আরিফ ভাই, চার নম্বর ফর্মার ফন্ট কি ছোট হয়ে গেছে?
সুমন হাতের কাগজগুলো আমার টেবিলের ওপর রাখল। সদ্য ছাপা হয়ে আসা কাগজের গা থেকে কাঁচা কালির ঈষৎ ঝাঁজালো গন্ধ আসছে। গন্ধটা বেশ ভালো লাগছে। আমি চশমাটা নাকের ওপর ঠেলে দিয়ে বললাম, ‘না রে, সুমন। ফন্ট ঠিকই আছে। মাঝখানের স্পেস একটু বেশি দেওয়া হয়েছে তো, তাই চোখের ভুল হচ্ছে।’
‘তাহলে বাইন্ডিংয়ে পাঠায় দিই?’
‘দে। আর শোন, রফিককে বলিস তো এক কাপ চা দিতে। চিনি কম, আদা বেশি।’
সুমন চলে গেল। টেবিলের ওপর রাখা পুরোনো ফিলিপস ফ্যানটা ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ করে ঘুরছে। এই ফ্যানটার নিজস্ব একটা চরিত্র আছে। টানা দশ মিনিট ঘোরার পর সে একটু ঝিমোয়, তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার ঘুরতে শুরু করে।
টেবিলের কাচের ওপর রাখা হাতঘড়িটা বিকেল সাড়ে পাঁচটার খবর দিচ্ছে। আকাশে কালো মেঘের দৌড়াদৌড়ি। ঢাকা শহরের এই অদ্ভুত বিকেল। মেঘগুলো অভিমান জমিয়ে শহরটার ওপর ঘুরতে থাকে, কিন্তু নামতে চায় না।
প্রথম ফোঁটাটা এসে পড়ল জানালার ধুলো জমা কাচে। ধুলোর আস্তরণ কেটে একচিলতে পরিষ্কার জলের রেখা তৈরি হলো। তারপর আরেকটা, তারপর বহু।
বৃষ্টি নামল। ব্যাগটা কাঁধে নিলাম। ব্যাগের এক পাশে একটা ছোট ছাতা ঝুলছে। ছাতাটা কেন ব্যাগে থাকে আমি জানি না। বৃষ্টি নামলে কখনো ছাতা খুলি না। ছাতা খুললে বৃষ্টির আসল শব্দটা পাওয়া যায় না। কাপড়ে জল লাগার একটা চমৎকার শব্দ আছে, ছাতা সেই শব্দটা আটকে দেয়।
কাকভেজা হয়ে হেঁটে সামাদ মিয়ার চায়ের দোকানে আসলাম। টিএসসির এই চায়ের দোকানটার ওপর একটা কালো পলিথিন টাঙানো। পলিথিনের ওপর বৃষ্টির ফোঁটার চমৎকার তবলা বাজছে।
দোকানের কাঠের বেঞ্চির এক কোণে একজন মেয়ে বসে আছে। মাথায় কালো কাপড়ের হুডি টানা, চোখে চওড়া ফ্রেমের চশমা। ভিজতে ভিজতে এসে এখানে আশ্রয় নিয়েছে। আমাকে দেখে সামান্য সরে দাঁড়াল।
মেয়েটির নাম নীলা। এই শহরের কোটি কোটি মানুষ তাকে চেনে অন্য নামে। কখনো বিলবোর্ডে সানসিল্কের বিজ্ঞাপনে, কখনো খবরের কাগজের রঙিন ফ্যাশন পাতায়, আবার কখনো ওটিটির পর্দায় ‘নিতু’, ‘রিয়া’ কিংবা ‘তনয়া’ চরিত্রে তার ঝলমলে হাসিমুখ ভেসে ওঠে। দর্শক ভিড় জমায় তার সাবলীল অভিনয় আর সংলাপে।
সামাদ চা দিয়ে গেল। চায়ের কাপ থেকে হালকা ধোঁয়া উঠছে। হাতে একফোঁটা বৃষ্টি ছুঁয়ে নীলা বলল, ‘আজকেও ছাতা খোলেননি?’
আমি চায়ের কাপে চুমুক দিলাম। তারপর বললাম, ‘ছাতা খুললে বৃষ্টির শব্দ পাওয়া যায় না। কাপড়ে জল লাগার একটা শব্দ আছে, ওটা বন্ধ হয়ে যায়। আপনি বৃষ্টির শব্দ শুনবেন?’
নীলা একটু হাসল। তারপর বলল, ‘আপনার কথাগুলো না খুব উদ্ভট, মানুষ বৃষ্টি থেকে বাঁচতে চায়, আর আপনি শব্দ শোনেন! আপনার শব্দ আপনিই শোনেন।’
‘বাঁচতে চাওয়ার দরকার যাদের আছে, তারা ছাতা খোলে। আমার বাঁচতে চাওয়া কিংবা কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই।’
নীলার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল বছর তিনেক আগে। ধানমন্ডি লেকের আট নম্বর ব্রিজের কোণের জলপাইগাছটার নিচে, এক বৃষ্টিমুখর বিকেলে। নীলা ভিজে একাকার হয়ে ছুটে এসে দাঁড়িয়েছিল গাছটার নিচে।
আমার পিঠে ব্যাগ, ব্যাগের পাশেই একটা ছাতা ঝুলছে। অথচ আমি ভিজছি। নীলা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনার ব্যাগে ছাতা, তা–ও ভিজছেন কেন?’
আমি কোনো উত্তর দিলাম না। মেয়েটাকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য যে চুপ করে রইলাম, তা না। আমি আসলে তখন তার ভেজা চুলগুলো দেখছিলাম। কালো চুল বেয়ে পানির ফোঁটাগুলো টুপটুপ করে গড়িয়ে পড়ছে তার পিঠ দিয়ে। সেই দৃশ্য এত অদ্ভুত সুন্দর ছিল যে উত্তর দেওয়ার কথা আমার মনেই এল না। কিছু মুগ্ধতার কোনো উত্তর হয় না।
তার পর থেকে সপ্তাহের কোনো না কোনো সময়, কোনো না কোনো বাহানায় আমাদের দেখা হয়ে যায়। কখনো টিএসসিতে, কখনো চারুকলার আমতলায়, আবার কখনো লেকের বেঞ্চে।
আমরা কেউ কারও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রশ্ন করি না। আমি জানি না, তার নতুন সিনেমার নাম কী; সে–ও জানে না আমার এই ছোট প্রকাশনীর বেতন প্রতি মাসে সময়মতো হয় কি না। আমাদের কোনো ফোন নম্বর আদান-প্রদান হয়নি। ফেসবুকের লেনদেন নেই।
সম্পর্কের একটা নাম থাকতে হয়; এই ধারণাতেই আমার আপত্তি আছে। সম্পর্কের নাম থাকতে নেই। নাম দিলে সম্পর্ক ভারী হয়ে যায়।
ঝুম করে বৃষ্টি বাড়ল। নীলা চশমাটা খুলে ওড়না দিয়ে মুছল। তার চোখের নিচে হালকা কালি। টানা ক্যামেরার ফ্ল্যাশ আর মেকআপের পেছনে আসল মানুষটা যে কতটা ক্লান্ত, তা কেবল এই ম্লান আলোতেই বোঝা যায়। ‘খুব ক্লান্ত লাগছে আজ’—নীলা চশমাটা চোখে দিতে দিতে বলল।
‘ঘুম হয়নি?’
‘না। চোখ বন্ধ করলেই মনে হয় চারপাশে লাইট-ক্যামেরা চলছে। কেউ একজন চেঁচিয়ে বলছে, “থ্রি, টু, ওয়ান—অ্যাকশন!” নিজের একটা জীবন ছিল আরিফ, আমি সেটা হারিয়ে ফেলেছি।’
আমি চায়ের কাপটা মাটির ওপর রাখলাম। তারপর নীলার দিকে ফিরে বললাম, ‘ঘুম না আসলে ছাদে গিয়ে বসে থাকবে। রাত তিনটায় এই শহরের কোনো ক্যামেরা চলে না। পুরো ঢাকা শহর তখন শুধু তোমার।’
নীলা আমার দিকে তাকাল। তার চোখে একধরনের গভীর বিস্ময়।
বিস্ময়ের চোখে বলল, ‘তুমি এত শান্ত কী করে আরিফ?’
আমি একটু হাসলাম। উত্তর দিলাম না। উত্তর দিতে ইচ্ছে হয়নি অথবা উত্তরটাই জানা নেই। হুমায়ূন আহমেদের ‘ময়ূরাক্ষী’ বইয়ে পড়েছিলাম, ‘ভালোবাসার মানুষের খুব কাছে যেতে নেই।’
নীলাকে ভালোবাসি। এই কথা আমি জানি, এই শহরের বৃষ্টি জানে, মেঘ জানে। ধানমন্ডি লেকের বেঞ্চ জানে আর জানে আমার পকেটের ওই ছোট্ট চিরকুট। কিন্তু তাকে বলা যায় না। যে মানুষটা আকাশের তারা, তাকে মাটিতে টেনে আনার মতো স্বার্থপরতা আমার নেই। তা ছাড়া ভালোবাসার কথা বলে দিলে ভালোবাসাটা খুব সাধারণ হয়ে যায়। না-বলা কথাগুলোর আয়ু অনেক বেশি।
‘হাঁটবে কিছুটা?’ নীলা বলল।
‘তোমার ঠান্ডা লেগে যাবে। কাল শুটিং নেই?’
‘থাকুক। আজ ভিজব।’
আমরা পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করলাম। দোয়েল চত্বরের মাটির জিনিসপত্রের দোকানগুলো বৃষ্টিতে ভিজে চকচক করছে। ভেজা কৃষ্ণচূড়ার পাপড়িগুলো পিচঢালা রাস্তায় রক্তের মতো ছড়িয়ে আছে। আমাদের মাঝখানে এক হাতের দূরত্ব। এই এক হাতের ভেতর যেন একটা আস্ত নদী বয়ে যাচ্ছে। নীরব নদী।
‘আরিফ?’
‘বলো।’
‘তুমি কখনো কাউকে ভালোবেসেছ?’
আমি থামলাম। পায়ের নিচে একটা কৃষ্ণচূড়ার পাপড়ি পেষণ খেল। একটু দম নিয়ে বললাম, ‘ভালো আবার কীভাবে বাসে নীলা? মানুষ তো শুধু অভ্যস্ত হয়ে যায়। চায়ে অভ্যস্ত হয়, বৃষ্টিতে অভ্যস্ত হয়, মানুষের উপস্থিতিতে অভ্যস্ত হয়।’
‘তুমি খুব বাজে একটা ছেলে, সব সময় খোলসের ভেতরে ঢুকে থাকো।’ নীলা অভিমানের সুরে বলল।
‘খোলস না থাকলে শামুকগুলোও মরে যায় নীলা। আমরা সবাই খোলস পড়ে আছি। খোলস ছাড়া বাঁচতে নেই।’
আমরা কার্জন হলের সামনে এসে দাঁড়ালাম। লাল ইটের পুরোনো দালানটা বৃষ্টিতে ধুয়ে পরিষ্কার। বেশ সুন্দর লাগছে।
নীলা আমার দিকে পেছন ফিরে দাঁড়াল। তার চুল থেকে বৃষ্টির ফোঁটা টুপটুপ করে পড়ছে।
‘আমার একটা কথা বলার ছিল আরিফ।’ নীলা বলল।
‘বলো।’
‘আমি হয়তো আর বেশি দিন এ শহরে থাকব না।’
আমি চুপ করে রইলাম। পকেটে হাত দিলাম। পকেটের রাখা চিরকুটটা এখনো পকেটেই আছে। কাগজটা পুরোনো হয়ে গেছে। লেখাগুলো মুছে গেল কি না, কে জানে!
‘আম্মু আমার বিয়ে ঠিক করেছে। ছেলে কানাডায় থাকে। সেখানেই স্থায়ী বাস। বিয়ে আগামী মাসে। আমি অভিনয় ছেড়ে দেব। ওখানেই শিফট হয়ে যাব।’
কার্জন হলের লাল দেয়াল। বৃষ্টির শব্দ আর রাস্তার হর্ন—সব যেন একমুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। খানিকটা চুপ থেকে বললাম, ‘ভালো।’
নীলা ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখে জল। সেই জল বৃষ্টির, নাকি অভিমানের, বুঝতে পারলাম না।
‘তোমার শুধু এতটুকুই বলার আছে?’ নীলা প্রায় চেঁচিয়ে উঠল।
‘সুখী হও নীলা। কোলাহল তোমার সহ্য হয় না। সেখানকার নিরিবিলি জীবন তোমার ভালো লাগবে।’
নীলা কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আর একমুহূর্তও দাঁড়াল না। ছাতা না খুলেই দৌড়ে গিয়ে রাস্তার ওপারে থাকা তার গাড়িটায় গিয়ে উঠল।
গাড়ি চলে গেল। লাল রঙের পেছনের আলোটা বৃষ্টিভেজা রাস্তায় একটা দীর্ঘ রেখা টেনে মিলিয়ে গেল টিএসসির মোড়ে। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার চোখ শুকনা। কোনো কষ্ট হচ্ছে না। কষ্ট হওয়ার কথা নয়। শুধু মনে হলো, আমার ভেতরের খুব গোপন এক রাজপ্রাসাদ তাসের ঘরের মতো হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। কিন্তু তার কোনো শব্দ হলো না।
কেটে গেল ৯ বছর। আজ ২৬ জুলাই। বাংলা সনের শ্রাবণ মাস। ঢাকায় আকাশ বেয়ে অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামছে। আমার চুলে দু-একটা সাদা রেখা ফুটে উঠলেও অভ্যাসগুলো বদলায়নি। এখনো বিকেলে টিএসসিতে যাই, সামাদ মিয়ার কাছ থেকে এক কাপ আদা চা নিই, তারপর এসে বসি ধানমন্ডি লেকের শতবর্ষী জলপাইগাছটার নিচে বেঞ্চে।
খবরের কাগজে নীলার ছবি মাঝেমধ্যে দেখি। কানাডায় সে সুখে আছে। তার দুটি সন্তান হয়েছে। সে আর অভিনয়ে ফেরেনি।
লেকের পানিতে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে বুদবুদ তৈরি হচ্ছে। হঠাৎ একটা কালো গাড়ি এসে বেঞ্চের সামনে থামল। গাড়ির জানালার কাচটা ধীরে ধীরে নিচে নেমে এল। ভেতরে নীলা বসে আছে। পরনে দামি শাড়ি, চুলে একটু পরিপক্বতার ছোঁয়া। নীলা হয়তো কিছুদিনের জন্য দেশে এসেছে।
৯টা বছর। কত মেঘ উড়ে গেল ঢাকার আকাশ থেকে! কতবার বৃষ্টি হলো, কত ধুলো উড়ে গেল অন্য শহরে!
নীলা আমার দিকে তাকাল। চোখমুখে অভিমান স্পষ্ট। কিছু বলল না। ফোন স্ক্রিনে নজর ঘুরিয়ে নিল।
ড্রাইভার গাড়ির কাচ উঠিয়ে দিল। নীলার গাড়িটা সুন্দর। কালো রোলস–রয়েস। আস্তে আস্তে গাড়িটা হারিয়ে গেল বৃষ্টির ভেতর।
আমি পকেট থেকে পুরোনো চিঠিটা বের করলাম। কাগজটা হলুদ হয়ে গেছে। লেখাগুলো আজও স্পষ্ট। তাতে লেখা—
‘প্রিয় নীলা,
ধানমন্ডি লেকে শ্রাবণের বিকেল, জলপাইগাছের নিচে তোমাকে প্রথম দেখার মুহূর্তটি আমার বুকের ভেতর তোলপাড় করে তুলেছিল। তোমার কালো কেশের ঢাল বেয়ে নেমে আসা জল যেন পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা কোনো অবাধ্য ঝরনা। ওই জলবিন্দুর মধ্যে আমি পৃথিবীর সমস্ত নিস্তব্ধ সৌন্দর্যকে একসঙ্গে গলে পড়তে দেখলাম।
সেদিনই হৃদয়ের সমস্ত আকুলতা কাগজে এঁকে ভেবেছিলাম, তোমার হাতে নিজেকে সমর্পণ করব। আমি নিজেকে সমর্পণ করতে পারিনি। ধূলোমলিন ছাপাখানার কঠিন বাস্তবতা আমাকে থামিয়ে দিল। তুমি আকাশের নক্ষত্র, আর আমি মাটিতে পড়ে থাকা ধূলিকণা— দূর থেকে তোমার আলো বন্দনা করাই আমার এই নিঃসঙ্গ জীবনের পরম সার্থকতা। তোমাকে আমার ধূসর ক্যানভাসে টেনে এনে তোমার আলো ম্লান করার স্পর্ধা আমার নেই।
তুমি দিগন্তের আলো হয়েই জ্বলতে থাকো। আর আমি আমার নিঃসঙ্গতায় বসে সেই আলো বুকে জড়িয়ে কাটিয়ে দেব বাকিটা জীবন।’
চিঠিটা লেকের পানিতে ভাসিয়ে দিলাম। কাগজটা কিছুক্ষণ ভেসে রইল। তারপর বৃষ্টির ঝাপটায় ভিজে ধীরে ধীরে তলিয়ে গেল পানির নিচে। কালি ধুয়ে পানির সঙ্গে মিশে গেল।
ঢাকা শহরে বৃষ্টি নামছে। অঝোর ধারায় বৃষ্টি। আমি ভিজতে ভিজতে হাঁটতে শুরু করলাম…
সাংগঠনিক সম্পাদক, ঢাকা মহানগর বন্ধুসভা