একমুঠো উষ্ণতা হাতে
শহরের এই দিকটায় কুয়াশা যেন একটু বেশিই জেঁকে বসেছে। সোডিয়ামের হলুদ আলো কুয়াশার চাদরে আটকা পড়ে তৈরি করেছে এক অদ্ভুত ঘোলাটে আবছায়া। ঘড়িতে রাত মাত্র ১০টা, অথচ চারপাশ দেখে মনে হচ্ছে যেন গভীর রাত।
রাস্তার মোড়ে ভাপা পিঠার দোকানটায় আগুনের আভা আর ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে। পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছি সেদিকে তাকিয়ে। ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছে আট-নয় বছরের একটি ছেলে। পরনে ঢিলেঢালা জীর্ণ সোয়েটার, হাতাগুলো ওর শীর্ণ হাতের চেয়েও বেশ খানিকটা লম্বা। ছেলেটা আগুনের দিকে এমন মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে, যেন ওটা সাধারণ কোনো উনুন নয়, কোনো জাদুকরি লণ্ঠন।
পিঠাওয়ালা চাচা ভাপ ওঠা গরম পিঠাটা নামিয়ে নারকেল ছিটিয়ে ছেলেটার দিকে বাড়াতেই ও সেটা খপ করে হাতে নিল। টাকা দেওয়ার বালাই নেই, সম্ভবত দোকানেরই ফাইফরমাশ খাটা ছোকরা। কিন্তু পিঠাটা হাতে নিয়ে ও গপগপ করে খেলো না। দুই হাতের তালুর মধ্যে পিঠাটাকে পরম মমতায় আগলে ধরল। তারপর ধোঁয়া ওঠা সেই গরম পিঠাটা কপালে, গালে আলতো করে ছোঁয়াল।
অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। হাড় কাঁপানো শীতে জমে যাওয়া শরীরে ও আসলে ক্ষুধা মেটানোর আগেই একটু উষ্ণতা খুঁজছিল। ওর চোখ দুটো বোজা, ঠোঁটের কোণে একচিলতে প্রশান্তির হাসি। মনে হলো, এই তীব্র ঠান্ডার ভেতর ওইটুকু গরম পিঠাই ওর কাছে একমুঠো রোদ।
ছেলেটা পিঠায় কামড় বসাতেই গরম ভাপটুকু মিলিয়ে গেল বাতাসে। আমি আমার জ্যাকেটের চেইনটা গলা পর্যন্ত তুলে দিলাম। তবু বুকের ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা লাগল। মনে হলো, আমার এই দামি জ্যাকেটের কৃত্রিম উষ্ণতা ওই একটুকরা পিঠার ওমের কাছে বড্ড ম্লান, বড্ড তুচ্ছ। কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে শহরটা ঘুমাচ্ছে, শুধু একটি ছেলে জেগে আছে একমুঠো উষ্ণতা হাতে।
মিরপুর, ঢাকা-১২১৬