ডাকলেই আসব

অলংকরণ: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

পরশ,
অনেক দিন থেকেই ভাবছি তোকে লিখব। অনেকবার কলমটা হাতে নিয়েও নামিয়ে রাখতে হয়েছে। মাথার ভেতরে এমন এক কোলাহল চলছিল যে শব্দগুলো ঠিক লাইনে দাঁড়াতে চাইছিল না। কিছু কথা থাকে, যেগুলো বলার জন্য মুখ নয় বরং একটা নিঃশব্দ কোলাহল দরকার হয়। এখন সেই সময়টা পেলাম। তাই যেমন আসে, তেমনই লিখছি। একদম গুছিয়ে নয়।

তুই যেভাবে ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছিস, সেটা তোর সঙ্গে যায় না। আমি জানি, তুই চিৎকার করিস না, নাটক করিস না, নিজের কষ্টটাকে প্রদর্শনীতে তোলার মানুষও না। কিন্তু তার মানে এই নয় যে সব বোঝা একাই বইতে হবে। সবকিছু ভেতরে জমতে জমতে একসময় মানুষ নিজেই নিজের ভার হয়ে ওঠে। শরীর যেমন বিশ্রাম না পেলে ভেঙে পড়ে, মনও তেমন। মাঝেমধ্যে কাউকে পাশে বসিয়ে চুপ করে থাকাও দরকার—কথা না হোক, শুধু নিশ্বাসের শব্দটা ভাগ করা পরম শান্তি।

ভাবলে অবাক লাগে! আমরা যারা একসঙ্গে বড় হয়েছি, আড্ডা, স্বপ্ন, ঝগড়া, হাসি—সব ভাগ করে নিয়েছি। কেউই আসলে একা হওয়ার জন্য তৈরি ছিলাম না। তবু কী অদ্ভুতভাবে একা একা লড়াই জুটে যায়! চারপাশে লোক থাকে, ফোন বাজে, দেখা-সাক্ষাৎ হয়, তবু কোথাও একটা ফাঁক থেকে যায়। এই ফাঁকটাই সবচেয়ে ভয়ংকর জায়গা। এখানে বসেই মানুষ নিজের বিরুদ্ধে নিজের মামলা চালায়। উকিলও নিজে, বিচারকও নিজে। রায়টাও নিজেকেই দিতে হয়।

তোর ওপর আমার একটা চাপা রাগ আছে, সেটা লুকাচ্ছি না। লুকোনোর সুযোগ নেই। তুই নিজেকে খুব সহজে কাঠগড়ায় দাঁড় করাস। অন্যদের ভুল, সময়ের নিষ্ঠুরতা, পরিস্থিতির গোলমাল—এসব যেন তোর হিসাবে ঢোকে না। সব দোষ নিজের ঘাড়ে তুলে নিলেই ব্যাপারটা সৎ হয়ে যায় না, পরশ। এটা ন্যায্যও নয়। তুই এত সস্তা না যে সব দায় একাই বহন করতে হবে। নিজের প্রতি এই অবিচারটা তুই বন্ধ কর, এটা আমার অনুরোধ।

আরও পড়ুন

শিল্প, কাজ, স্বপ্ন—এই সব নিয়ে মানুষ যখন নিজের চারপাশে সিংহাসন বানাতে চায়, তখন বন্ধুত্ব অনেক সময় অদৃশ্য হয়ে যায়। অনেকেই ভাবে, লক্ষ্যটাই শেষ কথা, মানুষ বাদ গেলেও ক্ষতি নেই। আমি কোনো দিন সেটা বিশ্বাস করিনি। এখনো করছি না। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, মানুষটা ঠিক থাকলে কাজ আপনা আপনি নিজের জায়গা খুঁজে নেয়। উল্টোটা হলে যত উঁচু সাফল্যই আসুক, ভেতরে কোথাও একটা শূন্যতা থেকে যায়, যেটা কিছুতেই ভরে না। তুই জানিস, মানুষ বাদ পড়ে যায়, এমন কোনো খেলায় আমি কোনো দিন ছিলাম না।

আর একটা কথা পরিষ্কার করে বলি, সব মতভেদ যুদ্ধ নয়, আর সব নীরবতা পরাজয় নয়। কখনো কখনো সরে দাঁড়ানো মানেই পালানো নয়; সেটা নিজের সম্মান আর মানসিক সুস্থতার উপায়। তুই যে কিছু জায়গায় চুপ করে গেছিস, দূরে থেকেছিস, আমি তাতে তোকে দুর্বল ভাবি না। উল্টোটা। সব লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে নেই। কিছু লড়াই এড়িয়ে যাওয়ার মধ্যেই বুদ্ধি থাকে, পরিণতিও থাকে।

একটা সময় তুই লেখালেখি করতি। ফেক আইডি দিয়ে তুই একজন লেখক রোদ্দুরের সঙ্গে কথা বলতি। তোর ফেক আইডির নাম ছিল ‘শুভ্র’। শুভ্র আইডিটা তোর হবে, এটা কোনো দিন ভাবনায় ছিল না। একজন অচেনা শুভ্রর সঙ্গে কথা বলতে মন্দ লাগত না। তুই কি আবারও লেখালেখিতে ফিরেছিস?

নিজের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে লেখালেখি। আর নিজের সঙ্গে যোগাযোগ ফিরে পাওয়া মানেই কাঁটাতারের অনেকটা পথ পেরিয়ে আসা। কাউকে প্রমাণ করার দরকার নেই। লেখা যদি তোর ভেতরের চাপটা একটু কমায়, যদি দু–মুহূর্ত নিশ্বাস নিতে সাহায্য করে, তাতেই সার্থকতা।

একটা প্রস্তাব রাখি, চল একদিন কোথাও চলে যাই। খুব পরিকল্পনা করে নয়, খুব নাটক করে নয়, হঠাৎ। দু-তিন দিন। ফোন কম, কথা কম, হাঁটা বেশি। অনেক ভুল–বোঝাবুঝি কথায় কাটে না, নীরবতায় কাটে। পাশাপাশি বসে চা খাওয়া, রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া—এই সব ছোট জিনিস অনেক বড় বোঝা নামিয়ে রাখে। আমি থাকব। ডাকলেই আসব।

নিজেকে খুব একা ভাবিস না, পরশ। তুই যতটা ভাবছিস, তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ তোকে নিজের মতো করে বয়ে নিয়ে চলে—চুপচাপ, কোনো দাবি না রেখে।
লিখিস। তোর চিঠির অপেক্ষায় থাকব।
ভালো থাকিস।

তোরই…

সাংগঠনিক সম্পাদক, ঢাকা মহানগর বন্ধুসভা