‘কাকতাড়ুয়া বুধা’ বেশ সহজ–সরল, স্বাভাবিক জনজীবনের, প্রকৃতি জীবনের একটি চলচ্চিত্র হয়ে উঠতে পেরেছে।
গ্রামবাংলার চাষের মাঠে কাকতাড়ুয়া সাজিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখার বিষয়টিকে বাস্তবের সুন্দর একটি রূপক হিসেবে আমাদের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছেন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন। তাঁর ‘কাকতাড়ুয়া’ উপন্যাসে কিশোর বুধা অনুকরণ করে বাস্তবের কাকতাড়ুয়া সেজে দাঁড়িয়ে থাকতে ভালোবাসে। কাকতাড়ুয়া দেখে যেভাবে ফসলের মাঠের ক্ষতি করতে আসে না কোনো প্রাণী, দেশের মাটি আর মানুষকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখসমরে রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছে বুধা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সব বয়সের মানুষের অংশগ্রহণের পাশে কিশোরদের অবদানের কথা বিশেষভাবে তুলে ধরে এই উপন্যাস। আর এই উপন্যাসকে ‘কাকতাড়ুয়া বুধা’ নাম দিয়ে সুন্দর চলচ্চিত্রায়িত করেছেন ড. মো. হারনুর রশীদ।
মুক্তিযুদ্ধে কিশোরদের অবস্থান, অবদান নিয়ে এর আগেও ‘ছানা ও মুক্তিযুদ্ধ’, ‘আমার বন্ধু রাশেদ’ প্রভৃতি জনপ্রিয় চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ত্রিশ লাখ মানুষের প্রাণ, নারীর সম্মান এবং দেশ ছেড়ে যাওয়া উদ্বাস্তুদের কঠিন কঠোর যন্ত্রণা দিয়ে গড়া বাস্তবের ইতিহাস। এই ইতিহাসকে বলিউডের কাল্পনিক সিনেমার মতো প্রযুক্তি এবং বাস্তবিক কলাকৌশলের মাধ্যমে অতিরঞ্জিত করে দেখানোর বিরুদ্ধে আমি। সিনেমা দর্শকের মনোরঞ্জনের জন্য তৈরি হয়, কিন্তু বাস্তবের ইতিহাসকে চলচ্চিত্রে রূপ দিতে গেলে, ইতিহাসের যাতে বিচ্যুতি না ঘটে, পরিচালকদের তেমনি সমাজ এবং ইতিহাসমনস্ক হয়ে উঠতে হয়। আমাদের বাংলাদেশের সমাজজীবনে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এত সম্ভার রয়েছে, তা তুলে ধরতে পারলেই একটি খাঁটি দেশীয় চলচ্চিত্র নির্মিত হতে পারে। বৈদেশিক কোনো কাল্পনিক দৃশ্য অনুকরণের প্রয়োজনই পড়ে না। তা সত্ত্বেও বলতে হয়, বাংলাদেশের অনেক বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের মতো মুক্তিযুদ্ধের ওপরে নির্মিত কিছু চলচ্চিত্রেও ব্যবসায়িক কৌশল, অনুকরণীয় মনোরঞ্জনের দিক প্রাধান্য পেয়েছে। সেদিক থেকে ‘কাকতাড়ুয়া বুধা’ বেশ সহজ–সরল, স্বাভাবিক জনজীবনের, প্রকৃতি জীবনের একটি চলচ্চিত্র হয়ে উঠতে পেরেছে। প্রথমত, সেলিনা হোসেনের মতো সাহিত্যিকের রচনায় অতিরঞ্জনের জায়গা নেই; আর পরিচালক ড. মো. হারনুর রশীদও সুশিক্ষিত এবং গ্রামবাংলার জনজীবন থেকে উঠে আসা প্রকৃত এবং প্রাকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত একজন জনযোদ্ধা।
মা–বাবা, ভাই–বোনসহ পরিবারের সবাইকে বুধা কলেরা রোগে হারিয়েছে। সঠিক চিকিৎসার অভাবে এ ধরনের অসুখে একসময় গ্রামের পর গ্রাম আক্রান্ত হয়ে উজাড় হয়ে যেত। সময়কালের ইতিহাসকে এখানে কাহিনির ভেতরে তুলে আনা হয়েছে। পরিবারের সবাইকে হারানোর পর থেকে বুধার চোখ হঠাৎ হঠাৎ অদ্ভুত রকমের ভীষণ লাল হয়ে যায়। অধিক শোকে পাথর না হয়ে এই তরুণের দৃষ্টি যে রক্তচক্ষু হয়ে ওঠে এবং সেই রক্তচক্ষু শাসানি, শাসন-শোষণের কোনো লাল চোখকে ভয় পাবে না, এই ভাবনা অতীব সুন্দর। বুধার রক্তচক্ষুর মধ্যেই যে লুকিয়ে আছে বহু কষ্টার্জিত স্বাধীনতার, বিজয়ের লাল টকটকে সূর্য। আবার বুধার কল্পনার জগতের মধ্যেও রয়েছে বিস্তৃত চিন্তার ফসল। একটা শামুকের খোলসের মধ্যে সে ভাবতে পারে সৈনিকের মাথা ঢাকার শক্ত মজবুত সেই ঢাল, টুপি।
দরিদ্র চাচা–চাচির আট ভাই–বোনের সংসারে বুধা বেড়ে ওঠে। অস্ত্র হাতে যুদ্ধ না করেও এই বাংলাদেশে মানুষ মারা যায়, দরিদ্র মানুষের সেই জীবনযুদ্ধের নাম ক্ষুধা। পাকিস্তানি সরকারের আমলে গ্রামীণ মানুষের অর্থনৈতিক কী অবস্থা দাঁড়িয়েছিল, এই যাপন সংকট সেই দৃষ্টান্তও তুলে ধরে। বেঁচে থাকার তাড়নায় গ্রামীণ মানুষ এখানে শাপলার ডাঁটা সেদ্ধ করে খায়।
মিলিটারি ঢুকে গ্রামের বাড়িঘর, হাটবাজার জ্বালিয়ে দিতে থাকে। বাঁচার জন্য মানুষ বাপ–ঠাকুরদার ভিটে ছেড়ে চলে যেতে থাকে। বুধার সঙ্গে গ্রামের সব সম্প্রদায়ের মানুষের খুব ভাব। গ্রামের সহজ–সরল প্রতিটি ধর্মের মানুষ একে অন্যের সঙ্গে মিলেমিশে বাস করে, সেই জলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত উঠে আসে। হঠাৎ করে যুদ্ধ লেগে যাওয়া, মানুষের চলে যেতে থাকা বুধাকে পীড়িত করে। শেখ মুজিবের ভাষণের তাৎপর্য এখন সে অনুভব করতে পারে। তাই প্রতিজ্ঞা করে, সবাই চলে গেলেও সে কিছুতেই গ্রাম ছেড়ে যাবে না। সে যুদ্ধ করবে। মুক্তির জন্য লড়াই।
গ্রামের আলী আর মিঠু মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে যায়। বুধার সঙ্গে আলাপ হয় মুক্তিযোদ্ধা নেতা শাহাবুদ্দিনের। এই শাহাবুদ্দিন একজন শিল্পী। সুন্দর দেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে তুলি ধরা হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছে। অসংখ্য কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক যে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, শাহাবুদ্দিন তাঁদেরই প্রতিনিধি চরিত্র। শাহাবুদ্দিন বুধাকে চরবৃত্তির কাজ দেয়। পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে ঢুকে যাবতীয় খবর নিয়ে আসা। মুক্তিযুদ্ধের সময় কিশোরেরা বাস্তবেই এমনি চরবৃত্তির কাজ করত।
মিলিটারি ক্যাম্পে গিয়ে সৈন্যদের পেয়ারা খাইয়ে বুধা ভাব জমিয়ে ফেলে। কিন্তু গ্রামের রাজাকার চেয়ারম্যানের নজরে পড়ে তাকে শাস্তি পেতে হয়। মিলিটারি ক্যাম্পে বুধাকে বাঁশ দিয়ে কাকতাড়ুয়ার মতো করে বেঁধে রাখা হয়। বুধার কষ্ট হয়, কিন্তু কাকতাড়ুয়া হয়ে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকার কৌশল তার রপ্ত। এই দৃশ্য মানবতার কান্ডারি যিশুকে ক্রুশবিদ্ধ করার সেই ছবিকেও মনে করিয়ে দেয়।
সুন্দর এক টুকরা গ্রামীণ বাংলাদেশকে উপস্থাপন করে এই চলচ্চিত্র। তবে শৈল্পিক কারিগরি দিকগুলো আরও একটু ভালো হতে পারত। স্বল্প বাজেটের চলচ্চিত্রের অবশ্য সমস্যা রয়েছে অনেক। শিল্পনির্দেশক থেকে পরিচালক, অনেক কিছু করতে চেয়েও পেরে ওঠেন না। গ্রামীণ আসরে বাউলের কণ্ঠে গান, বাংলাকে ভালোবেসে কিশোরদের কণ্ঠে গান ভালো লাগে।
মুক্তিবাহিনীর হামলা থেকে মিলিটারিরা নিজেরা বাঁচার জন্য একটা বাংকার তৈরির পরিকল্পনা করে। শাহাবুদ্দিন বুধাকে বুঝিয়ে দেয়, বাংকার শব্দটি সহজ করে বলতে বলতে যা এসে দাঁড়ায়, তা হলো কবর। মিলিটারিরা নিজেই নিজেদের কবর তৈরি করছে। বুধাকে গ্রামের মাটি কাটার দায়িত্ব পাওয়া অন্যদের সঙ্গে সেখানে গিয়ে বাংকার তৈরির কাজ করতে হবে এবং শাহাবুদ্দিনের দেওয়া মাইন সেখানে পুঁতে রেখে আসতে হবে। কিশোর বুধা আপন কৌশলে সেই কাজে সফল হয়। বিস্ফোরণে মিলিটারি ক্যাম্প উড়ে যায়।
বুধা চরিত্রে সুস্ময় সরকার মুগ্ধ সত্যি মুগ্ধ করেছেন। চরিত্রটিকে তিনি নিজের মতো করে আত্তীকরণ করতে পেরেছেন। শাহাবুদ্দিন চরিত্রে সাজু খাদেম, চাচি চরিত্রে মনিরা মিঠু একেবারে যথাযথ চরিত্রায়ণ। সব কিশোরের অভিনয়, সংলাপ বলার ধরন ভালো লাগে। কিশোরদের বীরত্বগাথার এই চলচ্চিত্রে সব কিশোরই আসল নায়ক। ঋতুপর্ণ ঘোষ তাঁর ‘দহন’ চলচ্চিত্রে কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী সুচিত্রা মিত্রকে অভিনয়ে নিয়ে এসে চমকে দিয়েছিলেন। ‘কাকতাড়ুয়া বুধা’ চলচ্চিত্রে কোনো একটি চরিত্রে বা চরিত্রের বাইরে হলেও কোনো একটা চরিত্র সৃষ্টি করে কিংবদন্তি বর্ষীয়ান লেখক সেলিনা হোসেনকে রাজি করিয়ে কি নিয়ে আসতে পারতেন না? ধরা যাক, একটা দৃশ্যে অন্তত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কোনো একজন গ্রামীণ নেত্রী বা স্কুলশিক্ষিকা হিসেবে। বাংলাদেশের পরিচালকেরা সমাজের বিশিষ্টজনদের নিয়ে এভাবে ভেবে দেখতে পারেন।
হাওড়া, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত