ফিফা বিশ্বকাপ কীভাবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসর হয়ে উঠল
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ১৯৪২ ও ১৯৪৬ সালের বিশ্বকাপ বাতিল হয়। আবার ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার বাইরে থাকা দেশগুলোও দীর্ঘদিন বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। ধীরে ধীরে ফুটবল সত্যিকারের বৈশ্বিক খেলায় পরিণত হতে থাকে।
মারাকানাজো
১৯৫০ সালের বিশ্বকাপ ছিল ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় ও হৃদয়বিদারক অধ্যায়গুলোর একটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ১৯৪২ ও ১৯৪৬ সালের বিশ্বকাপ বাতিল হওয়ার পর দীর্ঘ ১২ বছর পর আবার মাঠে গড়ায় বিশ্বকাপ। আয়োজক ছিল ফুটবলপাগল দেশ ব্রাজিল। বিশ্বকাপকে ঘিরে তখন পুরো ব্রাজিল যেন স্বপ্ন দেখছিল নিজেদের প্রথম বিশ্ব শিরোপার।
এই বিশ্বকাপ উপলক্ষে নির্মাণ করা হয় কিংবদন্তি ‘মারাকানা স্টেডিয়াম’, যা সে সময় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্টেডিয়ামগুলোর একটি ছিল। ফাইনাল ম্যাচে ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ ছিল উরুগুয়ে। মজার বিষয় হলো, সেটি আনুষ্ঠানিক নকআউট ফাইনাল ছিল না; শেষ রাউন্ডের গ্রুপ পর্বের নির্ধারণী ম্যাচ ছিল। ব্রাজিলের কেবল ড্র করলেই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। সংবাদপত্রগুলো ম্যাচের আগেই ব্রাজিলকে চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করে ফেলেছিল। স্টেডিয়ামে উপস্থিত ছিল প্রায় দুই লাখ দর্শক, যা আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ দর্শকসমাগম। কিন্তু ইতিহাস লিখেছিল উরুগুয়ে।
দ্বিতীয়ার্ধে আলসিদেস ঘিঘিয়ার গোল ব্রাজিলকে স্তব্ধ করে দেয়। উরুগুয়ে ২-১ গোলে জয় পেয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়। এই ঘটনাই ইতিহাসে ‘মারাকানাজো’ নামে পরিচিত। বলা হয়, ম্যাচ শেষে পুরো ব্রাজিল যেন শোকের নগরীতে পরিণত হয়েছিল। অনেক দর্শক কান্নায় ভেঙে পড়েন, কেউ অসুস্থ হয়ে যান। সেই হারের ধাক্কায় ব্রাজিল তাদের ঐতিহ্যবাহী সাদা জার্সি বদলে পরে আজকের বিখ্যাত হলুদ-সবুজ জার্সি গ্রহণ করে। আজও ‘মারাকানাজো’ ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সবচেয়ে বেদনাদায়ক স্মৃতিগুলোর একটি।
বিশ্বকাপে দলসংখ্যা বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক বিস্তৃতি
বিশ্বকাপের জনপ্রিয়তা যত বাড়তে থাকে, ততই নতুন দেশগুলোর অংশগ্রহণের দাবি জোরালো হতে থাকে। ১৯৮২ সালে স্পেনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো দলের সংখ্যা ১৬ থেকে বাড়িয়ে ২৪ করা হয়। এর ফলে ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার বাইরের দেশগুলোর জন্য সুযোগ বাড়ে। পরে ১৯৯৮ সালে ফ্রান্স বিশ্বকাপ থেকে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩২-এ। এই সম্প্রসারণ বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্র বদলে দেয়। আফ্রিকা, এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার দলগুলো ধীরে ধীরে নিজেদের শক্তির জানান দিতে শুরু করে। ১৯৯০ বিশ্বকাপে ক্যামেরুন কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে পুরো বিশ্বকে চমকে দেয়। রজার মিলার নাচ আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত।
২০০২ সালে দক্ষিণ কোরিয়া সেমিফাইনালে পৌঁছে এশিয়ার ফুটবলে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। একই আসরে সেনেগাল তৎকালীন চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বকে অবাক করে দেয়। ২০১০ সালে ঘানা খুব কাছ থেকে আফ্রিকার প্রথম সেমিফাইনালিস্ট হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল, কিন্তু উরুগুয়ের বিপক্ষে নাটকীয় ম্যাচে পেনাল্টি শুটআউটে হেরে যায়। আর ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে ঘটে এক আশ্চর্য ঘটনা। মরক্কো প্রথম আফ্রিকান ও প্রথম আরব দেশ হিসেবে সেমিফাইনালে পৌঁছে পুরো বিশ্বকে বিস্মিত করে। তারা স্পেন ও পর্তুগালের মতো শক্তিশালী দলকে হারিয়ে প্রমাণ করে দেয় যে বিশ্ব ফুটবলের শক্তির ভারসাম্য ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। মরক্কোর সেই যাত্রা শুধু আফ্রিকার নয়, পুরো আরব বিশ্বের গর্বে পরিণত হয়েছিল।
যেভাবে বিশ্বকাপের জন্য দল বাছাই হয়
বিশ্বকাপে খেলার পথটাও সহজ নয়। প্রতিটি দলকে দীর্ঘ ও কঠিন বাছাইপর্ব অতিক্রম করতে হয়। ফিফার ছয়টি মহাদেশীয় কনফেডারেশন উয়েফা (ইউরোপ), কনমেবল (দক্ষিণ আমেরিকা), কনকাকাফ (উত্তর ও মধ্য আমেরিকা), এএফসি (এশিয়া), সিএএফ (আফ্রিকা) এবং ওএফসি (ওশেনিয়া) নিজ অঞ্চলে বাছাইপর্ব পরিচালনা করে। অনেক সময় বাছাইপর্ব দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে। আগে বিশ্বকাপজয়ী দল সরাসরি পরবর্তী বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেত। কিন্তু ২০০২ সালের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে ২০০৬ বিশ্বকাপের আগে বাছাইপর্ব খেলতে হওয়ার মাধ্যমে সেই নিয়ম পরিবর্তন করা হয়। বর্তমানে কেবল আয়োজক দেশ সরাসরি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়।
বিশ্বকাপের সম্প্রসারণ এখনো চলমান। ২০২৬ সাল থেকে বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে ৪৮টি দল, যা হবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো যৌথভাবে এই আসরের আয়োজন করছে। এটিই হতে যাচ্ছে প্রথম বিশ্বকাপ, যেখানে তিনটি দেশ একসঙ্গে আয়োজক। নতুন ফরম্যাটে ম্যাচের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, এবং আরও বেশি দেশ বিশ্বকাপের স্বপ্নপূরণের সুযোগ পাচ্ছে।
বৈশ্বিক অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও বিনোদন
বিশ্বকাপ শুধু খেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি এখন বৈশ্বিক অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও বিনোদনের অংশ। কোটি দর্শক টেলিভিশন ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিশ্বকাপ দেখে। কোকা-কোলা, অ্যাডিডাস, ম্যাকডোনাল্ডসের মতো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বিশ্বকাপের স্পনসর হয়ে নিজেদের ব্র্যান্ডকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেয়। ২০০৬ বিশ্বকাপের মোট দর্শকসংখ্যা ছিল প্রায় ২৬ বিলিয়ন। বিশ্বকাপের রয়েছে নিজস্ব মাসকট, অফিশিয়াল গান এবং বিশেষ ম্যাচ বল। ১৯৬৬ সালে ‘ওয়ার্ল্ড কাপ উইলি’ ছিল প্রথম বিশ্বকাপ মাসকট। আবার শাকিরার ‘ওয়াকা’ কিংবা ‘নেসুন দোরমা’-র মতো গান বিশ্বকাপের ইতিহাসে আলাদা আবেগ তৈরি করেছে।
পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের ফুটবলও এগিয়ে যাচ্ছে সমানতালে। ১৯৯১ সালে শুরু হয় ফিফা মহিলা বিশ্বকাপ। এর পর থেকে নারী ফুটবলের জনপ্রিয়তা দ্রুত বেড়েছে। এ ছাড়া ফিফা অনূর্ধ্ব-১৭, অনূর্ধ্ব-২০, ক্লাব বিশ্বকাপ, ফুটসাল বিশ্বকাপ ও বিচ সকার বিশ্বকাপের মতো বিভিন্ন টুর্নামেন্ট আয়োজন করে।
বিশ্বকাপ বিতর্ক
বিশ্বকাপের ইতিহাসে বিতর্কও কম নয়। ২০১৫ সালে ফিফা দুর্নীতি কেলেঙ্কারি বিশ্ব ফুটবলকে নাড়িয়ে দেয়। ঘুষ, অর্থ পাচার ও দুর্নীতির অভিযোগে একাধিক ফিফা কর্মকর্তা গ্রেপ্তার হন। সেই ঘটনার পর বিশ্ব ফুটবলের প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।
তবু সব বিতর্ক ছাপিয়ে বিশ্বকাপ আজও পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়া আসর। এটি শুধু গোল, জয় কিংবা ট্রফির গল্প নয়; এটি মানুষের স্বপ্ন, আবেগ, জাতীয় পরিচয় এবং বিশ্বকে একসুতায় বাঁধার গল্প। ১৮৭২ সালের ছোট্ট একটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ থেকে শুরু হয়ে আজকের এই বিশাল বিশ্বমঞ্চ ফিফা বিশ্বকাপের যাত্রা আসলে মানবসভ্যতার এক অনন্য ক্রীড়া ইতিহাস। সেই ইতিহাস এখনো প্রতি চার বছর পরপর নতুন করে লেখা হচ্ছে।
বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা