ধরেছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, স্টেডিয়ামে যখন দর্শকেরা গোলে উল্লাস করছিলেন, তখনো ইএসএমএর কক্ষগুলোয় বন্দীদের নির্যাতন চলছিল। আর্তনাদ ঢেকে যাচ্ছিল গ্যালারির উল্লাসে।
পেরু ম্যাচ: ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত ফলাফলগুলোর একটি
১৯৭৮ বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে আর্জেন্টিনার ফাইনালে যেতে পেরুর বিপক্ষে অন্তত চার গোলের ব্যবধানে জয় প্রয়োজন ছিল। আর্জেন্টিনা সেই ম্যাচ জিতেছিল ৬-০ গোলে।
এই ফলাফল নিয়ে পরবর্তী দশকগুলোয় একাধিক তদন্ত ও গবেষণা হয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত সাংবাদিক রিচার্ড ফিডলারের দীর্ঘ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, আর্জেন্টিনার সামরিক সরকার পেরুর সামরিক সরকারের সঙ্গে একটি গোপন রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছেছিল। বিনিময়ে পেরুতে আর্জেন্টিনার খাদ্যশস্য রপ্তানি ও ব্যাংকঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
পেরুর তৎকালীন গোলরক্ষক রামোন কিরোগা, যিনি জন্মসূত্রে ছিলেন আর্জেন্টাইন, তাঁর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। যদিও কখনো কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ আদালতে প্রতিষ্ঠিত হয়নি; তবু ডেভিড গোল্ডব্লাট ‘দ্য বল ইজ রাউন্ড: আ গ্লোবাল হিস্ট্রি অব ফুটবল’ গ্রন্থে লিখেছেন, এই ম্যাচ বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে সন্দেহজনক ফলাফলগুলোর একটি হিসেবে চিরকাল আলোচিত থাকবে।
ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ জোনাথন উইলসন ‘অ্যাঞ্জেলস উইথ ডার্টি ফেসেস: দ্য ফুটবলিং হিস্ট্রি অব আর্জেন্টিনা’ (২০১৬) গ্রন্থে এই ম্যাচকে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে সন্দেহজনক ফলাফলগুলোর একটি বলে চিহ্নিত করেছেন। পরবর্তী সময়ে ফিফা টুর্নামেন্টের সময়সূচিতে পরিবর্তন এনেছিল, যাতে শেষ রাউন্ডের ম্যাচগুলো একই সময়ে অনুষ্ঠিত হয়। অনেক বিশেষজ্ঞই এই সিদ্ধান্তকে ১৯৭৮-এর ঘটনার পরোক্ষ স্বীকৃতি হিসেবে দেখেন।
হ্যান্ড অব গড: মাঠের প্রতিশোধ ও ইতিহাসের ক্ষত
১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধে আর্জেন্টিনার ৬৪৯ জন সেনা প্রাণ হারিয়েছিল। যুদ্ধে পরাজয় ও দ্বীপ হাতছাড়া হওয়ার ক্ষোভ আর্জেন্টিনার সমাজে গভীরভাবে গেঁথে গিয়েছিল। ইতিহাসবিদ লরেন্স ফ্রিডম্যান তাঁর ‘দ্য অফিশিয়াল হিস্ট্রি অব দ্য ফকল্যান্ডস ক্যাম্পেইন’ (২০০৫, রুটলেজ) গ্রন্থে এই যুদ্ধের রাজনৈতিক ও মানবিক প্রভাব বিস্তারিতভাবে নথিভুক্ত করেছেন।
চার বছর পর, ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যারাডোনা হাত দিয়ে গোল করেন। ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের কাছে তিনি বলেছিলেন, গোলটি হয়েছে ‘ম্যারাডোনার মাথা দিয়ে সামান্য এবং ঈশ্বরের হাত দিয়ে।’
কিন্তু ম্যারাডোনার আত্মজীবনী ‘এল দিয়োগো’ (২০০০)-এ তিনি আরও স্পষ্টভাবে বলেছেন, ওই গোল ছিল ফকল্যান্ড যুদ্ধে নিহত আর্জেন্টাইন সেনাদের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধাঞ্জলি। তিনি লিখেছেন, ‘আমি ইংরেজদের পকেট চুরি করেছিলাম। এটা ছিল সেই যুদ্ধের প্রতিশোধ।’
ব্রিটিশ ফুটবল লেখক জিমি বার্নস তাঁর ‘ম্যারাডোনা: দ্য হ্যান্ড অব গড’(১৯৯৬) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, এই গোল শুধু একটি নিয়মবহির্ভূত গোল ছিল না, এটি ছিল একটি রাজনৈতিক বার্তা। লাতিন আমেরিকার কোটি মানুষের কাছে এই গোল ছিল ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে একটি প্রতীকী জবাব।
২০২৬ সালের সেমিফাইনালে আবারও ইংল্যান্ডকে হারিয়েছে আর্জেন্টিনা। ম্যাচ শেষে পুরোনো বিতর্ককে নতুন করে উসকে দিয়েছে আর্জেন্টিনা। ‘মালভিনাস আর্জেন্টিনার’ লেখা একটি ব্যানার প্রদর্শন করেছেন দলটির ফুটবলাররা। ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে দুই দেশের দ্বন্দ্ব এখনো অমীমাংসিত। মাঠের এই লড়াই তাই নিছক ফুটবল নয়, শত বছরের রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রতিফলন।
ফুটবলের ইতিহাসে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের নজির নতুন নয়। ১৯৩৪ ও ৩৮ সালে মুসোলিনির ইতালি, ১৯৭৮ সালে ভিদেলার আর্জেন্টিনা এবং ১৯৮২ সালে স্পেনে কুয়েতের রাজপরিবারের মাঠে নেমে আসার ঘটনা; ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে যে বিশ্বকাপের মাঠ কখনো কখনো রাজনীতির বাইরে থাকে না।
বিশ্বকাপ ফুটবলে মাঠের খেলায় যা দেখি তা কতটা সত্য? উচ্চশ্রেণির খেলায় নিম্নশ্রেণির চিৎকার:
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন আসে। বিশ্বকাপে কার স্বার্থ রক্ষা হয়? কার্ল মার্ক্স ‘দাস ক্যাপিটাল’ (১৮৬৭)-এ বলেছিলেন, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় যে শ্রেণি অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করে, সে শ্রেণিই সত্যকে নির্ধারণ করে। ফিফা হলো সেই উচ্চশ্রেণি। বিশ্বকাপের কোটি কোটি দর্শক হলেন নিম্নশ্রেণি। নিম্নশ্রেণি যতই চিৎকার করুক, প্রশ্ন তুলুক, সেই প্রশ্ন উচ্চশ্রেণির দরবারে কখনো পৌঁছায় না। উচ্চশ্রেণি তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য ব্যবহার করে আবেগ, উৎসব ও বিনোদনের অস্ত্র। বিশ্বকাপ হলো সেই অস্ত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী সংস্করণ।
মার্ক্সের কমোডিটি ফেটিশিজম বা পণ্য-পূজার ধারণায় এটি আরও স্পষ্ট হয়। বিশ্বকাপে কোটি মানুষ একটি জার্সি, একটি বল, একটি ব্র্যান্ডকে বিশেষ মূল্য দেয়। কিন্তু এই পণ্যের পেছনে কার শ্রম, কার মুনাফা, কার সিদ্ধান্ত, সেই প্রশ্ন আলোচনার বাইরেই থেকে যায়।
তেলেসুর ইংলিশ (TeleSUR English)-এর গবেষণাপত্র ‘গ্লোবাল ক্যাপিটাল ডিটারমাইনস ওয়ার্ল্ড কাপ চ্যাম্পিয়নস’ (২০২৬)-এ পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, পশ্চিম ইউরোপ বিশ্ব ফুটবলের আর্থিক কেন্দ্র হওয়ায় তারা তাদের আধিপত্য বজায় রাখে। ইউরোপের বহু বিলিয়ন ডলারের ক্লাব লিগগুলো আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকা থেকে মেধাবী খেলোয়াড়দের শৈশবেই শুষে নেয়।
জার্নাল অব পলিটিক্যাল ইনকোয়ারি-তে প্রকাশিত ‘দিস ইজ হাউ ফুটবল বিকেম আ টুল অব মডার্ন ইম্পেরিয়ালিজম’ (২০২৫) শীর্ষক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ২০২১ সালে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের সম্প্রচার আয় একাই ছিল ৫ বিলিয়ন পাউন্ড, অথচ আফ্রিকার সব লিগ মিলিয়ে সেটি ছিল ১ বিলিয়ন পাউন্ডেরও কম। ফিফা, ইউরোপীয় ক্লাব এবং করপোরেট স্পনসররা বিশ্ব ফুটবলের সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করে; আর আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও পূর্ব ইউরোপ থেকে যায় কেবল কাঁচামাল সরবরাহকারী হিসেবে।
এখানেই আসে সাম্রাজ্যবাদের প্রশ্ন। ইউরোপ শতবছর ধরে বিশ্বের সম্পদ নিজেদের কাছে কেন্দ্রীভূত করেছে। ফুটবলও সেই ব্যবস্থার বাইরে নয়। রিসার্চগেটে (ResearchGate) প্রকাশিত গবেষণাপত্র ‘ইউরোপিয়ান ক্লাব ক্যাপিটালিজম অ্যান্ড ফিফা রিডিস্ট্রিবিউশন মডেলস’ (২০১৮)-এ সুগডেন ও টমলিনসনের বিশ্লেষণের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর কাছে ফিফা একসময় সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের একটি মঞ্চ হিসেবে বিবেচিত ছিল। কিন্তু বর্তমানে সংস্থার ক্ষমতা কাঠামোতে ইউরোপীয় আধিপত্য প্রশ্নাতীত।
২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে ফিফার আয় হয়েছে রেকর্ড ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা নিজেদের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ১১ বিলিয়ন ডলারকেও ছাড়িয়ে গেছে। এই অর্থের বড় অংশ এসেছে ইউরোপীয় সম্প্রচার স্বত্ব ও স্পনসরশিপ থেকে। এখন প্রশ্ন হলো, ইউরোপের এই বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক স্বার্থ কি চাইবে যে অন্য কোনো মহাদেশের দল বিশ্বকাপ জিতে যাক?
সমাজবিজ্ঞানী জিন বদ্রিলার ‘সিমুলাক্রা অ্যান্ড সিমুলেশন’ (১৯৮১)-এ দেখিয়েছেন, আধুনিক গণমাধ্যম কীভাবে বাস্তবতার একটি কৃত্রিম সংস্করণ তৈরি করে জনমানসকে নিয়ন্ত্রণ করে। বিশ্বকাপ সেই অর্থে একটি বৈশ্বিক সিমুলেশন, যেখানে কোটি কোটি মানুষ খেলার আবেগে মগ্ন থাকে আর পেছনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো অদৃশ্য থেকে যায়।
২০২৬ বিশ্বকাপ: যুদ্ধের আগুনে ফুটবলের উৎসব
ইতিহাসবিদ নোয়াম চমস্কি তাঁর ‘হেজেমনি অর সার্ভাইভাল: আমেরিকান কোয়েস্ট ফর গ্লোবাল ডমিনেন্স’ (২০০৩, মেট্রোপলিটান বুকস) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক স্বার্থ পূরণে মিত্র দেশগুলোর ওপর কীভাবে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে।
রাজনীতিবিজ্ঞানী জোসেফ নাই তাঁর ‘ফট পাওয়ার: দ্য মিনস টু সাকসেস ইন ওয়ার্ল্ড পলিটিক্স’ (২০০৪, পাবলিক অ্যাফেয়ার্স) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, বড় শক্তিগুলো সামরিক বলের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কূটনীতিকে প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।
আয়োজক দেশ হিসেবে মার্কিন প্রশাসনের প্রভাব বলয় কতটা বিস্তৃত ছিল, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ বসনিয়ার বিপক্ষে শেষ ৩২-এর ম্যাচে। মার্কিন স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগান বসনিয়ান ডিফেন্ডার তারিক মুহারেমোভিচের গোড়ালিতে আঘাত করার কারণে ভিএআর পর্যালোচনার পর সরাসরি লাল কার্ড পান। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, এর অর্থ ছিল বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ ষোলোর গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তিনি খেলতে পারবেন না। কিন্তু এরপর যা ঘটল, তা ফুটবলের ইতিহাসে নজিরবিহীন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ফোন করে লাল কার্ডের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনার অনুরোধ জানান। ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের পর ফিফার শৃঙ্খলা কমিটি তাদের নিজস্ব ডিসিপ্লিনারি কোডের ২৭ নম্বর ধারা ব্যবহার করে বালোগানের এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা এক বছরের জন্য স্থগিত করে দেয়। ফলে বালোগান বেলজিয়ামের বিপক্ষে মাঠে নামেন।
এই সিদ্ধান্ত ফুটবল বিশ্বে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা উয়েফা বিবৃতিতে বলে, এই সিদ্ধান্ত ‘একটি লাল রেখা অতিক্রম করেছে এবং এটি অভূতপূর্ব, অবোধগম্য ও অন্যায়সংগত।’ সাবেক ফিফা সভাপতি সেফ ব্লাটার লিখেছেন, ‘লাল কার্ড রাজনৈতিক ফোনকলে বাতিল হয় না। যদি একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফিফা সভাপতিকে ফোন করেন এবং একজন খেলোয়াড় হঠাৎ ছাড়পত্র পান, তাহলে প্রশ্নটি অনিবার্য: ফিফা, তুমি কোথায় যাচ্ছ?’
বিশ্বকাপের আলোয় ঢাকা পড়ে যায় যুদ্ধ
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। এটি ছিল ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণের পর মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান। এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস, এবং দেশটির নেতৃত্বকে দুর্বল করা। মার্কিন এই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি নিহত হন।
অভিযানে ৪০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়। বি-টু স্টেলথ বোমারু বিমান মিজুরি থেকে ৩০ ঘণ্টার মিশনে উড়ে ইরানে আঘাত হানে। তেহরান, ইসফাহান, কোম, কারাজ, কেরমানশাহ ও তাবরিজে একযোগে ২ হাজার ৫০০-এরও বেশি ইরানি সামরিক ও সরকারি স্থাপনায় হামলা চালানো হয়। অভিযানে ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ২৯০ জনেরও বেশি আহত হন।
হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সির (এইচআরএএনএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১০ জুন পর্যন্ত ইরানে অন্তত ৩,৪৬৮ জন নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছে ৭ শিশু, ৩৭৬ জন নাবালক এবং ৪৯৬ জন নারী। আহত হয়েছেন ২৬ হাজারেরও বেশি মানুষ, যার মধ্যে রয়েছেন অন্তত ৪ হাজার নারী ও ১ হাজার ৬২১ জন শিশু।
এই ভয়াবহ যুদ্ধের মধ্যেই শুরু হয় ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ, যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে, যুক্তরাষ্ট্রেরই আয়োজনে। প্রায় দেড় মাস ধরে বিশ্বকাপ চলাকালে ইরানে হামলা অব্যাহত ছিল। কিন্তু বৈশ্বিক গণমাধ্যমের মনোযোগের বড় অংশ তখন বিশ্বকাপের মঞ্চে। হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর খবর চলে যাচ্ছিল পর্দার আড়ালে, আর সামনে আসছিল গোলের উদ্যাপন। ডেভিড গোল্ডব্লাট ‘দ্য বল ইজ রাউন্ড’ গ্রন্থে যে মনোযোগ সরানোর ঐতিহাসিক ধারার কথা বলেছেন, ২০২৬ সালে তার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেছিল।
যুদ্ধরত দেশের দল খেলছে যুদ্ধ পরিচালনাকারী দেশের মাটিতে
২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি ছিল ইরান জাতীয় ফুটবল দলের অংশগ্রহণ।
প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ক্রীড়া রাজনীতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জুলস বয়কফ টাইম ম্যাগাজিনকে বলেন, ‘বিশ্বকাপের ইতিহাসে এর আগে কখনো এমন হয়নি যে আয়োজক দেশ টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র তিন মাস আগে অংশগ্রহণকারী একটি দেশের বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু করেছে।’
নোয়াম চমস্কি ‘হেজেমনি অর সার্ভাইভাল’ গ্রন্থে এই কৌশলকে বলেছেন, ‘ম্যানুফ্যাকচারড কনসেন্ট’ বা কৃত্রিমভাবে সম্মতি তৈরির প্রক্রিয়া। জনগণের মনোযোগকে যুদ্ধ থেকে সরিয়ে বিনোদনের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হলে ক্ষমতাসীনরা জবাবদিহিতা থেকে মুক্ত থাকে। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ সেই প্রক্রিয়ার একটি নিখুঁত উদাহরণ হয়ে উঠেছিল।
যুদ্ধ শুরুর পর মার্চ মাসেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ না করার পরামর্শ দেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, ইরানি খেলোয়াড়দের জীবন ও নিরাপত্তাঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
