কমিটির সদস্যরা তড়িঘড়ি করে ঢাকা মেডিকেলে গেলেন। রফিক সাহেবের বউ ও মেয়ে বিমর্ষ হয়ে তাঁর পাশে বসে আছেন।
অফিসে ঢুকে রফিক সাহেব দেখলেন, আজ আর কেউ মুখ তুলে তাকাচ্ছে না। দূর থেকে কেউ বলে উঠছে না, ‘আসসালামু আলাইকুম রফিক সাহেব, কেমন আছেন?’
সবাই নিজ নিজ কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে কাজে ব্যস্ত। এমনটা তো হওয়ার কথা নয়। হঠাৎ করে কেন অফিসের পরিবেশটা বদলে গেল, সেটা রফিক সাহেব বুঝে উঠতে পারছেন না। যদিও আজ জ্যামের কারণে তিনি ১৫ মিনিট দেরিতে অফিসে প্রবেশ করেছেন।
নিজের ডেস্কে বসেই ল্যাপটপটা খুলে বসলেন রফিক সাহেব। এখনো চিন্তায় মগ্ন। চিন্তায় ছেদ পড়ল সাদাফ ভাইয়ের হোয়াটসঅ্যাপের মেসেজে। রুমে ডাকছেন। সাদাফ ভাই রফিক সাহেবের সুপারভাইজার।
সেখানে গিয়ে রফিক সাহেবের মনে হলো, অফিসে বড় ধরনের কিছু একটা হয়েছে। সাদাফ ভাইয়েরও মুখটা থমথমে। ল্যাপটপটা আলতো ভাঁজ করে রফিক সাহেবকে বললেন, ‘আপনার নামে একটা অভিযোগ এসেছে। আমরা আপনাকে আপাতত কোনো কাজে নিযুক্ত করতে পারছি না।’
রফিক সাহেবের মাথায় যেন বাজ পড়ল। এমন কোনো কিছু তো তিনি করেননি, যাতে ওনার নামে কেউ অভিযোগ করতে পারেন।
‘আপনি আপাতত ল্যাপটপ জমা দিয়ে দেন। আমরা ইতিমধ্যে একটা তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। আপনি আগামী সাত দিন কোনো ধরনের কাজ করবেন না এবং কোথাও ভিজিট প্ল্যান থাকলে সেটা বাদ দেওয়ার অনুরোধ রইল। তদন্তের স্বার্থে কমিটির সদস্যদের সহযোগিতা করতে আপনাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার জন্য বলা হলো। আপনি এখন আসতে পারেন।’
রুম থেকে বের হয়ে রফিক সাহেবের মনে হলো, এত দিন নিষ্ঠার সঙ্গে চাকরি করে শেষ বয়সে অভিযোগের ভার মাথায় নিতে হচ্ছে। কিন্তু, কী অভিযোগ, সেটা তিনি তখনো জানেন না। অভিযোগ তো অভিযোগই। অফিসে অর্থ ও নারীবিষয়ক অভিযোগকে জিরো টলারেন্স হিসেবে গণ্য করা হয়। সবে মেয়েটা স্কুল শেষ করে কলেজে ভর্তি হলো। এই বয়সে চাকরি চলে গেলে কী হবে!
ডেস্কে যেতে যেতে সবাই যেন অদ্ভুতভাবে তাকাচ্ছে। কেন তাকাচ্ছে এভাবে? কারও সঙ্গে কথা বলারও সাহস হচ্ছে না। ডেস্কে গিয়ে দেখেন, ল্যাপটপ নেওয়ার জন্য হাসান ভাই দাঁড়িয়ে আছেন।
রফিক সাহেবের কেমন শূন্য শূন্য লাগছে। একটা মানুষ অফিসে আসবে অথচ কোনো কাজ না করে নিজের ডেস্কে বসে থাকবে, এর থেকে তো মরে যাওয়া ভালো। সরকারি চাকরিতে ওএসডির মতো।
রফিক সাহেবের কী যে যন্ত্রণা হচ্ছে ভেতরে। বাসায় এ কথা কীভাবে বলবে? সাত দিন পর যদি চাকরিটাই না থাকে! এ বয়সে চাকরি কে দেবে?
তদন্তের পঞ্চম দিনে রফিক সাহেবের ডাক পড়ল। তদন্ত কমিটির তিনজনের মধ্যে একজন রয়েছেন মানবসম্পদ বিভাগের।
গত চার দিন রফিক সাহেব ঠিকমতো ঘুমাতে পারেননি। অফিসের বিভিন্ন কানাঘুষা থেকে জানতে পেরেছেন, তাঁর নামে একজন মহিলা অভিযোগ করেছেন, যাকে তিনি তেমন চেনেনও না। দু–একবার লিফটে দেখা হয়েছে।
‘রফিক সাহেব, আপনার সঙ্গে আমরা আজকে এবং আগামীকাল সিডিউল রেখেছি। আপনার প্রতি অনুরোধ রইল, আপনি আমাদের তদন্ত কমিটিকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবেন। আমরা এখনো জানি না, আপনার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা কতটুকু।’
রফিক সাহেব সেদিন রাতে ঘুমাতে পারলেন না। মধ্যরাতে হঠাৎ করে বুকে ব্যথা শুরু হয়। এই বয়সে এত চাপ নিতে পারছেন না। পুব আকাশে ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে ওনাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
তদন্ত কমিটির মেম্বাররা চিন্তায় পড়ে গেলেন, কী করবেন এখন। রফিক সাহেবের যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে অফিসও ঝামেলায় পড়তে পারে। সেদিন রফিক সাহেবের স্লট পরিবর্তন করা হলো এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মী রাবেয়াকে ডাকা হলো।
‘রাবেয়া গত বৃহস্পতিবার তুমি সকালে কখন অফিসে এসেছ?’
‘স্যার, অফিস তো শুরু হয় ৯টায়। আমি সাড়ে ৮টার দিকে বাথরুম পরিষ্কার করতে গেছিলাম।’
‘তুমি কি কিছু দেখেছ বা শুনেছ ওই দিন?’
‘স্যার হুনছি। বাথরুমের ভেতর থেইকা শবনম ম্যাডাম চিৎকার দিছেন। আমগো সাততলার রফিক স্যার আছে না, উনি ভুলে ম্যাডামগো বাথরুমে হান্দাই গেছেন। এত সকালে তো অফিসে কেউ আসেন না। আর রফিক স্যারের তো ডায়াবেটিস, উনি বাথরুম চেপে রাখতে পারেন না। তাই অনেক সময় স্যার দুই তলায় এসে কাজ সেরে ওপরে ওঠেন।’
‘তারপর?’
‘আমি চিৎকার হুইনা বাথরুমে ঢুইকা দেখি, রফিক স্যার সরি সরি করতাছেন ভেতর থেইকা। ম্যাডাম আমারে কইছিল, কেউ যেন না ঢুকে, আমি কাপড় বদলাব। আমার কাজ করতে করতে খেয়াল আছিল না। ম্যাডামগো বাথরুমের ভিতর আবার তিনটা বাথরুম। ম্যাডাম যেইটাতে ঢুকছে, রফিক স্যার ঢুকছে অন্যটাতে। আমি যাই দেহি, স্যার খাড়াই খাড়াই মুততাছে, আর সরি সরি কইতাছে ম্যাডামরে। এই দেইখা ম্যাডাম বাহির থেকে চিল্লাইতেছে। রফিক স্যার ভুলে মনে হয় দরজা লাগায় নাই।’
‘তোমার রফিক স্যার কি ম্যাডামরে খারাপ কিছু কইছে বা গায়ে হাত দিছে?’
‘কী কন স্যার, এমন করব কেন? স্যার তো ভালা মানুষ। স্যার তো বাহির হইয়্যাই উপরে চলে গেল।’
কমিটির সদস্যরা তড়িঘড়ি করে ঢাকা মেডিকেলে গেলেন। রফিক সাহেবের বউ ও মেয়ে বিমর্ষ হয়ে তাঁর পাশে বসে আছেন। রফিক সাহেব হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। যেভাবে তাঁকে হেনস্তা করা হয় বিভিন্ন প্রশ্নের মাধ্যমে, তা তিনি সহ্য করতে পারেননি। তিনি নাকি বাথরুমে ঢুকে শবনমকে শ্লীলতাহানি করেছেন। তা–ও সদ্য পাস করা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণীকে!
‘আচ্ছা রাবেয়া, তুমি বলতেছ, তোমার স্যার প্রায়ই দুই তলার বাথরুম ব্যবহার করেন। তাহলে তিনি কেন মেয়েদের বাথরুমে ঢুকবেন?’
‘স্যার ভুলটা আমারই হইছে। আমি ঝাড়ু দেওয়ার সময় লেবেল ট্যাগ খুলে ঝাড়ু দি। সেদিন ভুলে ছেলেগো জায়গায় মেয়েগো লেবেল লাগাই দিছি। রফিক স্যার প্রথমে ঠিকটায় যাইতে চাইছিল দেখলাম। পরে লেবেল দেইখা ম্যাডামগো বাথরুমে ঢুইকা গেছে।’
‘স্যার ভুলটা আমারই হইছে।’