নামহীন দুর্গ; চাঁদপুরের সাহেবগঞ্জের অজানা ইতিহাস
চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জের সাহেবগঞ্জে গেলে এমন একটি দৃশ্য চোখে পড়বে, যা প্রথম দেখায় খুব সাধারণ বলেই মনে হতে পারে। গ্রামের সরু রাস্তা, দুই পাশে বাড়িঘর, সবুজ মাঠ আর মানুষের প্রতিদিনের ব্যস্ততা। এর মধ্যেই কোথাও দেখা যায় পুরোনো ইটের দেয়াল। দেয়ালটি একটু এগিয়ে গেলে আবার হারিয়ে যায় ঝোপঝাড়ের আড়ালে, তারপর অন্য জায়গায় আবার দেখা দেয়। মনে হয়, কোনো একসময় এখানে বড় কিছু ছিল। আরও ভেতরে গেলে রহস্যটা আরও গভীর হয়। পুরোনো দেয়ালের পাশে ভাঙা কক্ষের সারি, পুকুর, ছড়িয়ে থাকা ইট আর একটি উঁচু কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে সেটিকে দুর্গের মিনারের মতো মনে হয়। কিন্তু সেখানে নেই কোনো বড় সাইনবোর্ড, নেই পর্যটনকেন্দ্রের পরিচিতি, নেই এমন কোনো ফলক যেখানে লেখা আছে এই স্থাপনাটি কার, কত বছরের পুরোনো, কেন নির্মিত হয়েছিল।
স্থানীয় মানুষের কাছে জায়গাটি বহুদিনের পরিচিত। কিন্তু এর ইতিহাস নিয়ে তাঁদের কথাতেই সবচেয়ে বেশি ভিন্নতা। কেউ বলেন এটি পর্তুগিজদের তৈরি দুর্গ, কেউ বলেন ব্রিটিশ আমলের নীলকুঠি, আবার কেউ এর সঙ্গে জমিদারবাড়ি বা ঔপনিবেশিক কোনো বড় স্থাপনার সম্পর্ক খুঁজে পান। অর্থাৎ স্থাপনাটি আছে, তার ধ্বংসাবশেষ আছে, কিন্তু তার পরিচয়টাই যেন হারিয়ে গেছে।
সাহেবগঞ্জ অবস্থিত চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার রূপসা ইউনিয়নে। চাঁদপুর জেলা সদর থেকে ডাকাতিয়া নদী পার হয়ে আঞ্চলিক সড়ক ধরে ফরিদগঞ্জের দিকে যেতে হয়। চাঁদপুর জেলার সরকারি তথ্যপত্রে এই স্থাপনাটিকে ‘পঞ্চদশ শতকের সাহেবগঞ্জ দুর্গ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, এটি একটি পর্তুগিজ দুর্গ এবং ১৫৪০ থেকে ১৫৪৬ সালের মধ্যে নির্মিত হয়েছিল। স্থানীয়ভাবে এটি ‘সাহেবগঞ্জ নীলকুঠি’ নামেও পরিচিত। সরকারি এই বর্ণনা সত্য হলে সাহেবগঞ্জের ইতিহাস আরও পুরোনো এবং বিস্ময়কর। কারণ, ষোড়শ শতাব্দীতে বাংলার নদীপথ ছিল বাণিজ্য ও যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। ইউরোপীয় বণিকদের আগমন তখন বাংলার বিভিন্ন নদীবন্দর ও বাণিজ্যকেন্দ্রকে ঘিরে বাড়ছিল। নদীঘেরা চাঁদপুর অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থানও এ ধরনের যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
এখানেই শুরু হয় সাহেবগঞ্জের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। এ স্থাপনাটি আসলে পর্তুগিজ দুর্গ, নাকি ব্রিটিশ আমলের কোনো স্থাপনা?