পরিস্থিতির কারণে ইরান জাতীয় দলকে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে মেক্সিকোতে নিজেদের বেজক্যাম্প স্থাপন করতে হয়। খেলোয়াড়দের কেবল ম্যাচের দিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হতো। ম্যাচ শেষ হওয়ার পরই তাদের আবার মেক্সিকোতে ফিরে যেতে হতো। একই সঙ্গে দলের একাধিক কর্মকর্তা মার্কিন ভিসা পাননি।
ইরানের ফুটবল ফেডারেশন এই পদক্ষেপকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্রতিহিংসামূলক আচরণ’ বলে অভিযোগ করে। এমনকি ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ফেডারেশন সভাপতি মেহদি তাজসহ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে ভিসা না দেওয়ায় ইরান ড্র অনুষ্ঠান বয়কট করে। দেশটি এই সিদ্ধান্তকে ‘অক্রীড়াসুলভ’ বলে আখ্যা দেয়।
প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বয়কফ বলেছেন, বিশ্বকাপের ইতিহাসে যা কখনো ঘটেনি, তাই ঘটল ২০২৬ সালে। একটি দেশের বিরুদ্ধে সামরিক যুদ্ধ চালাতে চালাতে সেই দেশের খেলোয়াড়দের নিজের মাটিতে খেলার অনুমতি দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, তবে সীমিত শর্তে। ক্রীড়া ও রাজনীতির এই বিপজ্জনক মিশ্রণ ফুটবলের ইতিহাসে নজিরবিহীন।
এই অস্বাভাবিক বাস্তবতার আরেকটি উদাহরণ দেখা যায় ইরান-মিসর ম্যাচের দিন। ম্যাচ শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের হরমুজ প্রণালির কয়েকটি দ্বীপে বোমা হামলা চালায়। একদিকে আকাশে যুদ্ধবিমান, অন্যদিকে সেই দেশের খেলোয়াড়েরা বিশ্বকাপের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এমন বৈপরীত্য আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ইতিহাসে বিরল।
ফ্র্যাংকলিন ফোয়ার ‘হাউ সকার এক্সপ্লেইনস দ্য ওয়ার্ল্ড’ গ্রন্থে লিখেছেন, ফুটবল কখনো কখনো জাতীয়তাবাদ ও রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে এতটাই মিশে যায় যে খেলা ও রাজনীতির মধ্যে সীমারেখা বলতে কিছু থাকে না। ২০২৬ সালে সেই সীমারেখা শুধু মুছে যায়নি, সেটি রীতিমতো উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
জ্যাঁ বদ্রিয়ার ‘সিমুলাক্রা অ্যান্ড সিমুলেশন’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, আধুনিক গণমাধ্যম কীভাবে বাস্তবতার একটি কৃত্রিম সংস্করণ তৈরি করে মানুষের মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ করে। যুদ্ধের মাঠে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন, কিন্তু বিশ্ব গণমাধ্যম ব্যস্ত বিশ্বকাপের গোল বিশ্লেষণে। ১৯৩৪ সালে মুসোলিনির ইতালি ফ্যাসিবাদকে বৈশ্বিক মঞ্চে বৈধতা দিতে বিশ্বকাপ ব্যবহার করেছিল। ২০২৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কি ভিন্ন কিছু করেছে? প্রশ্নটি পাঠকের বিবেচনার জন্য রেখে গেলাম।
সোমালিয়ান রেফারি: আফ্রিকার সেরাকে ফেরানো হলো মায়ামি বিমানবন্দর থেকে:
ক্রীড়া ইতিহাসবিদ ডেভিড গোল্ডব্লাট ‘দ্য বল ইজ রাউন্ড’ গ্রন্থে লিখেছেন, বিশ্বকাপ যখন কোনো দেশের আয়োজনে হয়, তখন সেই দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা মাঠের বাইরেও প্রভাব ফেলার সুযোগ পায়। ২০২৬ সালে এই সত্যের সবচেয়ে মানবিক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠলেন একজন ৩৪ বছর বয়সী সোমালিয়ান রেফারি।
মোগাদিশুতে জন্ম নেওয়া ওমর আবদুলকাদির আরতান ২০১৮ সালে ফিফার তালিকাভুক্ত রেফারি হন। ২০২৫ সালে তিনি আফ্রিকার সেরা পুরুষ রেফারির স্বীকৃতি পান এবং ফিফার ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য নির্বাচিত ৫২ জন রেফারির একজন হন। তিন বছরের যাচাইপ্রক্রিয়ার পর ফিফা তাঁকে নির্বাচন করেছিল। তিনি হতেন বিশ্বকাপে রেফারিং করা প্রথম সোমালিয়ান।
২০২৬ সালের ৬ জুন আরতান ইস্তাম্বুল থেকে মায়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। মার্কিন কাস্টমস ও বর্ডার প্রোটেকশন তাঁকে ‘ভেটিং উদ্বেগের’ কারণ দেখিয়ে প্রবেশে বাধা দেয়। আরতান জানান, ঘণ্টার পর ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদে তাঁকে সোমালিয়ার রাজনীতি ও একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠী সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়। তাঁর কাছে কূটনৈতিক পাসপোর্ট এবং বৈধ ভিসা থাকা সত্ত্বেও তাঁকে ফেরত পাঠানো হয়।
হোয়াইট হাউসের বিশ্বকাপ টাস্কফোর্সের নির্বাহী পরিচালক অ্যান্ড্রু জিউলিয়ানি সিবিএস নিউজকে বলেন, আরতান ‘কিছু অত্যন্ত খারাপ মানুষের’ সঙ্গে কথা বলছিলেন। তিনি দাবি করেন, এ বিষয়ে কিছু গোপনীয় তথ্য রয়েছে যা এখনো প্রকাশ করা সম্ভব নয়। অথচ ফিফা তিন বছর ধরে যাচাইপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে আরতানকে নির্বাচন করেছিল। ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনো বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনক, কিন্তু আমরা সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না।’
নোয়াম চমস্কি তাঁর ‘হেজেমনি অর সার্ভাইভাল’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, সাম্রাজ্যবাদী শক্তি যখন কোনো আসরের আয়োজক হয়, তখন সেই আসরের নিয়মকানুনও তার রাজনৈতিক স্বার্থের অধীনে চলে আসে। আরতানের ক্ষেত্রে ঠিক এটাই ঘটেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আওতায় প্রায় ৪০টি দেশ রয়েছে, যার অধিকাংশই আফ্রিকার। এই নিষেধাজ্ঞা শুধু রাজনৈতিক নয়, এটি কার্যত বর্ণভিত্তিক বৈষম্যের একটি কাঠামো, যা বিশ্বকাপের মঞ্চে এসেও থামেনি।
হাওয়ার্ড জিন তাঁর ‘আ পিপলস হিস্ট্রি অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটস’ গ্রন্থে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার নামে সংখ্যালঘু ও দরিদ্র দেশের মানুষদের প্রান্তিক করা হয়েছে। আরতানের গল্প সেই দীর্ঘ ইতিহাসেরই একটি নতুন অধ্যায়।
ঘটনার কয়েক দিনের মধ্যেই উয়েফা আরতানকে পিএসজি ও অ্যাস্টন ভিলার মধ্যকার ইউরোপিয়ান সুপার কাপ ফাইনালের রেফারি হিসেবে নিয়োগ দেয়। যুক্তরাষ্ট্র যাকে নিরাপত্তা ঝুঁকি মনে করল, ইউরোপ তাকেই মহাদেশের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব দিল।
মোগাদিশুতে ফিরে হাজার হাজার সমর্থক আরতানকে কাঁধে তুলে নেন। তিনি বলেছেন, ‘যা হওয়ার হয়েছে। আমি পরের বিশ্বকাপে যাব।’
সোমালিয়া বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দেশ নয়, কিন্তু মোগাদিশুর স্টেডিয়াম সেদিন পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল—কোনো গোলের জন্য নয়, একজন মানুষের মর্যাদার জন্য।
পিয়েরে বুর্দিও তাঁর ‘দ্য লজিক অব প্র্যাকটিস’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানগুলো সমাজের বৃহত্তর ক্ষমতা কাঠামোর বাইরে নয়। আরতানের ঘটনা সেই সত্যের জীবন্ত প্রমাণ। ফুটবলের মাঠে পারফরম্যান্সের বদলে পাসপোর্টের দেশ দিয়ে যদি একজন রেফারিকে বিচার করা হয়, তাহলে বিশ্বকাপ কতটা সত্যিকারের ‘বিশ্বের কাপ’ থাকে, সেই প্রশ্নের উত্তর ইতিহাসই একদিন দেবে।
গণমাধ্যমকর্মী এবং শিক্ষার্থী, সোনারগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়
মতামত লেখকের নিজস্ব