নদীর পথ সোজা না হয়ে কেন আঁকাবাঁকা প্রবাহিত হয়

নদী সাধারণত সরল পথে প্রবাহিত হয় না; বরং অনেক নদী সাপের মতো এঁকেবেঁকে বয়ে যায়।

বাংলাদেশের ভূখণ্ডের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলেই প্রবাহিত হয়েছে বিভিন্ন নদ–নদী, উপনদী ও শাখানদী। এসব নদী সাধারণত সরল পথে প্রবাহিত হয় না; বরং অনেক নদী সাপের মতো এঁকেবেঁকে বয়ে যায়। একটি নদী থেকে সৃষ্টি হতে পারে একাধিক শাখানদী, আবার ছোট নদী ও খালও বড় নদীর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। দেশের বিভিন্ন বিভাগ, জেলা ও উপজেলার সমতল ভূমি থেকে শুরু করে পাহাড়ি অঞ্চল—বিভিন্ন ভূপ্রকৃতির মধ্য দিয়ে এসব জলধারা নানা গতিপথ ধরে প্রবাহিত হয়।

তবে একটি প্রশ্ন প্রায়ই মনে আসে, নদীর গতিপথ সরল পথে না গিয়ে আঁকাবাঁকা হয় কেন?

নদীর উৎপত্তি
নদীর পানি বিভিন্ন উৎস থেকে আসে। বৃষ্টির পানি, তুষার ও হিমবাহের গলিত পানি, ঝরনা এবং ভূগর্ভস্থ পানি, সবই নদীর পানির উৎস হতে পারে। কোনো কোনো নদীর প্রধান উৎস পাহাড়ি অঞ্চলের তুষার বা হিমবাহের গলিত পানি। আবার অনেক নদী মূলত বৃষ্টির পানি ও ভূগর্ভস্থ পানির প্রবাহ থেকে পানি পায়।

উঁচু পাহাড়ে জমে থাকা তুষার বা হিমবাহের বরফ সূর্যের তাপে গলতে শুরু করলে সেই পানি ঢাল বেয়ে নিচে নামতে থাকে। একইভাবে বৃষ্টির পানি পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে ছোট ছোট জলধারা তৈরি করে। মাটির নিচের পানি কোথাও ভূপৃষ্ঠে বেরিয়ে এলে ঝরনা তৈরি হতে পারে। এসব ছোট জলধারা নিচের দিকে প্রবাহিত হতে হতে একে অন্যের সঙ্গে মিলিত হয়ে বড় জলধারা তৈরি করে।

পানি যখন মাটি ও শিলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন সঙ্গে মাটি, বালু, পলি ও বিভিন্ন খনিজ পদার্থও সরে যেতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে প্রবাহের কারণে কোনো কোনো স্থানে ছোট প্রবাহপথ আরও গভীর ও প্রশস্ত হয়। এভাবে অসংখ্য ছোট জলধারা ও প্রবাহপথ একত্র হয়ে বড় নদী তৈরি করে।

কোনো কোনো নদী হ্রদ বা জলাশয় থেকেও বের হতে পারে। আবার অনেক নদীর উৎপত্তি হয় পাহাড়ি ঝরনা, বৃষ্টির পানি বা ভূগর্ভস্থ পানির প্রবাহ থেকে। ফলে সব নদীর উৎপত্তির ধরন এক নয়।

বর্ষাকালে পাহাড়ি অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টি হলে পাহাড়ের ঢাল ও খাঁজ বেয়ে পানি দ্রুত নিচে নেমে আসে। একাধিক ছোট স্রোতোধারা একত্র হয়ে পাহাড়ি ছড়া বা ছোট নদী তৈরি করতে পারে। এসব জলধারা নিচের দিকে প্রবাহিত হয়ে অন্য জলধারার সঙ্গে মিলিত হয় এবং ধীরে ধীরে বড় নদী সৃষ্টি করে।

এ ক্ষেত্রে মহাকর্ষ বল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পৃথিবীর মহাকর্ষের কারণে পানি সাধারণত অপেক্ষাকৃত নিচু এলাকার দিকে প্রবাহিত হয়। প্রবাহের পথে পানি মাটি ও শিলাকে ক্ষয় করতে থাকে এবং কোথাও পলি জমা করে। দীর্ঘ সময় ধরে এই ক্ষয় ও পলি সঞ্চয়ের ফলে নদীর খাত গড়ে ওঠে এবং পরিবর্তিত হতে থাকে।

নদীর গতিপথ কেন আঁকাবাঁকা হয়ে বয়ে চলে
সব নদীই যে আঁকাবাঁকা পথে প্রবাহিত হয়, তা নয়। কোনো কোনো নদীর গতিপথ তুলনামূলক সরল হতে পারে। তবে সমতল ও কম ঢালযুক্ত অঞ্চলে অনেক নদীর গতিপথে বড় বড় বাঁক তৈরি হয়। নদীর এই বাঁককে ভূগোল ও ভূ–প্রকৌশলের ভাষায় মিয়ান্ডার বলা হয়।

নদীর বাঁক তৈরি হওয়ার পেছনে নদীর পানির স্রোত, নদীর তীর ও তলদেশের গঠন, ঢাল, ক্ষয় এবং পলি সঞ্চয়ের মতো বিভিন্ন বিষয় কাজ করে। নদী যখন কোনো বাঁক দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন বাঁকের বাইরের দিকে পানির স্রোত তুলনামূলক বেশি তীব্র থাকে। ফলে ওই অংশের তীরে ক্ষয় বেশি হয়। অন্যদিকে বাঁকের ভেতরের দিকে পানির গতি তুলনামূলক কম থাকায় সেখানে বালু ও পলি জমতে থাকে।

আরও পড়ুন

এভাবে বাঁকের বাইরের অংশে ক্ষয় এবং ভেতরের অংশে পলি সঞ্চয়—দুই প্রক্রিয়া একসঙ্গে চলতে থাকে। ফলে সময়ের সঙ্গে নদীর বাঁক আরও বড় ও স্পষ্ট হতে পারে। কখনো কোনো বাঁক এত বেশি বৃদ্ধি পায় যে নদী পুরোনো গতিপথ ছেড়ে নতুন পথ তৈরি করে।

নদীর আঁকাবাঁকা গতিপথ বিশেষ করে সমতল ও কম ঢালযুক্ত এলাকায় বেশি দেখা যায়। কারণ, এখানে নদীর পানি তুলনামূলক ধীরে প্রবাহিত হয় এবং নদীর তীর ও তলদেশে ক্ষয় ও পলি সঞ্চয়ের প্রক্রিয়া নদীর গতিপথকে ধীরে ধীরে পরিবর্তন করতে পারে।

বন্ধু, কক্সবাজার বন্ধুসভা এবং এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, গ্লোবাল আণবিক রিসার্চ হাব