টেলিভিশনে খবর পড়তে আসলে কী লাগে

প্রথম আলো বন্ধুসভা ও অল ব্রডকাস্টার্স কমিউনিটির (এবিসি) যৌথ উদ্যোগে অনলাইনে শুরু হয়েছে উপস্থাপনাবিষয়ক বিশেষ কর্মশালা। ‘প্রেজেন্টেশন অ্যান্ড বিয়ন্ড’ শিরোনামে কর্মশালার প্রথম সেশন অনুষ্ঠিত হয় ৯ সেপ্টেম্বর। এতে ‘সংবাদ উপস্থাপনা’ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেন স্টার নিউজের জ্যেষ্ঠ সংবাদ উপস্থাপক ফারাবী হাফিজ। এই লেখা তাঁর বক্তব্যের প্রতিলিপি। সঞ্চালনা করেন বন্ধুসভা জাতীয় পর্ষদের সাধারণ সম্পাদক সাইমুম মৌসুমী বৃষ্টি

ফারাবী হাফিজ

বাংলাদেশে বিটিভি যখন শুরু হয়, তখন বিটিভিতে যাঁরা খবর পড়তেন, তাঁদের একধরনের লিগেসি তৈরি হয়েছে। তাঁদের হাত ধরেই বাংলাদেশে সংবাদ উপস্থাপনার কয়েকটি মডিউল তৈরি হয়েছে। যাঁরা খবর পড়েন, তাঁরা পার্টটাইম, ফুলটাইম কিংবা চুক্তিভিত্তিক—এই তিন ধরনের ব্যবস্থায় বিভিন্ন জায়গায় কাজ করেন।

বিটিভির ক্ষেত্রেও আমরা দেখেছি, কেউ সরকারি চাকরি করেন, কেউ ডাক্তার, কেউ ব্যবসায়ী, কেউ আবার শিক্ষার্থী। আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, তখন থেকেই মিডিয়ায় কাজ শুরু করি। সুতরাং আপনি যদি শিক্ষার্থী হন, আপনার জন্যও এখানে দারুণ সুযোগ আছে। পড়াশোনার পাশাপাশি পার্টটাইম কাজ করতে পারেন।

নিউজ প্রেজেন্টেশন কেন শিখবেন
নিউজ প্রেজেন্টেশন সাংবাদিকতারই একটি অংশ। সারা দিন যা ঘটে, সেসব বিষয়ে একটু চোখ বোলানো, একটু বোঝা—এটাই গুরুত্বপূর্ণ। আপনি সারা দিন ফেসবুকে আছেন, অথবা আপনার ফোনে প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, যুগান্তর, সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর আসছে। ফেসবুক ফিডেও আপনি জানতে পারছেন আজকে এটা ঘটছে, ওটা ঘটছে। অর্থাৎ তথ্য সম্পর্কে আপনি সমৃদ্ধ হচ্ছেন, আপনি জানছেন।
যখন আপনি ঘটনা সম্পর্কে জানেন, তখন সেটা ডেলিভার করতে কোনো অসুবিধা হয় না। খবর পড়তেও সুবিধা হয়।

তবে শুধু টেলিভিশনের উপস্থাপক হওয়ার জন্যই উপস্থাপনা শেখার দরকার নেই। আপনি উপস্থাপনা শিখবেন নিজের জন্য, চাকরির জন্য, কমিউনিকেশন দক্ষতা বাড়ানোর জন্য, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য কিংবা বিসিএসের ভাইভার জন্য। সব জায়গাতেই উপস্থাপনার দক্ষতা দরকার।

উপস্থাপক হতে কী লাগে
এমন যোগ্যতা যদি আপনার থাকে যে আপনি স্পষ্ট করে কথা বলতে পারেন, আপনার প্রতিটি শব্দ বোঝা যায় এবং আপনি কমিউনিকেট করার যোগ্যতা রাখেন, তাহলে টেলিভিশনে উপস্থাপক হওয়ার জন্য আপনার অনেকটাই প্রস্তুতি হয়ে যায়।

কমিউনিকেশন শুধু মুখ দিয়ে হয় না। আপনার হাত, চোখ, নাক, কান, মুখসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমেও আপনি কমিউনিকেট করেন।
আপনি যদি বাংলা দেখে পড়তে পারেন, স্টোরি টেলিং কীভাবে করতে হয়, একটা গল্প কীভাবে বলতে হয়—এটা যদি বোঝেন; একটি রাজনৈতিক পরিস্থিতি কেমন, খারাপ অবস্থায় আমার মুখের অভিব্যক্তি কেমন হবে, ভালো অবস্থায় মুখের অভিব্যক্তি কেমন হবে, বাংলাদেশ জিতে গেলে কেমন হবে—এ ধরনের বিষয় সামান্য বুঝতে পারলেও এই পেশা আপনার জন্য।

উপস্থাপকদের জন্য আমরা মূলত দুটি বিষয় অনুসরণ করি—এক. ভার্বাল কমিউনিকেশন, দুই. নন-ভার্বাল কমিউনিকেশন

ভার্বাল কমিউনিকেশন: উচ্চারণ ও কণ্ঠ
ভার্বাল কমিউনিকেশন হচ্ছে মূলত আপনার কথার মাধ্যমে যোগাযোগ। এখানে শুদ্ধ উচ্চারণ খুব গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সব অঞ্চলের মানুষের কাছে আপনার কথা পৌঁছাতে হবে। তাই প্রমিত বাংলায় কথা বলতে হবে। এই জায়গাটি ঠিক করতে অনেক কাঠখড় পোহাতে হয়।

আমরা কমিউনিকেশনে মোটাদাগে কয়েক ধরনের যোগাযোগ করি। একটি হচ্ছে ইন্ট্রাপারসোনাল কমিউনিকেশন; ইন্টারপারসোনাল কমিউনিকেশন; গ্রুপ কমিউনিকেশন; সোশ্যাল কমিউনিকেশন ও মাস কমিউনিকেশন।

মাস কমিউনিকেশন হচ্ছে টেলিভিশন বা পত্রিকার মাধ্যমে যোগাযোগ। সোশ্যাল কমিউনিকেশন হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ার যোগাযোগ। গ্রুপ কমিউনিকেশন হচ্ছে একসঙ্গে একাধিক মানুষ বসে আছি, এর মধ্যে আমি কথা বলছি।
তবে ইন্টারপারসোনাল কমিউনিকেশন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এটা হচ্ছে, আমি এই মুহূর্তে ঠিক আপনার সঙ্গে কথা বলছি। আপনি যদি আমার চোখের দিকে তাকানোর পর কোনো একটা কারণে মনে করেন, ‘না, আমি তার কথা বুঝতে পারছি না, আমি কানেক্ট করতে পারছি না’, তাহলে এটাকে কমিউনিকেশন ফেইলিওর বলা হয়। এটাকে ডিজঅর্ডার বা নয়েজও বলা হয়।

সুতরাং আপনাকে সবার আগে প্রমিত উচ্চারণ ঠিক করতে হবে। আর যদি আপনার এক্সট্রা-অর্ডিনারি কণ্ঠ থাকে, তাহলে সেটা অবশ্যই বাড়তি সুবিধা। তবে সাধারণ ভয়েসেও খবর পড়া যায়।

কণ্ঠ সুন্দর ও স্পষ্ট করার অনুশীলন
ভয়েস সুন্দর করার কিছু ব্যায়াম আছে। ইউটিউবে খুঁজলে এসব ব্যায়াম পাবেন। নিশ্বাস বড় করা, ঠোঁটকে ফ্লেক্সিবল করা, জিবের আড়ষ্টতা কমানো—এসব অনুশীলন করতে হবে।

আপনি যে স্পষ্ট কথা বলতে পারেন না, তার একটি কারণ জিবের আড়ষ্টতা। এই জায়গাগুলো ঠিক করতে হবে। প্রতিদিন অন্তত ১০ মিনিট ব্যায়াম করতে হবে।
জিবকে যদি আয়ত্তে নিয়ে আসতে পারেন, ঠোঁটকে যদি কথা শোনাতে পারেন, তখন আপনি আপনার কণ্ঠকে যেভাবে ইচ্ছা ব্যবহার করতে পারবেন।

উচ্চারণ ঠিক রাখতে আমি এখনো প্রতিদিন কবিতা আবৃত্তি করি। আমি প্রতিদিন পত্রিকা পড়ি। জোরে জোরে পড়ি। জোরে জোরে পড়লে ভয়েসটা খোলে।

অডিশনের প্রস্তুতি
আমি ১৬টা সিভি দেওয়ার পর একটি টেলিভিশনে অডিশন দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম।

সবচেয়ে বড় পরীক্ষা আসলে এটাই—আপনি স্পষ্ট উচ্চারণ করে কথা বলতে পারেন কি না। চেহারা যেমনই হোক, মেকআপ করে হয়তো আপনাকে আরেকটু সুন্দর বা গ্রহণযোগ্য করে তোলা যাবে; কিন্তু স্পষ্টভাবে কথা বলার দক্ষতা আপনাকেই তৈরি করতে হবে।

অডিশন দেওয়ার আগে আপনাকে একটি স্ক্রিপ্ট দেওয়া হবে। সেই স্ক্রিপ্ট ভালোভাবে পড়ে প্রস্তুতি নিতে হবে। আপনাকে এর পেছনে লেগে থাকতেই হবে। কারও ক্ষেত্রে এক মাস, কারও ক্ষেত্রে তিন মাস, কারও ক্ষেত্রে ছয় মাস সর্বোচ্চ সময় লাগতে পারে।

নন-ভার্বাল কমিউনিকেশন
দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে নন-ভার্বাল কমিউনিকেশন। শব্দ ছাড়া স্ক্রিনের সামনে একজন উপস্থাপকের যা কিছু আছে, সবই নন-ভার্বাল কমিউনিকেশন।

হাত নাড়াচাড়া করা, চুল, পোশাকসহ আপনার শরীর ও মুখের অঙ্গভঙ্গি—সবকিছুই নন-ভার্বাল কমিউনিকেশনের অংশ। আপনাকে দেখে মানুষের মধ্যে একটি ধারণা তৈরি হয়। আপনি কথা না বলেও অনেক কিছু বলতে পারেন।

নন-ভার্বাল কমিউনিকেশনে জড়সড় হওয়া যাবে না। হাত সব সময় খোলা রাখতে হবে। কোন সময়ে হাত কোথায় থাকা দরকার, কোন সময় কপালটা কুঁচকানো দরকার, কোন সময় কাঁধ নাড়ানো দরকার—এসব কিছু আপনাকে কমিউনিকেট করে। আপনার আত্মবিশ্বাস কমায় অথবা বাড়ায়। হাত খোলা রাখাকে বলে ‘ওপেন পালম থিওরি’।

কীভাবে নিজেকে দেখাবেন এবং কীভাবে দেখাবেন না—একজন ভালো কমিউনিকেটর হিসেবে আপনার এই বোধটুকু থাকতে হবে। কমিউনিকেশনের ব্যাপারটাই হচ্ছে কীভাবে মানুষের ভেতরে ঢুকতে হয়। মানুষকে কানেক্ট করতে পারতে হবে।

নিউজ প্রেজেন্টেশনের ক্ষেত্রে হাত খোলা রাখতে হবে। পা দুটি কাছাকাছি না রেখে একটু ফাঁকা করে দাঁড়াতে হবে। এভাবে দাঁড়ালে আত্মবিশ্বাস বাড়ে।

নন-ভার্বাল কমিউনিকেশনে সবচেয়ে বড় আয়না বা টুলস আপনার চোখ। আপনি যদি মিথ্যা বলেন, দর্শক বুঝে ফেলবে। তাই তথ্যটা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ডেলিভারি দিতে হবে।

ক্যামেরার সামনে কীভাবে উপস্থাপন করবেন
টেলিভিশনে ইন্টারভিউতে প্রথমে সাধারণ জ্ঞান পরীক্ষা হয়। আপনাকে জানতে হবে।
দ্বিতীয় পরীক্ষাটি ক্যামেরার সামনে, অর্থাৎ অডিশন। খবর পড়ার সময় প্রতিটি শব্দ ধরে ধরে ডেলিভারি দিতে হবে, যাতে দর্শক আপনার বার্তাটা বুঝতে পারে। ক্যামেরার সামনে কমফোর্টেবলভাবে বসতে হবে। ক্যামেরার লেন্সের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে হবে।

শেষ পর্যন্ত একজন ভালো নিউজ প্রেজেন্টারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আপনি কী বলছেন, সেটা যেমন জানতে হবে, তেমনি কীভাবে বলছেন, সেটাও জানতে হবে। স্পষ্ট উচ্চারণ, কণ্ঠের নিয়ন্ত্রণ, আত্মবিশ্বাস, চোখের যোগাযোগ এবং শরীরের সঠিক অঙ্গভঙ্গি—সবকিছু মিলিয়েই একজন ভালো উপস্থাপক তৈরি হয়।