জলছবির ইতিবৃত্ত

ছবি: এআই/বন্ধুসভা

মধ্যবিত্ত জীবনটা এক অদ্ভুত জ্যামিতিক সমস্যা। এর কোণগুলো যতই মেলানোর চেষ্টা করা হোক না কেন, একটা বাহু সর্বদা ছোট পড়েই যায়। আর যদি কেউ হয় নিম্নমধ্যবিত্ত, তবে তার জীবনটা জ্যামিতি নয়, একেবারে গোলকধাঁধা। ঢাকা শহরের একচিলতে টিনশেড কলোনিতে বাস করা আজহার উদ্দীন সেই গোলকধাঁধার এক ক্লান্ত পথিক।

আজহারের বয়স ৫০ ছুঁই ছুঁই। সরকারি অফিসের পিয়ন পদে ইস্তফা দেওয়ার পর থেকে এখন পুরোদস্তুর ‘বেকার’ নামক একটি সম্মানজনক পদের অধিকারী। সংসারে স্ত্রী সায়মা ও বিবাহযোগ্য কন্যা রিমু। সায়মার মুখে অভিযোগ নেই, আছে কেবল একধরনের নীরব দীর্ঘশ্বাস, যা আজহারের বুকের পাঁজরে হাতুড়ির মতো ঘা দেয়।

দিনটা ছিল শ্রাবণের এক অঝোর বৃষ্টির দিন। আকাশটা যেন তার সব পুঞ্জীভূত অভিমান কালো মেঘের খামে মুড়িয়ে পৃথিবীর বুকে ঢেলে দিচ্ছে। আজহারের ঘরের চালের একটা ফুটো দিয়ে টুপ টুপ করে পানি পড়ছে। নিচে একটা পিতলের ঘটি বসানো। সেই টুপ টুপ শব্দে যে ছন্দ আছে, তা আজহারের কাছে মনে হলো মৃত্যুদূতের পদধ্বনি।

বড় বিপদটা এল দুপুরের দিকে। ঘটক খবর পাঠিয়েছে, রিমুর বিয়ের সম্বন্ধটা ভেঙে যাওয়ার উপক্রম। পাত্রপক্ষ সোজাসুজি জানিয়ে দিয়েছে, প্রতিশ্রুত ৫০ হাজার টাকা ও এক ভরি সোনার চেইন আজ সন্ধ্যার মধ্যে বুঝিয়ে না দিলে তারা আর এগোবে না। ৫০ হাজার টাকা! আজহারের কাছে এখন যা আছে, তা দিয়ে ৫০ টাকার এক প্যাকেট বিরিয়ানিও জুটবে না, আর ৫০ হাজার টাকা তো আকাশের চাঁদ।

আজহার ঘর থেকে বের হলো। উদ্দেশ্যহীন যাত্রা। পকেটে সায়মার শেষ সম্বল মায়ের দেওয়া এক জোড়া সোনার দুল। সায়মা যখন দুলজোড়া খুলে দিচ্ছিল, তখন তার চোখে যে জলটা টলমল করছিল, তা শ্রাবণের এই বৃষ্টির চেয়েও ভারী। আজহার বলেছিল, ‘চিন্তা কইরো না, আল্লাহ ভরসা।’ কিন্তু সে জানে, ভরসা জিনিসটা বড়লোকদের ড্রয়িংরুমেই শোভা পায়, গরিবের ঘরে ওটা বিলাসিতা।

তাঁতীবাজারের মোড়ে যখন সে পৌঁছাল, তখন সন্ধ্যা নামছে। বৃষ্টির তোড় বেড়েছে। সোনার দোকানের মালিক মোটা গদিতে বসা ননী গোপাল বাবু দুলজোড়া হাতে নিয়ে এমনভাবে পরখ করলেন, যেন কোনো বিষাক্ত সাপ দেখছেন। এক অবজ্ঞার হাসি হেসে বললেন, ‘আজহার মিঞা, এ তো পুরোনো আমলের খাদ মেশানো সোনা। এর দাম তো খুব একটা মিলবে না। বড়জোর ১৫ হাজার।’

আরও পড়ুন

আজহারের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। ১৫ হাজার! আর বাকি ৩৫? সে মিনতি করল, পায়ে ধরার উপক্রম করল। কিন্তু ব্যবসায়ীর হৃদয় আর কষ্টিপাথর—দুটিই সমান শক্ত। টাকাটা হাতে নিয়ে যখন সে রাস্তায় নামল, তখন সে এক পরাজিত সৈনিক। না পারল মেয়ের সুখ কিনতে, না পারল স্ত্রীর শেষ স্মৃতিটুকু রক্ষা করতে।

রাস্তায় তখন এক হাঁটু পানি। ল্যাম্পপোস্টের আলো পানিতে পড়ে এক অদ্ভুত আলো–আঁধারির সৃষ্টি করেছে। আজহার হাঁটছে। তার মনে হলো, এই যে জীবনযুদ্ধ, এ তো কুরুক্ষেত্রের চেয়েও ভয়ানক। সেখানে অর্জুন ছিল, কৃষ্ণ ছিল। আজহারের কে আছে?
হঠাৎ তার চোখ পড়ল রাস্তার পাশের এক চায়ের দোকানের টিভিতে। সেখানে খবরের চ্যানেলে দেখাচ্ছে, শেয়ারবাজারে ধস, কোটি কোটি টাকার কেলেঙ্কারি। আজহারের হাসি পেল। এক বিদ্রূপাত্মক হাসি। যারা কোটি টাকা মারে, তারা এসি রুমে বসে কফি খায়। আর সে মাত্র ৫০ হাজার টাকার জন্য নিজের কলিজাটা বিক্রি করে দিয়েও কূলকিনারা পায় না। বিধাতার এ কেমন বিচার!

পকেটের টাকাগুলো ভিজে চুপচুপে হয়ে গেছে। আজহার ভাবল, এই টাকা দিয়ে কী হবে? এ তো প্রয়োজনের তুলনায় কিছুই নয়। একটা পাগলাটে চিন্তা তার মাথায় এল। সে কি এই টাকা নদীতে ফেলে দেবে? নাকি লটারির টিকিট কিনবে? নাকি কোনো মসজিদে দান করে দেবে? হতাশা তাকে গ্রাস করল এক মূর্তমান শয়তানের মতো।
ঠিক তখনই মোবাইলে রিমুর ফোন। ‘বাবা, তুমি কই? মা খুব অসুস্থ, অজ্ঞান হয়ে গেছে। ডাক্তার ডাকতে হবে, তাড়াতাড়ি এসো।’

মুহূর্তের মধ্যে আজহারের সব দার্শনিক চিন্তা উবে গেল। মনে হলো, পৃথিবীটা দুলছে। মেয়ের বিয়ে, দেনা–পাওনা, অপমান—সব তুচ্ছ হয়ে গেল। এখন কেবল সায়মাকে বাঁচাতে হবে। যে মানুষটা সারা জীবন না খেয়েও তার পাতে মাছের বড় টুকরাটা তুলে দিয়েছে, তাকে হারালে আজহারের আর বাঁচার কী অর্থ?
আজহার পাগলের মতো দৌড়াতে শুরু করল। রিকশা নেই, সিএনজি নেই। বৃষ্টির ঝাপটায় চোখের জল আর বৃষ্টির পানি একাকার হয়ে গেল। ফার্মেসির দোকান থেকে ইনজেকশন ও ওষুধ কিনল ১৫ হাজার টাকার প্রায় পুরোটাই খরচ করে। যে টাকা ছিল মেয়ের ভবিষ্যতের, তা এখন স্ত্রীর বর্তমান বাঁচাতে খরচ হয়ে গেল।

বাড়ি ফিরে যখন আজহার ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ও ওষুধের প্যাকেট নিয়ে ঘরে ঢুকল, তখন রাত গভীর। সায়মার জ্ঞান ফিরেছে। টিমটিমে হারিকেনের আলোয় সায়মার মুখটা বড় ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। রিমু একপাশে বসে কাঁদছে।
আজহার ভেজা শরীরে স্ত্রীর শিয়রে বসল। সায়মা ফিসফিস করে বলল, ‘টাকা? দুল বেচা টাকা?’
আজহার ওষুধের প্যাকেটটা এগিয়ে দিল। কোনো কথা বলল না। সায়মা বুঝল। তার চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়া জলটা বালিশ ভিজিয়ে দিল।

বাইরে তখনো অঝোর ধারায় বৃষ্টি। আজহার উঠে জানালার পাশে দাঁড়াল। ঘুটঘুটে অন্ধকার। ঘটক হয়তো এতক্ষণে পাত্রপক্ষকে না করে দিয়েছে। মেয়ের বিয়েটা ভেঙে গেল। স্ত্রীর গয়নাটাও গেল। হাতে কানাকড়িও নেই। কাল সকালে কী হবে, কেউ জানে না।
তবু এই অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আজহারের মনে হলো, সায়মা তো বেঁচে আছে। মেয়েটা তো পাশে আছে। হেরে গিয়েও যেন সে পুরোপুরি হারেনি। নাকি এ–ও এক প্রবঞ্চনা?

বাতাসের ঝাপটায় হারিকেনটা দপ করে নিভে গেল। ঘরভর্তি অন্ধকার। রিমু দেশলাই খুঁজতে লাগল। আজহার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রইল স্থাণুর মতো। তার মনে হলো, জীবনটা এই নিভে যাওয়া আর জ্বলে ওঠার খেলা মাত্র। গল্পটা যেখানে শেষ হওয়ার কথা ছিল, সেখানে শেষ হলো না। কেবল একরাশ অনিশ্চয়তা আর বুকভরা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে নতুন এক ভোরের অপেক্ষায় ঝুলে রইল মহাকালের শূন্যে।

বৃষ্টির শব্দ তখনো থামেনি, ঠিক যেমন থামেনি আজহারের বুকের ভেতরের তোলপাড়।

সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, সিলেট