একটুকরা সোনালি রোদের প্রতীক্ষা
প্রকৃতিতে শীত আসে কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে, ঋতুর পালাবদলের ডালি সাজিয়ে। সঙ্গে নিয়ে আসে ধূলিধূসর এক মলিন সৌন্দর্য। উত্তুরে হাওয়ার ঝাঁজে পৃথিবীর চেহারা ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে; গাছপালাও জীর্ণশীর্ণ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে বসন্তের নরম ছোঁয়ার আশায়। শৈত্যপ্রবণ অঞ্চল থেকে অতিথি পাখিরা এসে ভিড় জমায় হাওর এলাকায়। গ্রামগঞ্জের খেজুর রসের মোহনীয় রেশ আর ব্যস্ত শহরের রাস্তার পাশে ধূমায়িত ভাপা পিঠার ধুম—প্রকৃতির অসহনীয় শীতও যেন হয়ে ওঠে আমেজে ভরপুর।
তখন শীত আর আমেজের দোলাচলে ঢাকা পড়ে যায় শীতার্ত প্রাণীর আর্তনাদ। শহর-নগরের শীত উদ্যাপন আর পরিপাটি মানুষের সভ্য পোশাকের ভিড়ে চাপা পড়ে ফুটপাতে নীরবে শুয়ে থাকা অবহেলিত মানুষ আর বোবা প্রাণীগুলো। অথচ তাদের অষ্টপ্রহরই কাটে কনকনে শীতে জবুথবু হয়ে, একটুকরা সোনালি রোদের প্রতীক্ষায়। অবলা মুখের শান্ত চোখে তারা চেয়ে থাকে পথচারীর শোভমান হাঁটাচলার দিকে; সুশ্রী পোশাকের লালসা তাদের চোখে নেই, বিত্তবৈভবও তাদের প্রত্যাশায় নেই। পথবাসী হিসেবে তাদের শৌখিনতার ঝুলিতে আছে কেবল ছেঁড়া কম্বলে মোড়া শীর্ণ দেহটা, যার অর্ধেকটাই পথচারীদের পায়ে পায়ে দলিত-বিদলিত হয় প্রতিনিয়ত।
ফুটপাতের সুবিধাবঞ্চিত মানুষ আর নগরের অবহেলিত বোবা প্রাণীগুলো শরীরের উষ্ণতা ভাগাভাগি করে ঢাকতে চায় শীতের প্রখরতা। নিরুপায় ভঙ্গিতে মন জানাজানি করে পথচারীদের যেন বলতে চায় দুঃসহ কষ্টের অব্যক্ত কথা। সে ভাষা করুণ—বুঝেও কেউ বোঝে না।
নিয়মমাফিক শীত আসে, শীত যায়; শীতের রিক্ততা শেষে নব নব স্বপ্ন নিয়ে বসন্ত আসে ধরায়। চারপাশ আবার মুখরিত হয় ফুলে-ফলে, রক্তরঙিন কুঞ্জে রঞ্জিত হয় মানুষের উৎফুল্ল মন। কিন্তু ফুটপাতে চোখ বুজে ঠান্ডা সহ্য করা প্রাণীগুলোর জীবনে বসন্ত ধরা দেয় না কোনো কালেই। আজীবন শীতের প্রখরতা বয়ে বেড়ায় তারা—একটুকরা সোনালি রোদের অপেক্ষায়।
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়