নজরুলের দ্রোহ কেবল রাজনৈতিক, নাকি গভীর অস্তিত্ববাদী বিপ্লব

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামঅলংকরণ: মাসুক হেলাল

সূর্যের প্রখর মধ্যাহ্নদীপ্তির সমকালে যিনি ধূমকেতুর মতো ঔপনিবেশিক মরীচিকার বিপরীতে দাঁড়িয়ে এক শাশ্বত দ্রোহের জ্যামিতিক নকশাকার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন, তিনি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর সাহিত্যজগৎ কোনো নির্দিষ্ট ভূগোলে বা সাময়িক ক্ষোভের বৃত্তে বন্দী থাকেনি। তাঁর সাহিত্যকর্ম ছিল মানবাত্মার অবদমিত চৈতন্যের এক আদিম ও অন্তহীন বিস্ফোরণ।

এই বিস্ফোরণকে বোঝার জন্য আমাদের প্রথমেই একটি মৌলিক ভ্রান্তি থেকে সরে আসতে হয়। কারণ, নজরুলকে যদি কেবল তাঁর সময়ের রাজনৈতিক ক্ষোভ, কিংবা ঔপনিবেশিক বাস্তবতার প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়, তবে তাঁর সৃষ্টির গভীরতম স্তর আমাদের অদৃশ্যই থেকে যাবে। বাস্তবে তাঁর ‘বিদ্রোহী’ সত্তা কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়; বরং তা ছিল মানুষের খণ্ডিত, সসীম অস্তিত্বের বিরুদ্ধে এক গভীর দার্শনিক পুনর্গঠনের নান্দনিক প্রয়াস।

এই বিস্ফোরণের প্রকৃতি অনুধাবন করতে গেলে আমাদের প্রথমেই একটি মৌলিক ভ্রান্তি থেকে সরে আসতে হবে। কারণ, নজরুলকে যদি কেবল তাঁর সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, সমকালীন ঔপনিবেশিক ক্ষোভ, কিংবা সমাজ-রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে আবদ্ধ করে দেখা হয়, তবে তা তাঁর অতলান্তিক দর্শনকে লঘু করে দেখা হবে।

এই দার্শনিক প্রকৃতি অনুধাবন করতে গেলে নজরুলকে বিশ্বদর্শনের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে স্থাপন করা জরুরি হয়ে পড়ে। এখানে মার্টিন হাইডেগারের ‘ডাজাইন’ ধারণা প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে, যেখানে মানুষকে ‘জগতে ছুড়ে ফেলা’ এক অস্তিত্ব হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু নজরুল এই ছুড়ে ফেলা অস্তিত্বের বেদনাকে নিষ্ক্রিয়ভাবে গ্রহণ করেন না; বরং তিনি সেই গ্লানিকেই রূপান্তর করেন এক উল্লাসময় সৃষ্টিশক্তিতে। অর্থাৎ যেখানে হাইডেগারের মানুষ সংকটে আবদ্ধ, সেখানে নজরুলের মানুষ সেই সংকট ভেঙে উত্তরণের পথ রচনা করে।

তবে এখানেই নজরুলের দর্শনের পরিসর থেমে থাকে না; বরং তা আরও এক ধাপ অগ্রসর হয়ে আমাদের নিয়ে যায় আলব্যের কামুর অস্তিত্ববাদী বিদ্রোহের ধারণার দিকে। কামুর ‘দ্য রেভেল’-এ মানুষ অযৌক্তিকতার বিরুদ্ধে অস্বীকৃতির মধ্য দিয়ে নিজের অস্তিত্বকে প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু নজরুলের বিদ্রোহ সেই অস্বীকৃতিকে অতিক্রম করে। তিনি কেবল ভাঙেন না, ভাঙার মধ্য দিয়েই গড়ে তোলেন। তাঁর দ্রোহ ধ্বংসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ধ্বংসস্তূপ থেকেই নতুন সৃষ্টির পতাকা উড়িয়ে দেয়।

আরও পড়ুন

এই সৃজন ও ধ্বংসের দ্বৈত গতি নজরুলকে এক গভীর দার্শনিক প্যারাডক্সে পরিণত করে, যা আমাদের অনিবার্যভাবে স্মরণ করিয়ে দেয় ফ্রিডরিখ নিৎশের ‘মহামানব’ তত্ত্বকে। নজরুলের ভেতরে আমরা দেখি, একদিকে মানুষ তার শৃঙ্খল ভেঙে নিজের ভাগ্য নিজেই নির্ধারণ করছে, অন্যদিকে ঠিক সেই মুহূর্তেই সে এক পরম আধ্যাত্মিক নৈঃশব্দ্যে আত্মসমর্পণ করছে। এই দ্বৈততা তাঁর দর্শনকে করে তোলে এক গভীর রহস্যময় গোলকধাঁধা, যেখানে বিদ্রোহ ও ভক্তি—সব একাকার হয়ে যায়।

এই তাত্ত্বিক গভীরতারই বাস্তব ও নান্দনিক প্রকাশ ঘটে তাঁর সাহিত্যকর্মে। বিশেষত তৎকালীন বঙ্গসমাজে যখন ধর্মীয় সংকীর্ণতা ও জাতপাতের বিভাজন মানুষকে খণ্ডিত করে তুলছিল, তখন নজরুল আবির্ভূত হন এক অনন্য সমন্বয়বাদী দর্শনের রূপকার হিসেবে। তাঁর ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থ তাই নিছক কাব্য নয়; বরং তা মানুষের নির্মিত সব কৃত্রিম বিভাজনের বিরুদ্ধে এক উচ্চকিত, চূড়ান্ত ইশতেহার।

এই আলোচনার একটি অনিবার্য পরিণতি আছে, তা হলো বর্তমানের প্রেক্ষাপটে ফিরে আসা। ইতিহাসের কোনো মহান দর্শনই কেবল অতীতে সীমাবদ্ধ থাকে না; তার প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় বর্তমান প্রাসঙ্গিকতায়। সেই জায়গা থেকেই প্রশ্ন জাগে, আজকের পৃথিবীতে নজরুল কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন?

বর্তমান একবিংশ শতাব্দীর উত্তর-আধুনিক, পুঁজিগ্রস্ত ও সংবেদনশূন্য বাস্তবতায় মানুষ ক্রমশ নিজের অস্তিত্ব থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। প্রযুক্তিগত দাসত্ব চিন্তার স্বাধীনতাকে গ্রাস করছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যান্ত্রিকতায় মানুষের আত্মিক সত্তা হয়ে উঠছে সংকটাপন্ন। গভীর দর্শনের জায়গা দখল করে নিচ্ছে সস্তা চটকদারিতা।

এই প্রেক্ষাপটে নজরুলকে এক ‘জাতীয়’ উপাধির মোড়কে আবদ্ধ করে, কিছু আনুষ্ঠানিক আবৃত্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে, তাঁর বিপজ্জনক ও চিন্তাজাগানিয়া দর্শনকে কার্যত গৃহপালিত করে ফেলা হয়েছে। অথচ আজ এই যান্ত্রিক দাসত্বের যুগে, মানুষের আত্মাকে পুনরুজ্জীবিত করতে নজরুলের সেই আদিম ও আপসহীন দ্রোহের চেয়ে প্রাসঙ্গিক আর কিছুই হতে পারে না।

শিক্ষার্থী, সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, ফরিদপুর