কৃষক, পাহাড় আর পুষ্প-বৃক্ষের ছফা

আহমদ ছফা (৩০ জুন ১৯৪৩—২৮ জুলাই ২০০১)

‘সোনার ধানের ওড়না পরা সাগর পাড়ের চর
রাঙা আলোর পরশ বুলায় মুক্ত নীলাম্বর।
বাংলা নামের দেশ রে আহা নরম মাটির তনু
শ্যামরবণী সুন্দরীরা দোলায় ফুলের ধনু
যে দেখেছে প্রাণ ভরেছে শ্যামল বটের ছায়া
দেশ-বিদেশের তীর্থপথিক ভুলতে নারে মায়া।’
—আহমদ ছফা

লেখক আহমদ ছফা নিজেকে একজন কৃষকপ্রেমী পরিচয় দিতে গর্ব করতেন। তিনি বলতেন, ‘আমার পরিবার চাষা। আমার পক্ষে এটা ওভারলুক করা কষ্টকর। রং ছড়িয়ে কিছু বলতে চাই না। আমার পূর্বপুরুষরা সরাসরি কৃষি উৎপাদনের সাথে যুক্ত ছিল। এই পরিচয় আমার অহংকার। আমি জাত চাষা, অনেক চাষার ছেলে আসল পরিচয় দেয় না। তাদেরকে মনে করে জঞ্জাল। আমি মনে করি না। আমি দরিদ্রকে আমার অহংকার মনে করি।’

‘মাঝে মাঝে ভাবি চাষারা লাঙলের মুঠি ধরে দেশটা টিকিয়ে রেখেছে, নয়তো অসাধু আমলা, দুর্নীতিবাজ, রাজনীতিক এবং ফটকা ব্যবসায়ীরা দেশের সমস্ত মাটি মণ মেপে বিদেশে চালান দিত’—(গাভি বৃত্তান্ত)। ‘আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যখন রক্ত দিয়েই চিন্তা করাতে বাধ্য হচ্ছি।’

ষাটের দশকে লেখক আহমদ ছফা স্কুলের পরীক্ষা শেষ করার পর পুলিশের নজরে পড়েছিলেন। পুলিশের হাত থেকে বাঁচার জন্য চট্টগ্রামের পাহাড়ে পালিয়ে গেলেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে তিনি এক বছর তিন মাস কাটিয়েছিলেন। প্রকৃতি ও কৃষকপ্রেমী এই লেখক পায়ে হেঁটে ঘুরে ঘুরে উপভোগ করেছেন পাহাড়ি অঞ্চল। বিলাইছড়ি বাজার থেকে প্রায় এক দিন আধা রাত দুর্গম পাহাড়ি পথ হেঁটে ফারুয়া পর্যন্ত গিয়েছেন। কর্ণফুলী নদীকে আঁকাবাঁকা চিকন একটি রুপালি রেখার মতো উপভোগ করেছেন।

কৃষক পরিবারে জন্ম হলেও নিজের জমিতে কখনো চাষাবাদ করেননি ছফা। পৈতৃক সূত্রে যে জমিগুলো তিনি পেয়েছিলেন, তা চিনে নিতে না পারলেও জমি চাষাবাদের শ্রমিকদের খরচপাতি দিতেন।
আহমদ ছফা বুড়িঘাট বাজারের মইশছড়ি পাহাড়ায় নতুনচন্দ্র কারবারি জমিতে প্রথম মোষের হাল বাইতে শেখেন। আগে কখনো লাঙলের মুঠি ধরেননি। সে সময় জলাশয়ে জোঁকের বিচরণ ছিল। তিনি পার্বত্য এলাকায় মইশা জোঁক দেখেছিলেন। রক্তখেকো মইশা জোঁক পায়ের সঙ্গে কামড়ে ধরলে ছাড়তে চাইত না; মনে হতো কেউ যেন সুপারগ্লু দিয়ে রাবার লাগিয়ে দিয়েছে। জোঁক ছাড়ানো যেত না। লেখক মোষের হাল বাইতে গিয়ে আঙুলে কড়া পড়েছিল। নিতান্ত ঠেলায় পড়ে নতুন চন্দ্র কারবারির বাড়িতে অন্য দিনমজুরের সঙ্গে দিনমজুরের কাছ করেছেন।

আহমদ ছফার সমাধি
ছবি: লেখক

ছফার বাড়িতে আরাম–আয়েশ, খাওয়া–পরা, আদর–যত্নের অভাব ছিল না। তবু সাধ করে লেখক নিজে কষ্টটা মাথায় তুলে নিয়েছিলেন। পার্বত্য এলাকায় অনেক কষ্টের জীবনযাপন করেছেন, যা তিনি ৪০ বছর পরেও স্মরণ করতে ভোলেননি। আহমদ ছফা বলেছিলেন, ‘কষ্টের কথাগুলো আমার মোটেও মনে পড়ে না। অতীতের সুখ-স্মৃতিগুলো মনের আনাচ-কানাচ থেকে উঁকি দিতে থাকে।’

পার্বত্য এলাকায় নতুনচন্দ্র নামে একটি প্রাইমারি স্কুল প্রতিষ্ঠা হলো। স্কুলে উর্দু পড়ানোর জন্য হুজুর পাওয়া যাচ্ছিল না। মাসিক বেতন ২৬ টাকা। লেখক ছফা উর্দু জানতেন। মোষের হাল ছেড়ে তিনি উর্দুর হুজুর হিসেবে স্কুলে কিছুদিন শিক্ষকতা করলেন। তিনি পার্বত্য এলাকায় মহাভারত পাঠ করে শুনিয়েছিলেন নতুনচন্দ্র কারবারিকে। খবরটি পাহাড়ি এলাকায় বাতাসের মতো ছড়িয়ে পড়লে লেখক আহমদ ছফাকে পাহাড়ি লোকজন সম্মান ও ভক্তি করা শুরু করলেন। ছফা বলেছেন, ‘আমার স্মৃতিতে ভাসে অনেক অনেক জ্যোৎস্না জ্বলা রাত। থোকা থোকা পরিপক্ব সিঁদুরে লিপুর মত আকাশের তারাগুলো উপত্যকার নির্জন ভূমির প্রতি তাকিয়ে আছে। কেরোসিনের আলোকে মাচানে ঘরের সামনের আঙিনায় আমি সুর করে মহাভারত পাঠ করছি, অর্থ বুজিয়ে দিচ্ছি, নর-নারী যুবা-বৃদ্ধ অবাক হয়ে যুধিষ্ঠির অর্জুন দ্রোপদী দুর্যোধনের কাহিনী শুনে যাচ্ছে।’

আরও পড়ুন

আহমদ ছফা পাইন্য ফুল পছন্দ করতেন। পাইন্য ফুলের পালং সাজাইয়া রাখি/ রসিক বন্ধুয়া পাইলে করব পিরিতি। লেখক নিজ হাতে মরিচ, কলাগাছের চারা রোপণ করেছেন। এগুলোর প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল। শ্রীলঙ্কার একটা কলা ছিল গরুর শিংয়ের মতো বাঁকা। এক হিন্দু বাড়িতে কলার চারা দেখেছিলেন। কলার চারা কেউ দিত না। এক রাতে হিন্দু বাড়ি থেকে সেই কলার গাছের চারা চুরি করে বাগানে লাগালেন। কলাগাছ বড় হয়ে ফলও দিয়েছে।

প্রকৃতির প্রতি বিশেষ করে পুষ্প বৃক্ষ বিহঙ্গর প্রতি তাঁর যে ভালোবাসা, সত্যিই হৃদয় স্পর্শ করে। লেখক তাঁর ‘একরাত’ কবিতায় লিখেছেন, ‘এখন গভীর রাত—ঈশ্বরের পৃথিবী শান্ত নিসর্গ নিশ্চুপ নক্ষত্রের চোখে ঘুম, পশু-পাখি গাছ-পালা ঘুমে অচেতন আমার নিভৃত প্রাণে নিশাচরী তুলেছ কেতন জ্বালিয়ে দিয়েছ হু হু দাবানল এই রাতে পুড়িছে অন্তর।’

‘পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গপুরাণ’–এ আহমদ ছফা বলেছেন, ‘ফুল ফোটানো সহজ কথা নয় শূন্য থেকে মূর্ত করা সৃষ্টির বিস্ময়। পারে সে জন ভেতর থেকে ফোটার স্বভাব যার, ফালতু লোকের ভাগ্যে থাকে বন্ধ্যা অহংকার।’ লেখকের বৃক্ষের প্রতি যে মায়া ভালোবাসা সত্যি অকল্পনীয়।

আহমদ ছফা। ছবি: নাসির আলী মামুন, ফটোজিয়াম

বৃক্ষের মধ্যে তিনি মানুষের জীবন ও আত্মার সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন। তিনি আপেল চারাকে আপেল শিশু এবং বৃক্ষচারাকে তরুশিশু বলে চমৎকার একটা উপমা উপস্থাপন করেছেন। ‘এই পুষ্প, এই বৃক্ষ, এই তরুলতা, এই বিহঙ্গ আমার জীবন এমন কানায় কানায় ভরিয়ে তুলেছে, আমার মধ্যে কোনো একাকিত্ব, কোনো বিচ্ছিন্নতা আমি অনুভব করতে পারিনি। আমি পাখি পুত্রের কাছে বিশেষভাবে ঋণী। আমার পাখি পুত্র আমাকে যা শিখিয়েছে কোনো মহৎ গ্রন্থ, কোনো তত্ত্বকথা, কোনো গুরুবাণী আমাকে সে শিক্ষা দিতে পারেনি। একমাত্র অন্যকে মুক্ত করেই মানুষ নিজেই মুক্তি অর্জন করতে পারে। আমার পাখি পুত্র মুক্ত আমি মুক্ত আমাদের সম্পর্ক থেকে প্রত্যহ অমৃত উৎপন্ন হয়। এই আকাশের জীবনের সঙ্গে আমার জীবনের যে সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে সেটা কি অমৃত সমুদ্রের অবগাহন নয়?’

২০০১ সালের ২৮ জুলাই, বাংলাদেশের সক্রেটিস খ্যাত কথাসাহিত্যিক আহমদ ছফা সবাইকে কাঁদিয়ে চিরতরে প্রস্থান নেন। তাঁকে সে সময় মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করতে দেওয়া হয়নি। পরবর্তী সময়ে লেখকের শেষ ঠিকানা হলো মিরপুর সাধারণ কবরস্থানের ব্লক ক, ২৮ লাইন  ১০৮৫ নং—সাড়ে তিন হাত মাটির কুটিরে শুয়ে আছেন। তাঁর কবরের নকশা করেছিলেন শিল্পী রশীদ তালুকদার এবং সমাধির ইট ক্রয়ের টাকা দিয়েছিলেন সিলেটের ওবেইদ জায়গীরদার।

লেখকের কবরটি ৯৯ বছর পর ভেঙে ফেলা হবে। আহমদ ছফার ভাতিজা লেখক নুরূল আনোয়ার সম্প্রতি সিটি করপোরেশনে আবেদন করলে গত ১৩ এপ্রিল ডিএনসিসির ১৪তম সভায় আহমদ ছফার কবর মিরপুর কবরস্থান থেকে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হয়। তবে এখনো স্থানান্তর হয়নি। এ বিষয়ে অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান বলেন, ‘আমলাদের অদক্ষতার কারণে কবর স্থানান্তরে বিলম্ব হচ্ছে। আমরা এখন উদ্বেগের সঙ্গে অপেক্ষা করছি।’

আহমদ ছফার জন্মস্থান চট্টগ্রামের চন্দনাইশের গাছবাড়িয়া গ্রামে তাঁর স্মৃতিবিজড়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠাগার স্থাপন, সড়কের নামকরণসহ ও চট্টগ্রামে আহমদ ছফা একাডেমি স্থাপনের জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে সবিনয় নিবেদন করছি।

লেখক ও প্রাবন্ধিক