যেভাবে যাত্রা শুরু ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের

উরুগুয়ের মন্টিভিডিওতে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে উরুগুয়ের প্রথম গোল, ৩০ জুলাই ১৯৩০। ছবি: সংগৃহীত

ফুটবল এখন শুধুই একটি খেলা নয়; এটি কোটি মানুষের আবেগ, উন্মাদনা এবং বৈশ্বিক সংস্কৃতির এক অনন্য অধ্যায়। চার বছর পরপর বিশ্ব থমকে দাঁড়ায় একটি ট্রফির জন্য। রাস্তার মোড় থেকে রাজপ্রাসাদ, ছোট্ট চায়ের দোকান থেকে বিশাল স্টেডিয়াম সবখানেই তখন উচ্চারিত হয় এক নাম, ‘ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ’। কিন্তু আজকের এই জাঁকজমকপূর্ণ বিশ্বকাপের শুরুটা ছিল দীর্ঘ সংগ্রাম, স্বপ্ন আর ইতিহাসের পথ ধরে গড়ে ওঠা এক অভিযাত্রা।

ফুটবলের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ
বিশ্ব ফুটবলের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৭২ সালে স্কটল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের মধ্যে, স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো শহরে। সেটি ছিল একধরনের চ্যালেঞ্জ। এরপর ১৮৮৪ সালে শুরু হয় ‘ব্রিটিশ হোম চ্যাম্পিয়নশিপ’, যেখানে ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস এবং আয়ারল্যান্ড অংশ নেয়। তখনো ফুটবল পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েনি। তবে ইউরোপে ধীরে ধীরে এটি জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল।

বিশ্বব্যাপী ফুটবলের বিস্তার বাড়তে থাকলে ১৯০০ ও ১৯০৪ সালের অলিম্পিকে ফুটবল প্রদর্শনী খেলা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। যদিও তখন কোনো পদক দেওয়া হতো না। ১৯০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ফিফা ফেডারেশন ইন্টারন্যাশনাল দে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। ফুটবলকে বৈশ্বিক পরিচয় দেওয়ার উদ্দেশ্যে ১৯০৬ সালে অলিম্পিকের বাইরে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজনের চেষ্টা করা হলেও সেটি সফল হয়নি। তবু ফুটবলের বিশ্বমঞ্চ তৈরির স্বপ্ন থেমে থাকেনি।

১৯০৮ সালের লন্ডন অলিম্পিকে ফুটবল আনুষ্ঠানিক ক্রীড়া হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তবে সেখানে শুধু অপেশাদার খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল। গ্রেট ব্রিটেন সে আসরে স্বর্ণপদক জেতে এবং ১৯১২ সালেও সেই সাফল্যের পুনরাবৃত্তি করে।

১৯৩০ বিশ্বকাপ ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ে
ফিফা ফেসবুক পেজ

ফুটবল বিশ্বকাপের প্রথম আসর
ফুটবল তখনো এমন একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার অপেক্ষায় ছিল, যেখানে বিশ্বের সেরা দলগুলো নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করবে। এই স্বপ্নটিকে বাস্তবে রূপ দেন ফিফা সভাপতি জুলে রিমে। অলিম্পিক ফুটবলের জনপ্রিয়তা দেখে তিনি বুঝতে পারেন, ফুটবলের জন্য আলাদা বিশ্ব টুর্নামেন্ট আয়োজনের সময় এসে গেছে। ১৯২৮ সালে আমস্টারডামে অনুষ্ঠিত ফিফা কংগ্রেসে সিদ্ধান্ত হয় চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত হবে ফুটবলের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ ‘ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ’।

প্রথম বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পায় উরুগুয়ে। সে সময় উরুগুয়ে ছিল অলিম্পিক ফুটবলের দুইবারের চ্যাম্পিয়ন এবং দেশটি তাদের স্বাধীনতার শতবর্ষ উদ্‌যাপন করছিল। তবে তখন বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া মোটেও সহজ ছিল না। ইউরোপ থেকে দক্ষিণ আমেরিকায় জাহাজে করে যেতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগত। উপরন্তু তখন চলছিল মহামন্দা। ফলে অনেক ইউরোপীয় দেশ অংশ নিতে আগ্রহ দেখায়নি। শেষ পর্যন্ত মাত্র ১৩টি দেশ অংশ নেয় প্রথম বিশ্বকাপে।

আরও পড়ুন

১৯৩০ সালের ১৩ জুলাই, ফুটবল ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় দিন। সেদিন উরুগুয়ের রাজধানী মন্টেভিডিওতে শুরু হয় ইতিহাসের প্রথম ফিফা বিশ্বকাপ। বহুল প্রতীক্ষিত এই টুর্নামেন্ট ঘিরে পুরো উরুগুয়েজুড়ে উৎসবের আবহ। যদিও আজকের মতো শত দল বা কোটি দর্শকের উন্মাদনা তখন ছিল না, তবু ফুটবলকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল নতুন এক যুগ। প্রথম বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হয়েছিল মন্টেভিডিওর তিনটি স্টেডিয়ামে— এস্তাদিও সেন্টেনারিও, পার্কে সেন্ট্রাল এবং পোসিতোস স্টেডিয়ামে। এর মধ্যে এস্তাদিও সেন্টেনারিও ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভেন্যু। উরুগুয়ের স্বাধীনতার শতবর্ষ উপলক্ষে নির্মিত এই স্টেডিয়ামটি তখন দক্ষিণ আমেরিকার অন্যতম আধুনিক ক্রীড়াঙ্গন হিসেবে বিবেচিত হতো। প্রবল বৃষ্টির কারণে স্টেডিয়ামের নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় প্রথম কয়েকটি ম্যাচ অন্য মাঠে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। পরে ফাইনালের জন্য প্রস্তুত করা হয় বিশাল এই স্টেডিয়াম।

বিশ্বকাপের প্রথম দুটি ম্যাচ একই দিনে অনুষ্ঠিত হয়। এক ম্যাচে ফ্রান্স মুখোমুখি হয় মেক্সিকোর, অন্য ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্র খেলেছিল বেলজিয়ামের বিপক্ষে। ফ্রান্স বনাম মেক্সিকো ম্যাচেই সৃষ্টি হয় ইতিহাস। ম্যাচের ১৯তম মিনিটে ফরাসি ফুটবলার লুসিয়েন লরেন্ট জোরালো এক শটে গোল করেন এবং বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম গোলদাতা হিসেবে নিজের নাম লিখে ফেলেন ইতিহাসের পাতায়। সেই ম্যাচে ফ্রান্স ৪-১ গোলে জয় পায়। পরে লুসিয়েন লরেন্ট এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তখন বুঝতেই পারেননি যে তিনি এমন একটি ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছেন, যা ভবিষ্যতে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আয়োজন হয়ে উঠবে।

টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছিল মাত্র ১৩টি দেশ। দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ছিল উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, চিলি, প্যারাগুয়ে, পেরু ও বলিভিয়া। ইউরোপ থেকে অংশ নেয় ফ্রান্স, বেলজিয়াম, যুগোস্লাভিয়া ও রোমানিয়া। উত্তর আমেরিকা থেকে ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো। আজকের মতো দীর্ঘ বাছাইপর্ব তখন ছিল না; আমন্ত্রণের ভিত্তিতেই দলগুলো অংশগ্রহণ করেছিল।

১৯৩০ বিশ্বকাপ ফাইনালের বল। ম্যানচেস্টারে ফুটবল জাদুঘরে শোভা পাচ্ছে বলটি
এএফপি

বিশ্বকাপ ফাইনাল
ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয় ৩০ জুলাই, ১৯৩০ সালে। মুখোমুখি হয় দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনা। ম্যাচটি ঘিরে উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে। দুই দেশের সমর্থকদের মধ্যে উত্তাপ এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে নিরাপত্তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হয়। এমনকি ম্যাচে কোন বল ব্যবহার করা হবে তা নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার পছন্দের বল এবং দ্বিতীয়ার্ধে উরুগুয়ের পছন্দের বল ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রায় ৯৩ হাজার দর্শকে পরিপূর্ণ এস্তাদিও সেন্টেনারিও স্টেডিয়াম তখন যেন এক অগ্নিগর্ভ পরিবেশ। প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে এগিয়ে থাকলেও দ্বিতীয়ার্ধে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করে উরুগুয়ে। শেষ পর্যন্ত ৪-২ গোলে জয় পেয়ে ইতিহাসের প্রথম বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে তারা।

ম্যাচ শেষে পুরো উরুগুয়ে আনন্দে উল্লাসে ফেটে পড়ে। সরকার পরদিন জাতীয় ছুটি ঘোষণা করেছিল। অন্যদিকে আর্জেন্টিনায় সেই পরাজয়ের ক্ষোভে অনেক জায়গায় বিক্ষোভও হয়েছিল।

বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা