পডকাস্ট কীভাবে শুরু করবেন
প্রথম আলো বন্ধুসভা ও অল ব্রডকাস্টার্স কমিউনিটির (এবিসি) যৌথ উদ্যোগে অনলাইনে চলছে উপস্থাপনাবিষয়ক বিশেষ কর্মশালা। ‘প্রেজেন্টেশন অ্যান্ড বিয়ন্ড’ শিরোনামে কর্মশালার তৃতীয় সেশন অনুষ্ঠিত হয় ২৩ সেপ্টেম্বর। এতে ‘পডকাস্ট সঞ্চালনা’ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেন স্ক্যান মিডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা ও পডকাস্ট হোস্ট সামির আহমেদ। এই লেখা তাঁর বক্তব্যের প্রতিলিপি। সঞ্চালনা করেন বন্ধুসভা জাতীয় পর্ষদের প্রশিক্ষণ সম্পাদক ফারহান সাকিব।
পডকাস্ট নিয়ে আমার জার্নি শুরু হয় নিজের শো করার অনেক আগেই। ২০২২ সালের শেষের দিকে অস্ট্রেলিয়া থেকে বাংলাদেশে আসি। তখন দেশে একটি প্রোডাকশন হাউস শুরু করি। ২০২৩ সালের মার্চের দিকে প্রায় চার-পাঁচজনের একটি ছোট টিম নিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু। টিমে ছিলেন সিনেমাটোগ্রাফার, প্রজেক্ট প্ল্যানারসহ আরও কয়েকজন।
তখন আমার বয়স মাত্র ২০ বছর। কাজের পরিসরও খুব বড় ছিল না। মূলত চেষ্টা করছিলাম কীভাবে এজেন্সিটাকে ধীরে ধীরে আর্থিকভাবে দাঁড় করানো যায়।
পডকাস্টের সম্ভাবনা যেভাবে দেখলাম
অস্ট্রেলিয়ায় থাকার সময় দেখেছি, সেখানে পডকাস্ট সংস্কৃতি অনেক আগে থেকেই বেশ জনপ্রিয়। অনলাইন ও অফলাইন—দুইভাবেই মানুষ পডকাস্ট করত। অনেক পডকাস্ট স্টুডিও সেটআপ করে, ক্যামেরা দিয়ে শুট করা হতো।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে করোনা মহামারির সময় ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে অনেকটা পডকাস্টের মতো আলোচনা শুরু হয়েছিল। সেলিব্রিটি থেকে শিক্ষক—অনেকেই লাইভে এসে দীর্ঘ সময় কথা বলতেন।
অস্ট্রেলিয়ায় দেখলাম, পডকাস্টকে যদি একটু পরিকল্পিতভাবে অফলাইনে শুট করা যায়, তাহলে এর সম্ভাবনা অনেক বেশি। এক ঘণ্টার একটি কথোপকথন থেকে আমরা অসংখ্য ছোট কনটেন্ট তৈরি করতে পারি। সেখান থেকে তিন মিনিটের ক্লিপ, শর্ট ভিডিও, রিলস—অনেক কিছু বানানো সম্ভব। অর্থাৎ একটি দীর্ঘ কথোপকথনকে ভেঙে অনেকগুলো কনটেন্টে রূপ দেওয়া যায়। এই জায়গাটাই আমার কাছে পডকাস্টের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা মনে হয়েছে।
প্রথম ক্লায়েন্ট ও পডকাস্ট প্রোডাকশনে যাত্রা
এখনো মনে আছে, আমাদের প্রথম দিকের ক্লায়েন্টদের একজন ছিলেন ‘টু সেন্টস পডকাস্ট’।
আমি এনায়েত ভাই ও খালিদ ফারহান ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তাঁদের বলি, ‘আপনারা কি ভিডিও পডকাস্ট করতে চান? আমার ক্যামেরা ও প্রয়োজনীয় কিছু অ্যাকসেসরিজ আছে। আমরা চাইলে পডকাস্টকে আরও প্রফেশনালভাবে করতে পারি।’
তখন নাফিস ভাইও পডকাস্টের সম্ভাবনাটা বুঝতে পেরেছিলেন।
এরপর ২০২৩ সাল থেকে স্ক্যান মিডিয়ার প্রোডাকশন কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে পডকাস্ট। ‘টু সেন্টস পডকাস্ট’-এর পর আমরা আরও বেশ কয়েকটি শোতে কাজ করি।
পডকাস্ট মানেই বেশি খরচ নয়
অনেকে মনে করেন, পডকাস্ট করতে হলে অনেক টাকা খরচ করতে হবে। কিন্তু শুরুতে বিষয়টি সেভাবে কঠিন নয়। আমাদের একটি বিশেষত্ব ছিল, কম খরচে ভালো প্রোডাকশন করার চেষ্টা করা।
আপনি যদি প্রফেশনালি পডকাস্ট করতে চান, তাহলে একটি বিষয় মাথায় রাখতে পারেন—এক দিনে যত বেশি সম্ভব শুট শেষ করা।
ধরুন, একজন সিনেমাটোগ্রাফারকে এক দিনের জন্য নিয়ে এলেন। সেই দিনে যদি একটি এপিসোড শুট করেন, তাহলে পুরো খরচটা একটি কনটেন্টের ওপর পড়ে।
কিন্তু একই দিনে যদি চারটি এপিসোড শুট করতে পারেন, তাহলে সিনেমাটোগ্রাফারের খরচ চারটি এপিসোডের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। আমরা শুরুতে অনেক সময় এক দিনে চারটি পর্যন্ত শুট করতাম। এতে প্রোডাকশন কস্ট অনেক কমে যেত।
একটি পডকাস্ট থেকে একাধিক কনটেন্ট
আগে অনেকের ধারণা ছিল, পডকাস্ট মানেই এক ঘণ্টার একটি ভিডিও। আমরা বিষয়টিকে একটু ভিন্নভাবে দেখেছি। ধরুন, আপনি এক ঘণ্টার একটি পডকাস্ট রেকর্ড করলেন। এরপর সেই এক ঘণ্টা থেকে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো বের করে ছোট ছোট ভিডিও তৈরি করলেন।
একটি ভালো এপিসোড থেকে ২০-৩০টি পর্যন্ত রিল তৈরি করতাম। একটি সাধারণ মানের এপিসোড থেকেও ১৫-২০টি ভালো শর্ট কনটেন্ট বের করতাম।
এখানে প্রতিটি ক্লিপের জন্য খুব জটিল এডিটিং করতেই হবে, এমন নয়। আপনার বাজেট কম হলে প্রথমে শুধু গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো কেটে আলাদা করে পোস্ট করতে পারেন। পরে বাজেট বাড়লে ভালো এডিটর দিয়ে সাবটাইটেল, গ্রাফিকস, ভিজ্যুয়াল ও অন্যান্য উপাদান যোগ করতে পারেন।
সব সময় স্টুডিওতে বসেই পডকাস্ট করতে হবে এমনটাও নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী অনলাইনেও পডকাস্ট করা যায়।
মূল বিষয় হলো, এক ঘণ্টার শুট যেন একটি কনটেন্টে সীমাবদ্ধ না থাকে। আপনি এক ঘণ্টা সময় দিয়ে শুট করলেন, কিন্তু সেই শুট থেকে পাঁচটি, ১০টি, ২০টি কিংবা তারও বেশি কনটেন্ট তৈরি করতে পারলেন। এটাই পডকাস্টের বড় শক্তি।
পডকাস্টের আসল আইডিয়া
পডকাস্টের ধারণাটা খুবই সহজ। আপনি একজন অতিথির সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলছেন। সেই কথোপকথন একটি পূর্ণাঙ্গ এপিসোড হিসেবে থাকবে। আবার একই কথোপকথনের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো আলাদা করে শর্ট কনটেন্ট হিসেবে প্রকাশ করবেন।
বর্তমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলোতেও শর্ট-ফর্ম কনটেন্টের বড় উপস্থিতি রয়েছে। তাই একটি দীর্ঘ কনটেন্টের পাশাপাশি ছোট কনটেন্ট তৈরি করার পরিকল্পনা শুরু থেকেই থাকা উচিত।
আপনার অডিয়েন্সকে বুঝুন
পডকাস্ট শুরু করার আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আপনার অডিয়েন্স কী চায়?
আপনি কি গল্প বলবেন? নাকি আলোচিত ও ভাইরাল বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন? নাকি নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কথা বলবেন?
যদি স্টোরিটেলিং নিয়ে কাজ করতে চান, তাহলে শুরুতে নিজের পরিচিত মানুষদের কাছ থেকেই গল্প নিতে পারেন। আপনার পরিচিতদের মধ্যে এমন অনেক মানুষ থাকতে পারেন, যাঁদের জীবনে অসাধারণ কোনো গল্প আছে। সেখান থেকেই শুরু করা যায়।
প্রথমে বড় কোনো অতিথি পাওয়া জরুরি নয়। ভালো গল্প ও ভালো উপস্থাপনাও একটি শোকে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে।
কীভাবে অতিথিকে পডকাস্টে আনবেন
যদি শুরু থেকেই অতিথিনির্ভর পডকাস্ট করতে চান, তাহলে প্রথমে নিজেকে কিছুটা প্রমাণ করতে হবে। দেশের পরিচিত মানুষদের অনেকেই পডকাস্টে যেতে আগ্রহী। কিন্তু তাঁরা সাধারণত কিছু বিষয় দেখেন—
• পডকাস্টের মান কেমন,
• উপস্থাপক কেমন,
• প্রোডাকশনের মান কেমন,
• সেখানে গিয়ে তাঁরা কী পাবেন?
তাই কাউকে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানোর আগে নিজের পডকাস্টের একটি পরিষ্কার পরিচয় তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। যদি নিজের রিচও বাড়াতে চান, তাহলে অতিথিকে বলতে পারেন—এটি একটি কোলাবরেশন হিসেবে প্রকাশ করা হবে। এতে অতিথিরও লাভ থাকে, আপনারও রিচ বাড়তে পারে।
অতিথির সঙ্গে যোগাযোগ করার কয়েকটি ধাপ
কাউকে পডকাস্টে আমন্ত্রণ জানানোর ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় অনুসরণ করা যেতে পারে।
১. অতিথির লাভটা পরিষ্কার করুন: শুধু বলবেন না, ‘আমাদের পডকাস্টে আসবেন?’
বরং বোঝান, আপনার শোতে এলে অতিথির কী ধরনের সুবিধা তৈরি হতে পারে।
২. যোগাযোগের নম্বর বা মাধ্যম খুঁজে বের করুন: ফোন নম্বর, ই-মেইল বা ম্যানেজমেন্ট টিম—যে মাধ্যমে যোগাযোগ করা সম্ভব, সেটি খুঁজে বের করুন।
৩. সুন্দরভাবে ই-মেইল করুন: ই-মেইলে সংক্ষেপে নিজের পরিচয়, পডকাস্টের পরিচয়, কেন তাঁকে অতিথি হিসেবে চান এবং কী নিয়ে আলোচনা হবে, এসব পরিষ্কারভাবে লিখুন।
৪. পডকাস্টের লিংক দিন: আগের কোনো এপিসোড থাকলে সেটির লিংক দিন। এতে অতিথি বুঝতে পারবেন আপনার শো কেমন।
পডকাস্টের কনটেন্ট কীভাবে ডিস্ট্রিবিউশন করবেন
একটি পডকাস্ট তৈরি করার পর সেটি কোথায় এবং কীভাবে প্রকাশ করবেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
এক ঘণ্টার পূর্ণাঙ্গ ভিডিও ইউটিউবে প্রকাশ করা যেতে পারে। ৩-৫ মিনিটের তুলনামূলক ছোট কনটেন্ট ফেসবুকে ভালোভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। ছোট ছোট রিলস বা শর্ট ভিডিও ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটক—বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করা যায়।
এ ছাড়া চাইলে পডকাস্টের জন্য আলাদা সেকেন্ডারি চ্যানেল তৈরি করা যেতে পারে। সেখানে শুধু শর্ট ক্লিপ বা নির্বাচিত অংশগুলো প্রকাশ করা যাবে।
অর্থাৎ একটি পডকাস্টের জন্য শুধু একটি প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মকে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা যায়।
পডকাস্ট রেকর্ড করার আগে চেকলিস্ট
একজন ভালো উপস্থাপক শুধু প্রশ্ন তৈরি করেই সেটে যান না। অতিথি ও বিষয় সম্পর্কে প্রস্তুতি নেওয়াটাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পডকাস্ট শুরু করার আগে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা উচিত—
১. অতিথি সম্পর্কে ভালোভাবে গবেষণা করুন।
তিনি কে, কী কাজ করেন, তাঁর অভিজ্ঞতা কী—এসব জানতে হবে।
২. অতিথির জন্য কমফোর্টেবল পরিবেশ তৈরি করুন।
অতিথি যেন স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।
৩. দর্শক কী জানতে চায়, তা বুঝে প্রশ্ন করুন।
শুধু আপনার নিজের কৌতূহল থেকে প্রশ্ন করলে হবে না। দর্শকেরও যে প্রশ্ন থাকতে পারে, সেগুলো খুঁজে বের করতে হবে।
৪. অতিথির পুরোনো সাক্ষাৎকার দেখুন।
আগের সাক্ষাৎকারগুলো দেখলে অনেক নতুন ফলোআপ প্রশ্ন তৈরি করা যায়। ধরুন, তিনি আগে কোথাও একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। সেই বক্তব্যকে সামনে রেখে নতুন প্রশ্ন করতে পারেন।
৫. উপস্থাপক হিসেবে বেশি কথা বলবেন না।
পডকাস্টের মূল চরিত্র অতিথি হলে তাঁকে কথা বলার জায়গা দিতে হবে।
৬. প্রশ্নের সঙ্গে নির্ভরযোগ্য সূত্র ব্যবহার করুন।
কোনো তথ্য বা বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রশ্ন করলে প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ভরযোগ্য সূত্র উল্লেখ করা যেতে পারে। এতে প্রশ্নের মান বাড়ে এবং আলোচনাও আরও তথ্যভিত্তিক হয়।
৭. অতিথিকে আগে থেকে প্রশ্নের ধরন সম্পর্কে ধারণা দিন।
সব প্রশ্ন আগে থেকেই জানিয়ে দিতে হবে এমন নয়। তবে কী ধরনের বিষয়ে আলোচনা হবে, সে সম্পর্কে অতিথিকে ধারণা দিলে তিনি মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে পারেন।
৮. অতিথির কথা মাঝপথে থামাবেন না।
অতিথি একটি গুরুত্বপূর্ণ গল্প বা বক্তব্য বলার সময় তাঁকে থামিয়ে দিলে কথার স্বাভাবিক প্রবাহ নষ্ট হতে পারে। তাই প্রয়োজন না হলে তাঁকে কথা শেষ করার সুযোগ দেওয়া উচিত।
নতুনরা কীভাবে শুরু করবেন?
সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—শুরু করা। অনেকেই পডকাস্ট শুরু করার আগে অনেক কিছু নিয়ে চিন্তা করেন। ক্যামেরা কী হবে, স্টুডিও কেমন হবে, অতিথি কে হবেন, এডিটিং কীভাবে হবে—এসব নিয়ে ভাবতে ভাবতেই শুরু করা হয় না।
কিন্তু শুরু করার জন্য সবকিছু নিখুঁত হওয়া জরুরি নয়। প্রথম কাজ হলো শুরু করা। ছোট পরিসরে শুরু করুন। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী করুন। তারপর ধীরে ধীরে উন্নতি করুন। একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যও রাখতে পারেন। যেমন প্রতি মাসে চারটি পডকাস্ট প্রকাশ করব। লক্ষ্যটা বাস্তবসম্মত হলে ধারাবাহিক থাকা সহজ হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিজের কাজের প্রতি প্যাশন থাকতে হবে। কারণ, পডকাস্ট শুধু ক্যামেরা, মাইক্রোফোন আর অতিথির সমন্বয় নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি একটি যাত্রা। আপনাকে শিখতে হবে, পরীক্ষা করতে হবে, ভুল থেকে শিখতে হবে এবং ধীরে ধীরে নিজের স্টাইল তৈরি করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত একটি ভালো পডকাস্ট তৈরি হয়—ভালো গল্প, ভালো অতিথি, ভালো প্রশ্ন, এবং ধারাবাহিক কাজের সমন্বয়ে।