কটিয়াদীর ঢাকের হাট: ৪০০ বছরের ঐতিহ্য
দুর্গাপূজা মানেই ঢাকের বাদ্য। মহাষষ্ঠীতে প্রতিমার বোধন থেকে শুরু করে বিজয়া দশমীর বিসর্জন—পূজার প্রতিটি পর্বে ঢাকের তালে মুখর হয়ে ওঠে মণ্ডপ। সেই ঢাকের বাদক দল খুঁজে নিতে দুর্গাপূজার আগে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে বসে এক ব্যতিক্রমী হাট। এটি ঢাকের হাট। এখানে ঢাক বিক্রির চেয়ে বড় হয়ে ওঠে ঢাকিদের দক্ষতা, বাদক দলের বায়না এবং শতাব্দীপ্রাচীন এক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে ঢাকিদের এই সমাবেশ কটিয়াদীর স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয়ে পরিণত হয়েছে।
প্রতিষ্ঠার ইতিহাস
কটিয়াদীর ঢাকের হাটের সূচনাকে ঘিরে স্থানীয় জনশ্রুতিতে উঠে আসে রাজা নবরঙ্গ রায়ের নাম। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, তাঁর রাজপ্রাসাদে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হতো। পূজার আনুষ্ঠানিকতা সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে প্রয়োজন হতো দক্ষ ঢাকি ও বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের। জনশ্রুতি অনুসারে, ঢাকিদের খোঁজে বিক্রমপুর অঞ্চলে বার্তা পাঠানো হতো। সেখান থেকে ঢাকিরা নৌপথে এসে সমবেত হতেন পুরোনো ব্রহ্মপুত্র নদের তীরের যাত্রাঘাটে। সেখানে রাজা নিজে দাঁড়িয়ে ঢাকিদের বাজনা শুনে পছন্দের দল নির্বাচন করতেন। এই সমাবেশ থেকেই ধীরে ধীরে ঢাকের হাটের প্রচলন হয় বলে ধারণা করা হয়।
ঢাকিদের সমাবেশ থেকে ঐতিহ্যের বিস্তার
একসময় দুর্গাপূজার আয়োজকদের জন্য দূরদূরান্ত থেকে দক্ষ ঢাকির দল খুঁজে বের করা সহজ ছিল না। অন্যদিকে ঢাকিদেরও পূজার মৌসুমে কাজ পাওয়ার জন্য বিভিন্ন এলাকায় যেতে হতো। একটি নির্দিষ্ট স্থানে শিল্পীদের সমবেত করার ব্যবস্থা উভয় পক্ষের জন্যই সুবিধাজনক হয়ে ওঠে।
প্রথম দিকে যাত্রাঘাট এলাকায় ঢাকিদের সমাবেশ ঘটত। পরে হাটটি কটিয়াদীর পুরান বাজার এলাকায় স্থানান্তরিত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি শুধু শিল্পী বাছাইয়ের জায়গা নয়, বরং বিভিন্ন এলাকার ঢাকিদের মিলনকেন্দ্রে পরিণত হয়।
এখানে শিল্পীরা নিজেদের বাদ্য পরিবেশন করেন, আয়োজকেরা তাঁদের দক্ষতা যাচাই করেন এবং পূজার দিনগুলোর জন্য চুক্তি করেন। এভাবেই ধর্মীয় প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আয়োজনটি সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব অর্জন করে।
কেন এই হাটের জন্ম
দুর্গাপূজার সঙ্গে ঢাকের সম্পর্ক বহু পুরোনো। পূজামণ্ডপে ঢাকের আওয়াজ শুধু উৎসবের আবহ তৈরি করে না, এটি পূজার ঐতিহ্য ও আনুষ্ঠানিকতারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কটিয়াদীর ঢাকের হাটের মূল উদ্দেশ্য ছিল দক্ষ বাদক দল খুঁজে নেওয়া এবং পূজার আয়োজকদের সঙ্গে শিল্পীদের যোগাযোগ তৈরি করা। পূজার আয়োজকেরা সরাসরি বাজনা শুনে দলের দক্ষতা, পরিবেশনার মান ও পারিশ্রমিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। অন্যদিকে ঢাকিরা এক জায়গায় এসে কাজ পাওয়ার সুযোগ পান। এই হাট তাই একদিকে দুর্গাপূজার বাদ্যসংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার মাধ্যম, অন্যদিকে মৌসুমি পেশার সঙ্গে যুক্ত শিল্পীদের জীবিকা অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
কেন বিখ্যাত কটিয়াদীর ঢাকের হাট
কটিয়াদীর ঢাকের হাটের বিশেষত্ব হলো, এখানে মূলত ঢাক নয়, ঢাকির দল ও তাঁদের পরিবেশনা ঘিরেই চলে দরদাম। ঢাক, ঢোল, কাঁসর, সানাই, বাঁশি ও করতালের সম্মিলিত বাদ্য হাটকে উৎসবমুখর করে তোলে। এই হাটের কয়েকটি বিশেষ দিক রয়েছে।
১. ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা: কয়েক শতাব্দী ধরে চলে আসার জনশ্রুতি ও প্রজন্মান্তরে শিল্পচর্চার কারণে হাটটির আলাদা পরিচিতি তৈরি হয়েছে।
২. শিল্পীদের দক্ষতা যাচাই: পূজার আয়োজকেরা সরাসরি বাজনা শুনে পছন্দের দল বেছে নিতে পারেন। ফলে শিল্পীদের দক্ষতা প্রদর্শনের সুযোগ তৈরি হয়।
৩. সাংস্কৃতিক মিলনমেলা: বিভিন্ন এলাকার ঢাকি ও বাদ্যযন্ত্রশিল্পীরা এখানে মিলিত হন। তাঁদের বাদ্যযন্ত্র, পরিবেশনার ধরন ও অভিজ্ঞতার মধ্যে বৈচিত্র্য দেখা যায়।
৪. জীবিকার সুযোগ: দুর্গাপূজার মৌসুমে বায়না পাওয়ার মাধ্যমে শিল্পীরা আয় করেন। তাঁদের পরিবারের জীবিকাতেও এই আয়ের ভূমিকা থাকে।
৫. কটিয়াদীর পরিচিতি: দুর্গাপূজাকে ঘিরে এই হাট কটিয়াদীকে দেশের সাংস্কৃতিক মানচিত্রে স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছে।
যেসব অঞ্চল থেকে আসেন ঢাকিরা
কটিয়াদীর ঢাকের হাটে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ঢাকি ও বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের সমাগম ঘটে। মুন্সিগঞ্জের বিক্রমপুর, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, ঢাকার আশপাশের বিভিন্ন এলাকা, হবিগঞ্জসহ অন্তত ১০টি জেলা থেকে আসে বাদক দল।
বিক্রমপুর অঞ্চলের সঙ্গে হাটটির ঐতিহাসিক যোগাযোগের কথা স্থানীয় জনশ্রুতিতে পাওয়া যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন জেলার বাদক দল এখানে আসতে শুরু করায় হাটটির পরিসর ও পরিচিতি বিস্তৃত হয়েছে।
হাটে এসে শিল্পীরা নিজেদের বাদ্য পরিবেশন করেন। পূজার আয়োজকেরা দলের সদস্যসংখ্যা, বাজনার মান, অভিজ্ঞতা, যাতায়াতের দূরত্ব ও পারিশ্রমিক বিবেচনা করে চুক্তি করেন। কোনো দল বেশি পারিশ্রমিক পায়, আবার কোনো দলকে প্রত্যাশার চেয়ে কম দরেও সন্তুষ্ট থাকতে হয়।
ঐতিহ্য রক্ষায় প্রয়োজন পরিকল্পিত উদ্যোগ
হাটটি এখনো শিল্পীদের কাজ পাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। তবে ঐতিহ্যের এই আয়োজনকে আরও সুসংগঠিত করার প্রয়োজন রয়েছে।
• অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা: দূরদূরান্ত থেকে আসা শিল্পীদের বিশ্রাম, নিরাপদ পানি, শৌচাগার ও থাকার সুবিধা পর্যাপ্ত হওয়া জরুরি। বিশ্রামাগার নির্মাণ বা উন্নয়নকাজ থাকলে তা সম্পন্ন করে ব্যবহারোপযোগী করা প্রয়োজন।
• আয়ের অনিশ্চয়তা: হাটে এসে সব দল বায়না পায় না। যাতায়াত, থাকা ও খাওয়ার খরচ বহন করেও অনেক শিল্পীকে খালি হাতে ফিরতে হতে পারে।
• প্রযুক্তির প্রভাব: মুঠোফোনে যোগাযোগ ও আগাম চুক্তির সুযোগ বাড়ায় অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি হাটে আসার প্রয়োজন কমছে। এতে হাটের ঐতিহ্যবাহী সমাবেশের ওপর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
• ইতিহাস সংরক্ষণের ঘাটতি: হাটটির সুনির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠাকাল, প্রতিষ্ঠাতার পরিচয় ও স্থানান্তরের ইতিহাস নিয়ে নির্ভরযোগ্য নথি সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ইতিহাস আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে।
কটিয়াদীর ঢাকের হাটের পরিচয় শুধু এর বয়সের হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর আসল শক্তি ঢাকিদের শিল্প, তাঁদের জীবনসংগ্রাম এবং দুর্গাপূজাকে ঘিরে গড়ে ওঠা দীর্ঘ সাংস্কৃতিক চর্চায়।
ঢাকের হাটকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে ঐতিহ্যের গল্প বলার পাশাপাশি শিল্পীদের জীবন ও বাস্তবতার কথাও বলতে হবে। ইতিহাস সংরক্ষণ, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন, ন্যায্য পারিশ্রমিক এবং পরিকল্পিত সাংস্কৃতিক উদ্যোগের সমন্বয় ঘটলে কটিয়াদীর এই হাট ভবিষ্যতেও দুর্গাপূজার বাদ্যসংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ মিলনকেন্দ্র হয়ে থাকতে পারে।
বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা