চিত্রাকে যারা শুধু নদী বলে, তারা তাকে চেনে না। সে শুধু নদী নয়, এক রহস্যের নাম। কখনো শান্ত, কখনো অস্থির, কখনো আবার এমন নিঃশব্দ যে মনে হয়, শত বছরের গোপন কথা বুকের ভেতরে লুকিয়ে রেখে আপনগতিতে ছুটে চলে।
গ্রামের নাম শালুকদিয়া। বড় কোনো মানচিত্রে তার নাম খুঁজে পাওয়া যাবে না। অথচ বিকেলের শেষ আলো যখন এর গায়ে পড়ে, তখন মনে হয় পৃথিবীর সমস্ত সন্ধ্যা এখানেই এসে থেমে গেছে।
শালুকদিয়া গাঁয়ে চিত্রা এসে বাঁক নিয়েছে। সেই বাঁকেই রয়েছে পুরোনো একটি ঘাট। বহু আগেই এখানে নৌকার আনাগোনা কমে গেছে। এর শেওলা ধরা ভাঙা সিঁড়িগুলো বর্ষার জলে ডুবে যায়, শীতে আবার ধুলোমাখা হয়ে ওঠে।
ঘাটের এক পাশে একটি প্রাচীন কড়ইগাছ, ডালে ডালে চলে ঋতুবদলের খেলা। সন্ধ্যার আগে বকেরা ফিরে আসে, শালিকেরা ডেকে ওঠে। দূরের মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে এসে নদীর জলে মিশে যায়।
শালুকদিয়ার এই ঘাটে প্রতিদিন একজন বৃদ্ধ এসে বসেন।
বয়স সত্তরের ওপরে। প্রায়ই তাঁর পরনে থাকে আটপৌরে লুঙ্গি, ধূসর পাঞ্জাবি। হাতে একটা লাঠি। হাঁটায় বার্ধক্যের ক্লান্তি আছে। তবে সময়ের প্রতি রয়েছে অদ্ভুত এক নিয়মানুবর্তিতা।
গ্রামের মানুষ জানে, সূর্য পশ্চিম দিকে ঢলে পড়লেই তিনি বাড়ি থেকে বের হন। ধীরে ধীরে কাঁচা পথ পেরিয়ে ঘাটে এসে একই জায়গায় বসেন।
কেউ তাঁকে ডাকলেও বিরক্ত হন না। মৃদু হেসে মাথা নাড়েন। কথাও বাড়ান না। চোখ তাঁর স্থির থাকে নদীর ওপারে।
ওপারে কয়েকটি বাড়ি। বাঁশঝাড়ের ফাঁকে, আম-কাঁঠালের ছায়ে সেগুলোর কিছু দেখা যায়। দিনের বেলা সেগুলো অবশ্য অন্য সবার মতোই সাধারণ। তবে সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে অসাধারণ হয়ে ওঠে। একটি বাড়ির উত্তরমুখী জানালায় সন্ধ্যা নামতেই দারুণ এক মায়াবী আলো জ্বলে ওঠে। আলোটি কখনো কেরোসিনের প্রদীপের মতো হলুদ, কখনো জোনাকির মতো নরম। দূর থেকে তার রং স্পষ্ট বোঝা না গেলেও এটুকু বোঝা যায়—আলোটি জ্বলে উঠেছে।
বৃদ্ধ সেদিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকেন।
তারপর ধীরে ধীরে লাঠির ওপর ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ান।
নদীর দিকে এমনভাবে তাকান যেন নিঃশব্দে কাউকে কিছু জানিয়ে গেলেন।
তারপর ফিরে যান।
এ দৃশ্য এক দিনের নয়।
এক মাসের নয়।
এক বছরেরও নয়।
গ্রামের সবচেয়ে বয়স্ক মানুষেরাও বলেন, যত দূর মনে পড়ে, মানুষটিকে তারা এমনই দেখেছে। সন্ধ্যা নামবে, তিনি আসবেন। ওপারের আলো জ্বলবে, তিনি ফিরে যাবেন।
কেউ এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন করে না।
শুধু গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা কখনো কখনো কৌতূহলী হয়ে নদীর ওপারে তাকায়। তারা ভাবে, ওই আলোতে এমন কী আছে, যা একজন মানুষকে প্রতিদিন একই সময়ে একই জায়গায় এভাবে টেনে আনে?
চিত্রা অবশ্য এর উত্তর জানে।
কিন্তু সে তো মানুষের মতো কথা বলতে পারে না।
দুই.
