লাভ ক্যান্ডি

ছবি: এআই/বন্ধুসভা
এক প্যাকেট চকলেট পেয়ে মানুষ এত খুশি হয়, তা মালিহাকে না দেখলে বুঝতে পারতাম না।

ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে অস্তমিত সূর্যের দিকে তাকিয়ে আছি। সন্ধ্যার পূর্বমুহূর্তে দিনের শেষভাগে সমুদ্রের আকাশ এতটা সুন্দর আর মায়াময়, যা কলাতলীর রামাদা হোটেলের ১০ তলায় দাঁড়িয়ে না দেখলে হয়তো বুঝতে পারতাম না।

হঠাৎ মোবাইল ফোনের রিংটোন বেজে উঠল। নম্বর সেভ না থাকলেও পরিচিত মনে হচ্ছে।
‘হ্যালো। আসসালামু আলাইকুম। আমি মালিহা বলছি। আপনি কি শফিক বলছেন?’
এতক্ষণে বুঝলাম নম্বরটা কেন পরিচিত মনে হচ্ছে। গত রাতে মেইলে এই নাম আর নম্বরটা দেখেছি।
‘ওয়ালাইকুম সালাম। জি, আমি শফিক বলছি।’
‘আগামীকাল সকালে আপনার সঙ্গে আমার একটা ভিজিট রয়েছে। আমার হয়তো ঢাকা থেকে আসতে ভোর পাঁচটা বেজে যাবে। আপনি কি আমাকে হোটেলের ঠিকানাটা বুঝিয়ে দেবেন? কক্সবাজারে গিয়ে কোথায় নামব?’

সূর্যের অর্ধেক এরই মধ্যে সমুদ্রের ভেতর ডুবে গেছে। ইচ্ছা করছে সূর্যটাকে আলপিন দিয়ে আটকে এই মনোরম দৃশ্য উপভোগ করি; কিন্তু হলো না। এই সময়ে মালিহা বিস্তারিত যা জানতে চেয়েছে, তা বুঝিয়ে দিতে হলো।

চট্টগ্রাম থেকে যখন কক্সবাজারের উদ্দেশে বের হলাম তখন বড় বোনের ছোট মেয়ে আনিকা আমাকে দুটি লাভ ক্যান্ডি ধরিয়ে দিল। যদিও চকলেট তেমন খাই না। তবু ছোট মানুষ যখন দিল, না নিয়ে পারা যায়?

আমাদের ভিজিট শেষ। ক্ষুধায় পেট জ্বলছে। মনে হচ্ছে, এই ভরদুপুরে যা পাওয়া যাবে, তা–ই গপাগপ খেয়ে ফেলা যাবে। কিন্তু গাড়ির ড্রাইভার মারফত জানতে পারলাম, খাবারের দোকান পেতে হলে আরও আধা ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে যেতে হবে।
মালিহা বলল, ‘এখন কী হবে? আমি তো ক্ষুধা সহ্য করতে পারি না।’
কী মনে করে জানি না, ভাগনির দেওয়া একটা লাভ ক্যান্ডি মালিহার দিকে এগিয়ে দিলাম। মেয়েটা চকলেট পেয়ে কিছুটা আশাহত হলো মনে হচ্ছে। হয়তো ভেবেছিল, পকেটে আরও ভালো কোনো খাবারের সন্ধান পাওয়া যাবে!

আরও পড়ুন

চকলেট চুষতে চুষতে সে ধন্যবাদ জানাল। বলল, ‘অন্তত এটা চুষে ক্ষুধাটাকে কিছুক্ষণ হলেও ভুলে থাকা যাবে।’ কথাটা শুনে কী যে মায়া লাগল।

কক্সবাজার শহরে পৌঁছে কী মনে করে জানি না, এক প্যাকেট লাভ ক্যান্ডি কিনে ফেললাম। মালিহাকে ঢাকার গাড়িতে উঠিয়ে দেওয়ার সময় চকলেটের প্যাকেটটা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললাম, ‘বাসে যদি ক্ষুধা লাগে লাভ ক্যান্ডি খাবেন। আর ভিজিটে গিয়ে যে ক্ষুধার জ্বালা পেয়েছিলাম, সেটা মনে করবেন।’
এক প্যাকেট চকলেট পেয়ে মানুষ এত খুশি হয়, তা মালিহাকে না দেখলে বুঝতে পারতাম না।

এতটা টায়ার্ড ছিলাম, চট্টগ্রাম পৌঁছে কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম, টেরই পেলাম না। সকাল পেরিয়ে দুপুরে উঠে দেখি হোয়াটসঅ্যাপে অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ।
‘বাসে ঘুম আসছে না। ফেসবুকে স্ক্রলিং করতে করতে পাঁচটা চকলেট খেয়ে ফেললাম। আপনার শহর পার হচ্ছি। আপনি কি ঘুমিয়ে পড়লেন?’

অনেক বেলা করে ঘুম থেকে উঠে মেসেজ পেলাম মালিহার। হয়তো এক ঘুম দিয়ে মালিহা দুপুরের খাবার খাচ্ছে। হোয়াটসঅ্যাপেই কল দিয়ে দিলাম।
‘হ্যালো। আপনি কে বলছেন? আমি মিরসরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ডাক্তার নূর বলছি। গতকাল মিরসরাইয়ে বাস–ট্রাকের সংঘর্ষ হয়। রোগী এখানে ভর্তি। আপনি দ্রুত চলে আসেন।’
কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে, ফোনটা কেটে দিল। হঠাৎ মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল।

বাসা থেকে বের হওয়ার সময় আবারও ভাগনির অনুরোধে একটা লাভ ক্যান্ডি নিয়ে বের হতে হলো।
দেড় ঘণ্টা পর মিরসরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৌঁছে দেখি মালিহা হেলান দিয়ে শুয়ে আছে বেডে। দুই হাত আর মাথায় ব্যান্ডেজ।
আমাকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠল।
‘আ আ আপনি!’
‘জি, আপনার মেসেজ পেয়ে ফোন দিয়েছিলাম। পরে এখানকার ডাক্তার ধরল।’
‘হ্যাঁ। আমাকে ফোনে কথা বলতে দেয়নি। গতকাল রাতে আরেকটু হলে হয়তো মরেই যেতাম। আল্লাহ বাঁচিয়ে দিয়েছেন। ডাক্তার মারফত জানতে পারলাম, আমার পরিবারের মানুষজনও আসছে অ্যাকসিডেন্টের খবর শুনে।’

মালিহাকে সন্ধ্যা সাতটার দিকে রিলিজ দিয়ে দিল। ওর বড় ভাই আর ভাবি এসেছিল নিয়ে যেতে।
যাওয়ার সময় মালিহা বলল, ‘আপনি না এলে আমার এখানে খুব বিরক্ত লাগত। আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। চট্টগ্রাম থেকে এসে বিপদে পাশে থেকেছেন। অ্যাকসিডেন্টের পরে কোনোমতে চিৎকার–চেঁচামেচির মধ্যে বাস থেকে নেমে দেখি মাথা ফেটে গেছে, পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা। পরে স্থানীয় লোকজনের সাহায্যে এখানে আসা।
‘আসি, আপনাকে আবারও ধন্যবাদ।’

আমি হাসিমুখে তাকিয়ে রইলাম।
সে হেঁটে এগিয়ে যাচ্ছে। পেছন থেকে ডাক দিলাম।
‘মালিহা।’
ভাগনির দেওয়া লাভ ক্যান্ডিটা হাতে ধরিয়ে দিলাম।
এই রুগ্‌ণ অবস্থায়ও মানুষ এত সুন্দর করে হেসে ওঠে!
‘আরে আমি তো আপনার দেওয়া প্যাকেটটা হারিয়ে ফেলেছি।’
‘বেঁচে ফিরেছেন, এটাই তো অনেক। হোয়াটসঅ্যাপে ঠিকানা পাঠিয়ে দিয়েন, লাভ ক্যান্ডির প্যাকেট পাঠিয়ে দেব যত চান।’

চোখে চোখে অদ্ভুত আলাপন শেষে দুজনে হেসে বিদায় নিলাম। সেই সঙ্গে ধন্যবাদ দিলাম লাভ ক্যান্ডি আর ভাগনিকে।