ডাকঘর এবং একটি চিঠি

জীর্ণশীর্ণ মাটির ঘরটিতে স্বাধীনতার পর থেকে চলে গ্রামের পোস্ট অফিসের কার্যক্রম। মুঠোফোন আর ইন্টারনেটের যুগে মানুষ এখন আর চিঠি লেখে না, পথ চেয়ে থাকে না হলুদ খামের চিঠির বোঝা নিয়ে ছুটে চলা ব্যস্ত রানারের। ছবিটি ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলার ভবানীপুর ইউনিয়নের জয়পুর গ্রাম থেকে তোলা। প্রতীকীছবি: ইমতিয়াজ আহমেদ

তুমি আর কোনো চিঠি পাঠাও না বলে আজকাল মনে হয় সব ডাকঘর বন্ধ হয়ে গেছে। সেই ডাকঘর, যেখানে মানুষের প্রতীক্ষা জমে থাকত, সেখানে এখন কেবল ধুলো জমে থাকে। যেসব পিয়ন একসময় ভালোবাসা আর বেদনার খাম হাতে নিয়ে ঘর থেকে ঘরে ছুটত, তারাও এখন বেকার হয়ে গেছে। তোমার চিঠির অভাবে তাদের কাজই আর নেই।

তুমি হয়তো জানো না, তোমার একটি চিঠি কতটা শক্তি এনে দেয় আমাকে। তোমার একটি অক্ষর, একটি বাক্য যেন নতুন এক মানচিত্রের রং হয়ে আমার জীবনের বুকজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। তোমার প্রতিটি শব্দ আমার কাছে শুধু ওষুধ নয়, বরং এমন এক প্রতিষেধক, যা আমার ভেতরে জমে থাকা সব নিঃশব্দ যন্ত্রণা ধীরে ধীরে মুছে দেয়।

এখনো মনে করতে পারি, শেষবার তোমার চিঠি যখন এল, তখন দাঁড়িয়ে ছিলাম এক অপরাহ্নের হাওয়ায়, কবরের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে। চোখে ভেসে উঠছিল জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে ঝুলে থাকা এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তা। চিঠির প্রতিটি শব্দকে কেমন যেন ভীষণ আপন লেগেছিল। মনে হচ্ছিল যেন এসব শব্দ আমি আগেও শুনেছি। তবু ইচ্ছে করেই লেখককে চিনতে চাইনি। আমি জানতাম, একবার চিনে নিলে আমার ভেতরে গড়ে তোলা সব প্রতিরোধ ভেঙে যাবে, আর আমি আবারও হারিয়ে যাব তোমার ভালোবাসার অবিচ্ছেদ্য মায়াজালে।

কিন্তু প্রিয়, চিঠিরও তো একটা নিজস্ব সময় থাকে। সময়মতো আসা চিঠি মানুষের ভেতরে আলো জ্বালিয়ে দেয়, নতুন করে বাঁচতে শেখায়। অথচ যে চিঠি অসময়ে এসে পৌঁছায়, তা কেবল ভেজা কাগজের মতো বুকের কোণে পড়ে থাকে। তার ভাঁজে জমে থাকে অভিমান, অপূর্ণ প্রতীক্ষা আর নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস।