পৃথিবীর তাপমাত্রা কখনো গরম কখনো ঠান্ডা হয় কেন

প্রতীকী ছবি

পৃথিবীর তাপমাত্রা কখনো গরম আবার কখনো শীতল হয়ে যায়। প্রতিবছর একেক সময়ে একেকরকম বৈচিত্র্য দেখতে পাই। অনেকেই মনে করে, এসবের পেছনে রয়েছে ঋতু পরিবর্তনের প্রভাব। আবহাওয়া ও জলবায়ুর পরিবর্তনও দেখা যায়। কিন্তু এই ঋতু কিংবা আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের পেছনের প্রকৃত কারণ কী, সে সম্পর্কে অনেকের মধ্যে ভুল ধারণা রয়েছে। তাই ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে তাপমাত্রা বৃদ্ধি কিংবা হ্রাস পাওয়ার সংযোগ সম্পর্কে জানা জরুরি।

অনেকেই এল নিনো এবং লা নিনো সম্পর্কে পরিচিত। এ দুটি শব্দ সম্পর্কে হয়তো সবার কম-বেশি জানাশোনা রয়েছে। এল নিনো এবং লা নিনোর প্রভাবের ফলে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন হয়। এতে পৃথিবীর তাপমাত্রা কখনো উষ্ণ হয়, আবার কখনো শীতল হয়। এসবের প্রভাবে পৃথিবীতে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, খরা, কালবৈশাখী, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা এবং শৈত্যপ্রবাহ দেখা দেয়। প্রকৃতির এমন ভারসাম্যহীন আচরণের কারণে জীবজগৎ হুমকির মুখে পড়ে।

এল নিনোর প্রভাবে প্রকৃতিতে পরিবর্তনীয় দিক
এল নিনো একটি স্প্যানিশ শব্দ, যার অর্থ ‘ছোট বালক’। এটি জলবায়ু পরিবর্তনীয় ঘটনা এবং এর প্রভাবে মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থানরত সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। পেরুর জেলে ও নাবিকেরা উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে ডিসেম্বর এবং জানুয়ারি মাসে উষ্ণ স্রোত দেখা যাওয়ার কারণে এল নিনো শব্দের নামকরণ করেন। সাধারণত প্রতি ২ থেকে ৭ বছর পর্যন্ত এল নিনোর প্রভাব দেখা দেয় এবং এর স্থায়িত্ব হয় সর্বোচ্চ প্রায় ১৮ মাস পর্যন্ত।

সাধারণত মার্চ থেকে জুনের মধ্যে এল নিনোর বিকাশ শুরু হয় এবং এর বিপরীত দিক ‘লা নিনো'র মধ্যে পর্যায়ক্রমে পরিবর্তন ঘটে। মাঝখানে স্বাভাবিক বা নিরপেক্ষ পরিস্থিতি বজায় থাকে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মতে, এল নিনোকে দুর্বল, মাঝারি, শক্তিশালী ও অত্যন্ত শক্তিশালী হিসেবে চার শ্রেণিতে ভাগ করা হয়ে থাকে। এ ছাড়া, এল নিনোর অবস্থানগত আরও প্রভাব দেখা যায়, পশ্চিম ও দক্ষিণ আমেরিকায় সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি, পেরুভিয়ান অঞ্চলের সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি এবং দক্ষিণ আমেরিকায় ভারী বৃষ্টিপাত হওয়া আর অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ায় তাপমাত্রা ও খরা দেখা দেওয়া। এ ক্ষেত্রে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে এল নিনোর প্রভাব চরম পর্যায়ে বৃদ্ধি পেলেও তাপমাত্রা কয়েক মাস পর বাড়তে দেখা যায়।

লা নিনোর প্রভাবে কেমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়
লা নিনো সাধারণত এল নিনোর বিপরীত অবস্থান হিসেবে কাজ করে। স্প্যানিশ ভাষায় লা নিনো শব্দের অর্থ ‘ছোট মেয়ে’। এটি পূর্ব ও মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরের শক্তিশালী স্থায়ীভাবে নির্দিষ্ট দিকে প্রবাহিত বায়ুর কারণে সৃষ্টি হয়, যা বৈশ্বিক আবহাওয়াকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে সৃষ্ট একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে আরও ঠান্ডা হওয়ার ফলে লা নিনোর উৎপত্তি ঘটে। এর প্রভাবে পশ্চিম ও দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চলের সমুদ্রের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ঠান্ডা হতে থাকে। আর অস্ট্রেলিয়ায় ভারী বৃষ্টি এবং বন্যা দেখা দেয়।

অন্যদিকে, পূর্ব উপকূলের সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে বসন্ত আর গ্রীষ্মে বেশি ঘূর্ণিঝড় দেখা দেয়। লা নিনোর প্রভাব ৯ থেকে ১২ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়, তবে কখনো কখনো ১ থেকে ৩ বছর পর্যন্ত স্থায়িত্ব হতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপের তাপপ্রবাহ
চলিত বছরের মাঝামাঝি সময়ে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ইউরোপের গ্রীষ্মকালীন উত্তাপ আরও তীব্র ও রেকর্ডভাঙা হয়ে ওঠে। ইউরোপের ২৭টি দেশের তথ্য অনুযায়ী, এই নজিরবিহীন তাপপ্রবাহের সপ্তাহে সব কারণ মিলিয়ে ১০ হাজার ৬৫০ জন অতিরিক্ত মানুষের মৃত্যু হয়। গত ২২ থেকে ২৮ জুন মধ্যকার সময়ে ইউরোপের পশ্চিমাঞ্চলে এই তাপপ্রবাহ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল। সেই সময়ে ফ্রান্স, স্পেন, ব্রিটেন ও অন্যান্য দেশে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়।

গত ১৩ জুলাই প্রকাশিত একটি গবেষণায় অনুমান করা হয়, মে ও জুনের তাপপ্রবাহে শুধু ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ২ হাজার ৭০০-র বেশি মানুষের তাপজনিত মৃত্যু হয়েছে। বেলজিয়ামের জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট সায়েন্সানোর তথ্যমতে, ২০০০ সালে বিশ্লেষণ শুরুর পর থেকে কোনো তাপপ্রবাহে দেশটিতে এত বেশি অতিরিক্ত মৃত্যু আগে দেখা যায়নি।

মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বা জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ইউরোপের আকাশে একটি উচ্চচাপ বলয় সৃষ্টি হয়। বলয়টি আফ্রিকান সাহারা মরুভূমি থেকে আসা তাপপ্রবাহকে ইউরোপের আকাশে আটকে দেয়। ফলে পশ্চিমাঞ্চলে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ ও ব্যাপক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।

দক্ষিণ এশিয়ায় কেমন প্রভাব দেখা দেয়?
এল নিনোর প্রভাবের ফলে পূর্বের বায়ু দুর্বল হয়ে পড়লে দিক পরিবর্তন করে উল্টো দিকে বা পশ্চিমে বইতে শুরু করে, তখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের অস্ট্রেলিয়া থেকে শুরু করে দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারসহ পুরো অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে যায়। বাতাসের দিক পরিবর্তনের কারণে জলীয় বাষ্পের অভাবে আকাশে মেঘ তৈরি হতে পারে না; এতে বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার থেকে শুরু করে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত সব অঞ্চলে দেখা দেয় বৃষ্টির অভাব, বেড়ে যায় তাপমাত্রা এবং শুকিয়ে যায় মাটি। দেখা দেয় খরা। যার কারণে প্রতিবছর বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে নিরাপদ পানি ও খাদ্যের সংকট দেখা দেয়। মাটির ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যায়, কৃষি জমি ও ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়। নদী শুকিয়ে মরুভূমি হয়ে যায়। বাংলাদেশে এল নিনোর প্রভাবে গ্রীষ্মকালে রেকর্ডভাঙা তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি থেকে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে দেখা দেয় এবং দীর্ঘস্থায়ী তীব্র তাপপ্রবাহের সৃষ্টি হয়।

অন্যদিকে, লা নিনোর প্রভাবে বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ এবং শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয়, যা বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ সমস্যার সৃষ্টি করে। বঙ্গোপসাগর থেকে ধেয়ে আসা দক্ষিণ ও পশ্চিম মৌসুমী বায়ু অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এর ফলে বর্ষাকালে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি এবং একটানা ভারী বৃষ্টিপাত হয়। মানুষের ভোগান্তি বেড়ে যায়। প্রধান নদীসমূহের মধ্যে যমুনা, পদ্মা, মেঘনা, শীতলক্ষ্যা, ব্রহ্মপুত্র ও কর্ণফুলী নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে দেশের উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাস ও দীর্ঘস্থায়ী বন্যার সৃষ্টি করে। উপকূলীয় গ্রামাঞ্চল পানিতে প্রবাহিত হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়ক ডুবে যায়। যাতায়াত ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটে। লা নিনোর প্রভাবজনিত সময়ে বাংলাদেশে শীতকালে তীব্র শৈত্যপ্রবাহের প্রকোপ দেখা দিতে পারে।

আরও পড়ুন

জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এল নিনো ও লা নিনোর প্রভাব
জলবায়ু পরিবর্তন এল নিনো ও লা নিনোর প্রভাবকে আরও তীব্র করে তোলে, কারণ উষ্ণ সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলে চরম আবহাওয়ার জন্য শক্তি ও আর্দ্রতা বেশি থাকে। মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের কারণে এল নিনো বর্তমান সময়ে আগের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠছে বলে সাম্প্রতিক গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে। সেইসঙ্গে সাময়িকভাবে বৈশ্বিক তাপমাত্রাকে কখনো বাড়িয়ে আবার কখনো কমিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের সংকটের ওপর প্রভাব সৃষ্টি করছে। যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এ ২৭ আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত পালিওক্লাইমেট বিজ্ঞানী ড. জুলিয়া কোলের একটি যুগান্তকারী গবেষণা থেকে জানা যায়, শিল্প বিপ্লবের আগের তুলনায় বর্তমানের এল নিনো ৩৬ শতাংশ বেশি শক্তিশালী এবং বিগত ৪০ বছরের তুলনায় এর তীব্রতা ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এল নিনোর ঘটনার সংখ্যা বা তীব্রতা বাড়ছে, এর নিশ্চিত প্রমাণ এখনো নেই।

আরও পড়ুন

ভবিষ্যৎ পৃথিবী নিয়ে বিজ্ঞানীদের গবেষণা
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় এল নিনোর প্রভাব এখন দ্বিগুণ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 'ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন' নামক সংস্থার একদল আবহাওয়াবিদের মতে, এল নিনো এবং লা নিনো চক্রটি সাধারণত প্রাকৃতিকভাবেই ঘটে থাকে। কিন্তু মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমান সময়ে একটি 'অতিরিক্ত জ্বালানি' হিসেবে কাজ করছে। এর ফলে আগে যেসব সাধারণ খরা বা সাধারণ বৃষ্টি দেখা যেত, এখন তা চরম মানবিক বিপর্যয় এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিকখাতে ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতিতে রূপান্তর করছে।

এ ছাড়া লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের গ্রান্থাম ইনস্টিটিউট-এর একদল বিজ্ঞানী সতর্ক করে বলেছেন যে, ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনে কপ ২১–এর প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী, যদি বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যেও সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব হয়, তবু জলবায়ু ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তনের কারণে আগামী অন্তত এক শতাব্দী পর্যন্ত অত্যন্ত তীব্র ও ধ্বংসাত্মক এল নিনো এবং লা নিনোর ধ্বংসাত্মক প্রভাবের সম্মুখীন হতে হবে বিশ্ববাসীকে।

বন্ধু, কক্সবাজার বন্ধুসভা