২০২৬ সালের মে মাসে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে সাহেবগঞ্জের ধ্বংসাবশেষ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয়দের মধ্যে স্থাপনাটির পরিচয় নিয়ে একমত কোনো ধারণা নেই। কেউ ব্রিটিশদের কথা বলেন, কেউ পর্তুগিজদের, আবার কেউ একে নীলকুঠি হিসেবে চেনেন। কিন্তু স্থাপনাটির পরিচয় নিশ্চিত করার মতো কোনো দৃশ্যমান সরকারি তথ্যফলক সেখানে নেই।
প্রতিবেদনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমানের মতামতও নেওয়া হয়। স্থাপনার নির্মাণশৈলী, বিন্যাস ও অবশিষ্ট কাঠামো দেখে তিনি এটিকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করেন। তাঁর মতে, এটি বড় কোনো জমিদারবাড়ি বা ঔপনিবেশিক কমপ্লেক্সের অংশ হয়ে থাকতে পারে। তিনি একই সঙ্গে স্থাপনাটিকে নীলকুঠি হিসেবে চিহ্নিত করার দাবির ব্যাপারেও প্রশ্ন তুলেছেন।
অর্থাৎ সাহেবগঞ্জের ইতিহাসে এখন দুটি আলাদা বর্ণনা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে সরকারি জেলা-তথ্যপত্রে পর্তুগিজ দুর্গের কথা বলা হয়েছে, অন্যদিকে সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণে ব্রিটিশ আমলের স্থাপনার সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে। এই দুই দাবির মধ্যে কোনটি সঠিক, তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন আরও প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান, স্থাপত্য বিশ্লেষণ ও ঐতিহাসিক নথি পরীক্ষা।
স্থাপনাটির আকারও কম বিস্ময়কর নয়। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে পুরোনো মোটা ইটের দেয়াল, দীর্ঘ করিডরের মতো অংশ, ভাঙা কক্ষ, উঁচু টাওয়ার বা পর্যবেক্ষণ কাঠামো, পুকুর এবং আরও কিছু ধ্বংসাবশেষের কথা উঠে এসেছে। স্থানীয়দের কেউ পুরোনো আস্তাবলের কথাও বলেছেন। তবে এসব স্থানীয় বর্ণনার সবকিছু ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত নয়—এ বিষয়টি মনে রাখা জরুরি।
এই ধ্বংসাবশেষের গঠন ও বিস্তৃতি যতটা কৌতূহল তৈরি করে, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি হয় এর প্রকৃত পরিচয় নিয়ে। স্থানীয়ভাবে জায়গাটি ‘সাহেবগঞ্জ নীলকুঠি’ নামে পরিচিত হলেও এটি আদৌ নীলকুঠি ছিল কি না, নাকি অন্য কোনো ধরনের ঔপনিবেশিক স্থাপনা তা নিয়ে এখনো মতভেদ রয়েছে।
বাংলার ঔপনিবেশিক ইতিহাসে নীলকুঠি বলতে সাধারণত নীল চাষ ও নীল প্রক্রিয়াজাতকরণের সঙ্গে যুক্ত ইউরোপীয় বাণিজ্যিক স্থাপনাকে বোঝানো হয়। সেই অর্থে সাহেবগঞ্জের ধ্বংসাবশেষকে নীলকুঠি হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক মতামতে এ পরিচয় নিয়েই সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে ‘সাহেবগঞ্জ নীলকুঠি’ নামটি স্থানীয়ভাবে প্রচলিত এবং সরকারি স্থানীয় পর্যায়ের নথিতেও ব্যবহৃত হলেও এটিকে চূড়ান্ত প্রত্নতাত্ত্বিক পরিচয় হিসেবে ধরে নেওয়ার আগে আরও গবেষণা ও প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান প্রয়োজন।
আরও একটি আকর্ষণীয় বিষয় হলো, স্থানীয়দের মুখে শোনা যায় এখানে একসময় ঘোড়া রাখার জায়গা ছিল এবং পুরোনো কিছু পথ বা সুড়ঙ্গের অস্তিত্বও ছিল। কেউ বলেন, ধ্বংসাবশেষের নিচে বা ভেতরে এমন পথ ছিল যেগুলো পরে বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু এগুলোর সঠিক ব্যবহার বা নির্মাণকাল সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই এগুলো ইতিহাসের নিশ্চিত তথ্যের চেয়ে স্থানীয় স্মৃতি ও লোককথার অংশ হিসেবেই দেখা উচিত।