শালুকদিয়ার মানুষ সময় মাপতে ঘড়ির ওপর খুব একটা নির্ভর করে না। কারও কাছে বিকেল মানে মাঠ থেকে গরু ফেরার সময়, কারও কাছে ধানের খেতের ছায়া লম্বা হয়ে যাওয়া, আবার কারও কাছে চিত্রার বুক ছুঁয়ে উড়ে যাওয়া বকের সারি।
অবশ্য কয়েকজনের কাছে সন্ধ্যা নামার আরেকটি চিহ্ন আছে।
—ওই যে রহিম চাচা ঘাটে যাচ্ছেন।
বৃদ্ধের নাম রহিম উদ্দিন। তবে গ্রামের সবাই তাঁকে রহিম চাচা বলেই ডাকে। কেউ তাঁর পুরো নাম উচ্চারণ করে না। নামের চেয়ে তাঁর নীরব উপস্থিতিই যেন বড় হয়ে ওঠে।
বাজার থেকে ফেরার পথে মুদিদোকানি কুদ্দুস প্রায়ই দেখে, রহিম চাচা লাঠি ঠুকতে ঠুকতে নদীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। তিনি হেসে বলেন—চাচা, সময় হয়ে গেছে বুঝি।
রহিম চাচা মৃদু হাসেন।
সেই হাসিতে উত্তর থাকে, কিন্তু শব্দ থাকে না।
চায়ের দোকানে বসা লোকজনও তাঁকে নিয়ে গল্প করে।
—লোকটা এমন কেন?
—বুড়ো বয়সে মানুষের কত রকম খেয়ালই তো হয়।
—আরে, কারও জন্য অপেক্ষা করে বোধ হয়—কেউ বলে। আবার কেউ বলে— অপেক্ষা আবার এত বছর ধরে করে নাকি?
কথাগুলো বাতাসে ভেসে বেড়ায়। কিন্তু রহিম চাচার কানে পৌঁছায় কি না, কেউ জানে না।
গ্রামের শিশুদের কাছে তিনি অন্য রকম মানুষ।
স্কুল ছুটির পর তারা প্রায়ই ঘাটের কাছে খেলতে আসে। কেউ মাটির দলা ছুড়ে, কেউ নদীর জলে কচুরিপানা ভাসিয়ে দৌড় দেয়। তাদেরই একজন, বছর তেরোর রায়হান, একদিন সাহস করে রহিম চাচার পাশে গিয়ে বসে।
কিছুক্ষণ দুজনই চুপচাপ নদীর দিকে তাকিয়ে থাকে।
তারপর ছেলেটি জিজ্ঞেস করে—চাচা, আপনি প্রতিদিন ওই দিকে চেয়ে কী দেখেন?
রহিম চাচা ছেলেটির মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসেন।
তারপর বলেন—সব প্রশ্নের উত্তর সব সময় জানতে নেই। কিছু উত্তর সময় নিজেই বলে দেয়।
রায়হান এ কথার কোনো মানে বুঝতে পারে না।
এরপর অবশ্য আর কোনো দিন সে ওই প্রশ্ন করেনি।
শুধু দূর থেকে মাঝেমধ্যে দেখে, সূর্য ডোবার একটু আগে রহিম চাচার মুখে এক অদ্ভুত আলো এসে পড়ে। তাতে মনে হয়, তাঁর চোখ দুটি যেন নদীর ওপারের আলো জ্বলার আগেই অপেক্ষার আলোতে জেগে ওঠে।
এদিকে চিত্রা নদীও প্রতিদিন একই রকম থাকে না।
কোনো দিন তার জলে রোদের শেষ সোনালি রেখা ঝিলমিল করে, কোনো দিন বাতাসের ছোঁয়ায় ভেঙে যায় আলোর রেখা। কোনো দিন জেলেদের নৌকা ফিরে আসে ভাটার স্রোত মাড়িয়ে, কোনো দিন নদীজুড়ে গভীর নিস্তব্ধতা নেমে আসে, তাতে যেন জলও কথা বলতে ভুলে যায়।
কিন্তু একটি জিনিস কখনো বদলায় না।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে নদীর ওপারের সেই জানালায় আলো জ্বলে উঠতে কখনো ভুল হয় না।
আর রহিম চাচা, বহু বছরের অভ্যাসমতো, নীরবে উঠে দাঁড়ান।
মনে হয়, তাঁর দিনের শেষ প্রার্থনাটি ওই আলোর পানেই নিবেদিত।
তিন.
চিত্রা নদীর একটি অদ্ভুত স্বভাব রয়েছে। মানুষ যেমন দিনের হিসাব রাখে, সে রাখে ঋতুর হিসাব। আষাঢ় এলেই দূরের মাঠগুলো একে একে জলের নিচে হারিয়ে যায়। উজান থেকে নেমে আসা জল নদীর বুক ফুলিয়ে দেয়। ঘাটের শেষ সিঁড়িটাও ডুবে যায়। কড়ইগাছের নিচে বসার জায়গাটিও ভিজে থাকে দিনের পর দিন।
তবু রহিম চাচার আসা বন্ধ হয় না।
তিনি অবশ্য তখন একটু দূরে, উঁচু জমিতে দাঁড়িয়ে থাকেন। মাথার ওপর পুরোনো কালো ছাতা বাতাসে কাঁপতে থাকে, পাঞ্জাবির আঁচল উড়ে যায়, তাঁর চোখ স্থির থাকে নদীর ওপারের সেই বাড়িটির দিকে।
কখনো ঝুম বৃষ্টির আড়ালে আলোটি দেখা যায় না।
তখন তিনি আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন।
যখন শেষ পর্যন্ত ক্ষীণ হলুদ একটি বিন্দু বৃষ্টির ভেতর ফুটে ওঠে, তাঁর মুখে এমন একটা স্বস্তি নেমে আসে, মনে হয় দীর্ঘ উৎকণ্ঠার পর প্রিয় মানুষের সংবাদ পেয়েছেন।
বর্ষা কেটে গেলে নদীর দুই তীর সাদা কাশফুলে ভরে ওঠে।
শরতের বিকেলে বাতাসে অকারণ উৎসবের গন্ধ থাকে। নীল আকাশে তুলার মতো মেঘ ভেসে বেড়ায়। কাশবনের ফাঁক দিয়ে নদীর জল চিকচিক করে। সেই আলোয় রহিম চাচার মুখটাও যেন কিছুটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
একদিন এমনই এক শরৎসন্ধ্যায় তিনি পাঞ্জাবির বুকপকেট থেকে খুব সাবধানে একটি কাগজের খাম বের করলেন।
খামটি এত পুরোনো যে তার ভাঁজে ভাঁজে সময়ের দাগ জমেছে।
তিনি সেটি খুললেন না।
শুধু আঙুলের ডগা দিয়ে আলতো করে স্পর্শ করলেন।
তারপর আবার বুকপকেটে রেখে দিলেন।
দূর থেকে রায়হান সব দেখছিল।
সে বুঝতে পারল না, একটি পুরোনো খাম মানুষ এত যত্ন করে কেন ছোঁয়।
হেমন্ত এলে ভোরের শিশিরে ঘাস ভিজে থাকে। মাঠে নতুন ধানের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। সন্ধ্যা নামতে না নামতেই নদীর বুকের ওপরে কুয়াশা যেন নরম চাদরের মতো ছড়িয়ে যায়। সেই কুয়াশার ভেতর থেকেও রহিম চাচা আলোটিকে খুঁজে নেন। মনে হয়, চোখ দিয়ে নয়—অন্য কোনো গভীর অনুভূতি দিয়ে তিনি সেই আলো দেখেন।
যখন পৌষের শীত নামে, গ্রামের মানুষ আগুন পোহায়, তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে পড়ে, তখনো রহিম চাচা ঘাটে এসে বসে থাকেন।
এক সন্ধ্যায় তাঁর গামছার ভাঁজ থেকে একটি শুকিয়ে যাওয়া শিউলি ফুল মাটিতে পড়ে যায়।
রায়হান দৌড়ে গিয়ে ফুলটি তুলে দেয়।
—চাচা, এটা পড়ে গেছে।
তিনি ফুলটির দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে থাকেন।
মৃদু হেসে বলেন—কিছু ফুল শুকিয়ে গেলেও গন্ধ থেকে যায়।
রায়হান বিস্মিত চোখে তাঁর দিকে চেয়ে রইল।
সে বুঝতে পারল না, কথাটি ফুলের জন্য, নাকি অন্য কিছুর জন্য বলা হলো।
চিত্রা নদী ধীরে ধীরে সন্ধ্যার আঁধারে মিলিয়ে যাচ্ছিল। ঠিক সে সময়, নদীর ওপারের জানালায় আলো জ্বলে উঠল।
রহিম চাচা চোখ তুলে তাকালেন।
তাঁর ঠোঁট নড়ল।
কিন্তু কোনো শব্দ শোনা গেল না।
চার.
সেদিন সকাল থেকেই আকাশটা অদ্ভুত রকমের পরিষ্কার ছিল।
বর্ষার শেষ বৃষ্টিটুকু কদিন আগেই বিদায় নিয়েছে। চিত্রার জল তখনো ঘোলাটে। উচ্ছ্বাস কমে এসেছে। নদীর দুই তীরের কাশফুল বাতাসে দুলছে। বিকেলের আলো নরম হয়ে নেমে এসেছে কড়ইগাছের পাতায়।
রহিম চাচা সেদিনও যথারীতি ঘাটে এসে বসেছিলেন।
তাঁর চোখ দুটো নদীর ওপারে। কিন্তু মন যেন আরও দূরে।
হঠাৎ বাতাসের ঝাপটায় তাঁর বুকপকেট থেকে সেই পুরোনো খামটি মাটিতে পড়ে গেল।
তিনি খেয়াল করার আগেই রায়হান দৌড়ে এসে সেটি তুলে নিল।
খামের মুখ একটু খুলে গিয়েছিল।
ভেতর থেকে হলদে হয়ে যাওয়া একটি কাগজের কোনা দেখা যাচ্ছিল।
রায়হান কৌতূহলী হয়ে বলল—চাচা, এটা কি খুব পুরোনো চিঠি?
রহিম চাচা খামটি হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন—হ্যাঁ, অনেক দিনের।
—কে লিখেছিল?
কোনো উত্তর দিলেন না। শুধু চিত্রার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
বাতাসে কাশফুল দুলছিল। একটি মাছরাঙা আচমকা জলের ভেতর ঝাঁপ দিয়ে আবার উড়ে গেল।
বেশ খানিকক্ষণ পর তিনি যেন সংবিৎ ফিরে পেলেন।
রায়হান আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
ছেলেটি অনুভব করল, এই নীরবতার ভেতরে এমন কিছু লুকিয়ে আছে, যেখানে শব্দ দিয়ে প্রবেশ করা যায় না।
সন্ধ্যা আরও ঘনিয়ে এল।
রহিম চাচা ধীরে ধীরে খামটি খুললেন।
কাগজের অক্ষরগুলো সময়ের ছোঁয়ায় অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। তবু একটি শব্দ এখনো স্পষ্ট।
‘...নীলা...’
শুধু একটি নাম।
তার বেশি কিছু আর পড়া যায় না।
রহিম চাচার আঙুল যেন সেই নামের ওপর আটকে গেল।
মনে হলো, তাঁর চোখের সামনে আরেকটি শরৎসন্ধ্যা ফুটে উঠেছে।
অনেক বছর আগের কথা।
চিত্রা নদীর এই ঘাট তখন নতুন। কড়ইগাছটিও এত বড় হয়নি। নদীর জলে অস্তগামী সূর্যের আলো ভেঙে ভেঙে পড়ছে।
একটি মেয়ে নদীর ধারে দাঁড়িয়ে। ডোরাকাটা শাড়ি, হলুদ পাড়। হাতে শিউলি ফুলের সাজি।
মুখে কোনো কথা নেই। ঠোঁটে শুধু হাসি।
এই হাসিতেই কখন যে চার চোখের মিলন ঘটে গেল, কেউই তা টের পায়নি।
রহিম চাচা চোখ খুললেন।
ঠিক তখনই নদীর ওপারের জানালায় আলো জ্বলে উঠল। তাঁর মুখে অদ্ভুত এক প্রশান্তি নেমে এল।
তিনি খুব আস্তে, এতটাই আস্তে যে নিজের কান ছাড়া আর কেউ শুনতে পেল না, একটি নাম উচ্চারণ করলেন—
‘নীলা...’
নদীর ওপার থেকে কোনো উত্তর এল না।
তবু তাঁর মনে হলো, সন্ধ্যার বাতাস যেন নিঃশব্দে উত্তর বয়ে নিয়ে এল এপারে।
পাঁচ.
এর পর থেকে রায়হান প্রায় প্রতিদিনই সন্ধ্যার আগে ঘাটে চলে আসে।
সে আর কোনো প্রশ্ন করে না।
শুধু রহিম চাচার পাশে বসে চিত্রার ওপারের জানালার দিকে চেয়ে থাকে। কখন আলো জ্বলে উঠবে—এই অপেক্ষা যেন মনের অজান্তেই তারও অভ্যাস হয়ে গেল।
কিন্তু একদিন আলো জ্বলল না।
সেদিন আকাশে মেঘ ছিল না। বাতাসও ছিল শান্ত। তবু জানালাটি অন্ধকারই রয়ে গেল।
রহিম চাচা বসে রইলেন।
আজানের ধ্বনি মিলিয়ে গেল। একে একে গ্রামের ঘরগুলোতে আলো জ্বলে উঠল। নদীর ওপর রাত নেমে এল। কিন্তু ওপারের সেই জানালায় কোনো আলো নেই।
অনেক রাত পর্যন্ত তিনি ঘাট ছাড়লেন না।
পরদিনও আলো জ্বলল না।
তার পরের দিনও না।
চতুর্থ দিন বিকেলে রহিম চাচা ঘাটে এসে বসলেন না। গ্রামের মানুষ দেখল, তিনি নৌকাঘাটের দিকে হাঁটছেন।
কেউ তাঁকে থামাল না।
চিত্রা নদী তিনি শেষ কবে পার হয়েছিলেন, তা তাঁর নিজেরও মনে নেই।
নৌকা যখন মাঝনদীতে পৌঁছাল, তিনি একবার শুধু জলের দিকে তাকালেন। মনে হলো, নদী আজও আগের মতোই বয়ে চলেছে। বদলেছে শুধু মানুষের সময়।
ওপারের বাড়িটি খুঁজে পেতে কষ্ট হলো না।
উঠানে কয়েকজন মানুষ নিঃশব্দে বসে ছিল। শোকের নীরবতা তখনো বাড়িটিকে ঘিরে আছে।
একজন বৃদ্ধ তাঁকে দেখে এগিয়ে এলেন।
রহিম চাচা কাঁপা গলায় শুধু জিজ্ঞেস করলেন,
—এই বাড়ির...নীলা?
লোকটি ধীরে মাথা নাড়ল।
—তিন দিন হলো, তিনি চলে গেছেন।
কথাটি শুনে রহিম চাচা কোনো শব্দ করলেন না।
শুধু চোখ বন্ধ করলেন।
মনে হলো, দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের সন্ধ্যা এক মুহূর্তে শেষ হয়ে গেল।
ঠিক তখনই বাড়ির ভেতর থেকে একটি কিশোরী বেরিয়ে এল। তার হাতে একটি ছোট্ট প্রদীপ।
সে অভ্যাসমতো জানালার কাছে গিয়ে প্রদীপটি জ্বালিয়ে দিল।
রহিম চাচা বিস্মিত হয়ে চেয়ে রইলেন।
বৃদ্ধ লোকটি মৃদু স্বরে বললেন—ও আমার নাতনি। তার দাদি বলে গেছেন, ‘সন্ধ্যা হলে এই জানালায় আলো জ্বালতে ভুলো না। ওপারের একজন মানুষ আলো না দেখলে ভীষণ চিন্তা করবে।’
রহিম চাচার ঠোঁট কেঁপে উঠল।
পঞ্চাশ বছরে তাঁরা একবারও দেখা করেননি।
একটি চিঠিও আর লেখা হয়নি।
কোনো খবর আদান-প্রদান হয়নি।
শুধু প্রতি সন্ধ্যায় একটি আলো জ্বলে উঠেছে। তা দেখেই এপারের একজন মানুষ নিশ্চিন্তে বাড়ি ফিরেছেন।
এই ছিল তাঁদের সমস্ত কথা।
এই ছিল তাঁদের সারা জীবনের সম্পর্ক।
রহিম চাচা ধীরে ধীরে জানালার দিকে তাকিয়ে মাথা নত করলেন।
তারপর ফিরে এলেন।
নদী পার হওয়ার সময় পশ্চিম আকাশে শেষ আলোটুকু মিলিয়ে যাচ্ছিল। চিত্রার জলে তখন দুটি আলোর রেখা ভাসছিল—একটি আকাশের, আরেকটি জানালার।
রায়হান সেদিন ঘাটে দাঁড়িয়ে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল।
রহিম চাচা কাছে এসে শুধু বললেন—মনে রাখিস, মানুষের সব কথা মুখে বলতে হয় না। কিছু কথা আলো হয়ে বেঁচে থাকে।
সেদিনের পরও প্রতি সন্ধ্যায় চিত্রার ওপারের সেই জানালায় আলো জ্বলে উঠত। রহিম চাচা তাই দেখে বাড়ি ফিরতেন।
তিনি যত দিন বেঁচে ছিলেন, তত দিন ঘাটে এসে বসতেন। আলোটি জ্বলে উঠলে নীরবে বাড়ি ফিরতেন।
গ্রামের মানুষ আজও বলে, ভালোবাসার গভীর ভাষা শব্দে নয়, নীরবতায়। চিত্রা নদীর তীরে, বহু বছর ধরে, সন্ধ্যার একটি আলোই তার সাক্ষী হয়ে আছে।
ঢাকা,
১২/০৭/২০২৬ খ্রি.