হ্রদ হারালে হারাবে যে পৃথিবী

কাপ্তাই হ্রদছবি: সুপ্রিয় চাকমা

পৃথিবীকে আমরা জল, মাটি ও জীবনের গ্রহ বলি। কিন্তু এই পৃথিবীর অসংখ্য জলাধারের মধ্যে হ্রদগুলো যেন সবচেয়ে নীরব অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। দূর থেকে একটি হ্রদকে হয়তো মনে হয় স্থির জলরাশি; কিন্তু তার বুকের ভেতর চলছে জীবনের অবিরাম প্রবাহ। মাছ, জলজ উদ্ভিদ, পাখি, অণুজীব থেকে শুরু করে মানুষের খাদ্য, পানীয় জল, কৃষি, জীবিকা ও অর্থনীতি—অসংখ্য প্রাণ ও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হ্রদ।

হ্রদ মানে শুধু পানি নয়
হ্রদের গুরুত্ব বোঝার জন্য একটি পরিসংখ্যানই যথেষ্ট। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, হ্রদ ও জলাধারে পৃথিবীর তরল ভূপৃষ্ঠস্থ মিঠাপানির ৯০ শতাংশের বেশি রয়েছে। অথচ পৃথিবীর মোট স্থলভাগের তুলনায় হ্রদগুলোর বিস্তৃতি খুবই সামান্য। আয়তনে সীমিত হলেও মানুষের জীবন ও প্রকৃতির জন্য তাদের গুরুত্ব অপরিসীম।

হ্রদ মানুষের পানীয় জলের অন্যতম উৎস। কৃষি ও সেচে ব্যবহৃত হয় এর পানি। অসংখ্য মানুষের জীবিকা নির্ভর করে হ্রদের মাছ ও অন্যান্য জলজ সম্পদের ওপর। কোথাও হ্রদ পর্যটনের কেন্দ্র, কোথাও আবার স্থানীয় সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

শুধু মানুষের জন্য নয়, হ্রদ হলো অসংখ্য প্রাণীর আশ্রয়স্থল। বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, পাখি, উভচর, সরীসৃপ ও জলজ উদ্ভিদের জন্য হ্রদ একটি পূর্ণাঙ্গ বাস্তুতন্ত্র। একই সঙ্গে জলচক্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে স্থানীয় জলবায়ু ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে।

সংকটে বিশ্বের হ্রদ
হ্রদের এই অপরিসীম গুরুত্বের বিপরীতে আজকের বাস্তবতা উদ্বেগজনক। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে হ্রদ শুকিয়ে যাচ্ছে, পানির পরিমাণ কমছে, কোথাও আবার দূষণ ও অতিরিক্ত পুষ্টি উপাদানের কারণে পানির রং ও গুণমান বদলে যাচ্ছে।

জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি ইউএনইপির তথ্য বলছে, জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ এবং অতিরিক্ত পানি উত্তোলন বিশ্বের হ্রদগুলোর ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে। ২০২৪ সালের একটি ইউএনইপি ও ইউএন–ওয়াটার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিশ্বের ৩৬৪টি অববাহিকায় হ্রদসহ ভূপৃষ্ঠের জলাধারগুলো সংকুচিত হচ্ছে কিংবা সম্পূর্ণ হারিয়ে যাচ্ছে। এসব এলাকার প্রায় ৯ কোটি ৩১ লাখ মানুষ এর প্রভাবের মধ্যে রয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে। এতে পানির বাষ্পীভবন বাড়ছে এবং বৃষ্টির ধরনেও পরিবর্তন ঘটছে। কোথাও দীর্ঘস্থায়ী খরা হ্রদের পানি কমিয়ে দিচ্ছে, আবার কোথাও অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টি হ্রদের পানি উপচে বন্যার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

দূষণও বড় হুমকি
হ্রদের জন্য আরেকটি বড় বিপদ মানুষের তৈরি দূষণ। অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য, শিল্পবর্জ্য, প্লাস্টিক এবং কৃষিজমি থেকে ধুয়ে আসা সার ও কীটনাশক হ্রদের পানিতে মিশে পানির গুণমান নষ্ট করে। শৈবালের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটতে পারে। এতে পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গিয়ে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর জীবন হুমকির মুখে পড়ে। ফলে একটি হ্রদ ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক জীববৈচিত্র্য হারাতে থাকে।

অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ভয়াবহতা
মানুষের খাদ্য ও অর্থনীতির জন্য পানি প্রয়োজন। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত পানি তুলে নেওয়া হলে প্রকৃতির নিজস্ব ভারসাম্য নষ্ট হয়।

এর সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি আরাল সাগর। কৃষি সেচের জন্য এর সঙ্গে যুক্ত নদীগুলোর পানি ব্যাপকভাবে সরিয়ে নেওয়ার ফলে একসময় বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম হ্রদটি নাটকীয়ভাবে সংকুচিত হয়ে পড়ে। আজ আরাল সাগরের ইতিহাস পৃথিবীর সামনে একটি সতর্কবার্তা। প্রকৃতির জলসম্পদকে সীমাহীন মনে করে ব্যবহার করলে তার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।

বাংলাদেশে হৃদের প্রেক্ষাপট
হ্রদ নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনা বাংলাদেশের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বাংলাদেশের প্রকৃতি ও মানুষের জীবন জলাভূমির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। হাওর, বিল, বাঁওড়, পুকুর, জলাশয় ও অন্যান্য মিঠাপানির বাস্তুতন্ত্র আমাদের খাদ্য, মৎস্যসম্পদ, কৃষি, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

বর্ষায় বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল পানিতে ভরে ওঠে। হাওরাঞ্চলে পানি শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তৈরি করে না; এটি কৃষি, মাছ, নৌ যাতায়াত ও স্থানীয় অর্থনীতির ভিত্তি হয়ে ওঠে। শীত ও বসন্তে পরিযায়ী পাখির আগমন এসব জলাভূমিকে করে তোলে জীববৈচিত্র্যের অনন্য আশ্রয়।

হাকালুকি হাওর, টাঙ্গুয়ার হাওর, বাইক্কা বিলসহ দেশের অসংখ্য জলাভূমি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বাংলাদেশের জলাভূমি রক্ষা মানে শুধু একটি জলাশয় রক্ষা নয়; এর সঙ্গে রক্ষা পায় একটি সম্পূর্ণ জীবনব্যবস্থা।
কিন্তু দখল, ভরাট, দূষণ, অপরিকল্পিত স্থাপনা, অতিরিক্ত মাছ আহরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের জলাভূমিগুলোর জন্যও ক্রমবর্ধমান হুমকি।

আরও পড়ুন

হ্রদ রক্ষায় কী করা দরকার
হ্রদ রক্ষার জন্য শুধু দিবস পালন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বাস্তব পদক্ষেপ।

প্রথমত, হ্রদ ও জলাভূমিতে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে। শিল্পবর্জ্য ও পয়োবর্জ্য পরিশোধন ছাড়া জলাশয়ে ফেলা বন্ধ করতে হবে। কৃষিতে সার ও কীটনাশকের ব্যবহারেও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি বাড়াতে হবে।

দ্বিতীয়ত, জলাশয় দখল ও ভরাট বন্ধ করতে হবে। কোনো জলাশয়কে শুধু অব্যবহৃত জমি হিসেবে দেখলে চলবে না। এর পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক মূল্যও বিবেচনায় নিতে হবে।

তৃতীয়ত, স্থানীয় মানুষকে সংরক্ষণ কার্যক্রমের অংশীদার করতে হবে। যে জেলে হ্রদের ওপর নির্ভর করেন, যে কৃষক তার পানি ব্যবহার করেন কিংবা যে মানুষটির বসতি হ্রদের পাশে—তাঁদের বাদ দিয়ে টেকসই সংরক্ষণ সম্ভব নয়।

চতুর্থত, নিয়মিতভাবে হ্রদের পানির মান, জীববৈচিত্র্য ও পানির স্তর পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কোথাও হ্রদ সংকুচিত হলে বা দূষণ বাড়লে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শিশু ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জলভূমি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা।

পৃথিবীর হ্রদগুলো আজ আমাদের কাছে যেন একটি আয়না। সেই আয়নায় প্রকৃতির পাশাপাশি প্রতিফলিত হচ্ছে মানুষের কর্মকাণ্ডও। আমরা যদি দূষণ করি, পানি অপচয় করি, জলাশয় দখল করি—তার প্রতিফলন একদিন আমাদের জীবনেই ফিরে আসবে। আবার আমরা যদি সংরক্ষণ করি, পুনরুদ্ধার করি এবং প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পানি ব্যবহার করি, তার সুফলও পাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।

বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা

আরও পড়ুন