সাহেবগঞ্জের সঙ্গে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের পুরোনো উপস্থিতির কথাও উঠে এসেছে সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে। ধ্বংসাবশেষের কাছেই একটি গির্জা রয়েছে এবং এলাকায় কয়েকটি খ্রিষ্টান পরিবার বসবাস করে। স্থানীয়দের কেউ তাঁদের পূর্বপুরুষদের ইউরোপীয়দের সঙ্গে সম্পর্কের কথা বলেছেন। তবে এই বর্ণনাগুলোর সঙ্গে সাহেবগঞ্জের দুর্গের নির্মাণের সরাসরি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন।
সাহেবগঞ্জের আশপাশ দিয়ে একসময় ডাকাতিয়া নদীর প্রবাহ বর্তমানের তুলনায় ভিন্ন ছিল বলে স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন। নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে থাকলে পুরোনো স্থাপনাটির অবস্থান বোঝার ক্ষেত্রেও তা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ, বাংলার বহু পুরোনো বসতি, বাণিজ্যকেন্দ্র ও স্থাপনার বিকাশ নদীপথকে ঘিরেই হয়েছিল। তবে সাহেবগঞ্জের এই স্থাপনা ঠিক কোন উদ্দেশ্যে নদীর কাছে গড়ে উঠেছিল, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত প্রমাণ নেই।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, ইতিহাসের এই টুকরোটি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পুরোনো স্থাপনার কিছু অংশ স্থানীয় বাড়িঘরের সঙ্গে মিশে গেছে। কোথাও পুরোনো কাঠামোর অংশ রান্নাঘর বা সংরক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। এমনকি পুরোনো ইট খুলে রাস্তা নির্মাণসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের কথাও স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন। কোনো পুরোনো অংশ এখন আর আগের অবস্থায় নেই।
একসময় যে দেয়াল হয়তো কোনো সামরিক বা বাণিজ্যিক স্থাপনার সীমানা নির্ধারণ করত, আজ সেই দেয়ালের গা ঘেঁষেই মানুষের বসতি। যে ইট হয়তো কয়েক শ বছর আগে কোনো অজানা স্থাপনার অংশ হয়েছিল, সেই ইটই এখন হয়তো কোনো বাড়ির রান্নাঘরে, কোনো রাস্তার পাশে কিংবা অন্য কোনো কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবু সাহেবগঞ্জের ধ্বংসাবশেষের সবচেয়ে বড় রহস্য ইট-পাথরে নয়, বরং আমরা এখনো জানি না, এটি আসলে কী ছিল।
সরকারি নথিতে এর সঙ্গে পর্তুগিজ দুর্গের পরিচয় জড়িয়ে আছে। স্থানীয় মানুষের স্মৃতিতে এটি কখনো নীলকুঠি, কখনো ব্রিটিশ স্থাপনা। আবার প্রত্নতত্ত্ববিদের চোখে এর নির্মাণশৈলী ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সময়ের কোনো বড় কমপ্লেক্সের দিকে ইঙ্গিত করতে পারে। কিন্তু চূড়ান্ত উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। হয়তো কোনো পুরোনো নথি, কোনো মানচিত্র, কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কিংবা স্থাপত্য বিশ্লেষণ একদিন এই রহস্যের উত্তর দেবে। তখন হয়তো জানা যাবে, সাহেবগঞ্জের এই দীর্ঘ দেয়াল কার হাতে তৈরি হয়েছিল, কেন তৈরি হয়েছিল, আর কোন ইতিহাসকে বুকে নিয়ে এত বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
তার আগপর্যন্ত সাহেবগঞ্জের ধ্বংসাবশেষ একটি অদ্ভুত প্রশ্ন হয়েই থাকবে।
বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা