একনাগাড়ে বলে থামল বাঁধন। অন্তিকার চোখ জোড়ায় জলতরঙ্গ দৃশ্যমান, যেন বারিধারা বইবে আরেকটু হলেই।
সমুদ্রসৈকতের এদিকটায় জনসমাগম নেই। সন্ধ্যার সুরভি বাতাসে বাঁধনের নিগূঢ় অনুভব আরও ঘনীভূত হচ্ছে। পশ্চিম আকাশের গোধূলি আবিরে ঢেউগুলো যেন বেদনার রং হয়ে আছড়ে পড়ছে বালুকাময় তীরে।
অন্তিকা থুতনিতে হাত রেখে একটানা বাক্য ব্যয় করে যাচ্ছে। স্বল্পভাষী বাঁধনের উদাসীনতা তখনো কাটেনি। অন্তিকার ছড়িয়ে থাকা আনাড়ি আঁচলে তার ভ্রুক্ষেপ নেই। সাজগোজও যেন আর চোখে পড়ছে না। এমনকি শত জনমের অপরিচিত কারও মতো দূরত্ব বজায় রেখে কথা বলছে। হঠাৎ এমন পরিবর্তনে অন্তিকা ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায়। ইদানীং অন্তিকাকে আর আগের মতো বিরক্ত করে না বাঁধন। গত চার মাসে সে যেন ভিন্ন মানুষ বনে গেছে। এত সংযমী ভাব এসেছে যেন বিঘত মেপে কথা বলছে। বিকেলের শুরু থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাদের মধ্যে কেবল দু–চারটি বাক্যবিনিময় হয়েছে।
ঘোর কাটতেই সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে বাঁধন মৃদুগলায় বলল, ‘আচ্ছা অন্তিকা, মানুষ কি একা পথ পাড়ি দিতে পারে না?’
প্রশ্নটা পুরোপুরি না বুঝলেও অন্তিকা উত্তর দিল, ‘না, জীবনের পথ ধরে এগিয়ে যাওয়া এত সহজ নয়।’
—কিন্তু কেউ যদি দুঃসাহস করে, তবে...?
অন্তিকা একটু ভেবে জবাব দিল, ‘হুমম… ব্যতিক্রম অবশ্য থাকতে পারে।’
বিষোদগারিত কণ্ঠে বাঁধন বলে উঠল, ‘আমি ব্যতিক্রম হতে চাই; এত দিন গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়েছি, অথচ কোনো কূল–কিনারা পাইনি। সম্মুখের বিস্তীর্ণ পথ ভুলে ভরা ভাবনাকে সঙ্গে নিয়েই হেঁটেছি।’
বাঁধনের ঝাঁজালো স্বর শুনে অন্তিকার ঠোঁটের কোণে ঝুলে থাকা নরম হাসিটা ঝট করে মিলিয়ে গেল। সে শান্তভাবে বলল, ‘বাঁধন, আমরা ঘুরতে এসেছি। এখানে তর্কের কী দরকার? একবার আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলো তো কথাগুলো।’
অন্তিকা সুকৌশলে পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করলেও বাঁধন তখনো অনড় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সমুদ্রের ঢেউয়ের দিকে।
ঢেউয়ের মতো তরঙ্গোচ্ছ্বাসিত কণ্ঠে বলে ওঠে, ‘যখন মানুষ বুঝতে পারে যে ভুল পথে চলে এসেছে, তখন সে নোঙর ফেলা নৌকার মতো থমকে দাঁড়ায়, বুঝলে? আমি চার বছরে অনেক পথ পাড়ি দিয়েছি। যদিও আমার পূর্বের পথে ফেরা কঠিন হবে, তবু ফিরতে হবে। কারণ, আমি জেনে গেছি, এ পথ আমার নয়।’
অন্তিকা একটু চাপা গলায় বলল, ‘আচ্ছা বাঁধন, ঝগড়া করতে কি তোমার বেশি ভালো লাগে? গত কয়েক মাসে আমার কানের ভালোই বিশ্রাম হয়েছিল। আবারও চাকহারা মৌমাছির মতো ভনভন করছ কেন?’
বাঁধন কিছুটা গম্ভীর স্বরে বলল, ‘আমার অনাবশ্যক কথা তোমার কানে সইবে কেন? প্রতিনিয়ত যে কান রোমান্টিক কথা শুনছে, সে কান কেমন করে গিলবে এসব কথা? তাই আমিও ভেবেছি, একেবারে চুপ হয়ে যাব।’
অন্তিকা হালকা বিরক্তির সুরে বলল, ‘তুমি একাই বলে যাচ্ছ সব। এতক্ষণে অনেক বেশি বলে ফেলেছ। তোমার এমন অশ্রাব্য কথাগুলো কার ভালো লাগবে, বলো?’
বাঁধন বলে উঠল, ‘কারও ভালো লাগুক, সেটা আমিও চাই না। শ্রাব্য-অশ্রাব্য কথাকে ছুটি দিলাম, এবার মুখরোচক কথা শুনতে পারবে। আমি শুধু শুধু দুর্ভেদ্য প্রাচীরের মতো ছিলাম তোমার আর রাতুলের মাঝখানে।’
মুখ ফসকে যেন বলে ফেলল বাঁধন। অন্তিকা রাগে তেতে ওঠে এবং অগ্নিবর্ষণ চোখে জবাব দেয়, ‘তাহলে তুমি অপমান করার জন্য ডেকে এনেছ আমাকে? আর যদি একটা বাক্যও ব্যয় করো, খবর হবে কিন্তু!’
বাঁধন পুরো শরীর দমকিয়ে বাঁকা হাসির ঝিলিক দিল একবার। এতে অবজ্ঞা আর অবহেলার অঙ্গভঙ্গি আঁচ করতে পারে অন্তিকা। সে শেষবারের মতো চুপসে যায়। এতক্ষণ ঠিক বুঝতে পারেনি যে বাঁধন গম্ভীরভাবে কথাগুলো বলছে। এ যে অন্যদিনের মতো খুনসুটি নয়, বুঝতে পেরে অন্তিকা প্রাসঙ্গিক হতে চাইল।
বাঁধন আরেকটু সরে এসে পাশ ঘেঁষে বসেছে। ‘শোনো, আমাদের পরিচয়ের শুরুর দিকে আমি রাতুলের সম্পর্কে কিছুটা জানতাম। তবে ওর বিষয়ে কথা বলতে চাইলে তুমি তেতে উঠতে। আমি আর কিছু বলতাম না; বশ করা সাপের মতো অবশ হয়ে পড়তাম। যেটা তোমার পছন্দ না, সেটা নিজের অপছন্দের তালিকাভুক্ত করলাম। আনুকূল্য পেয়ে তোমার দিকে ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করলাম...।’
অদূরে তাকিয়ে কী যেন ভাবল সে, তারপর বলে চলল, ‘রাতুল তোমার প্রথম প্রেমিক ছিল এবং সে বিয়ে করে নিয়েছে অন্য কাউকে। তোমার বিপন্ন অবস্থায় এগিয়ে এলাম, শক্ত করে হাত ধরলাম। হৃদয়ের সর্বময় শক্তি দিয়ে তোমার ক্ষতপড়া হৃদয়ে আমার উষ্ণ হৃদয়ের উত্তাপ ছড়িয়ে দিলাম গভীর মমতায়। তবু তোমার হৃদয়ের ক্ষত শুকাতে পারিনি। রাতুলের ঘর আছে, সংসার আছে, একটা বাচ্চার কথাও নিশ্চয়ই তোমার অজানা নয়। তবু সে সময় পেলেই ছুটে আসে তোমার কাছে; তুমিও তাকে নিরাশ করোনি কোনো দিন।’
অন্তিকা চকিত চোখে অপরাধী কণ্ঠে বলল, ‘রাতুলের সঙ্গে আমার আর কোনো যোগাযোগ নেই।’
বাঁধনের চোখমুখ নিশপিশ করছে। তবু শান্ত গলায় জবাব দিল, ‘আমি সব জানি। এ বিষয়ে তোমার কাছে কিছুই জানতে চাচ্ছি না, জানার ইচ্ছাও নেই। রাতুলের কলিগ নিশান আমার আবাল্যের বন্ধু, ওরা একসঙ্গে চাকরি করছে বছর দেড়েক ধরে। রাতুলের অফিস থেকে শুরু করে সপ্তাহান্তের আড্ডা পর্যন্ত গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে নিশান। তোমার কাছে জানতে চাইলে মিথ্যা দিয়ে ভরে ফেলতে আমার সন্দেহের ঝাঁপি। তবু দিন শেষে বরফখণ্ডের মতো গলে গিয়ে শীতল জল হতাম তোমার অনঘ চেহারার দিকে তাকিয়ে।’
একটু থেমে বিব্রত গলায় আবার শুরু করল বাঁধন, ‘ভেবেছিলাম, মহাকালের অনন্ত যাত্রায় সঙ্গে পাব তোমাকে। তবে বিশেষ কিছু মুহূর্তে যাত্রাপথের পথিক হিসেবে পেয়েছিলাম। এটাকে কি নিজের মতো করে পাওয়া বলে? তুমি বসে থাকো আমার পাশে; মন পড়ে থাকে রাতুলে। ক্ষণিক হাসো, কথা বলো, আবার আনমনা হও, হারিয়ে যাও সেই দৈন্যমুখর দিনে।’
বাঁধনকে থামিয়ে দিয়ে অন্তিকা অন্যমনস্ক হয়ে বলল, ‘তোমার প্রতি আমার ভক্তি ও ভালোবাসার কোনো কমতি রাখিনি। যথাসম্ভব দেখা করেছি, তোমার কাছে লিখেছি আমার সব আকুল অনুভূতি, তবু তুমি...’
বাঁধন কথা কেড়ে নিল, শান্ত অথচ অদ্ভুত গলায় উত্তর দিল, ‘আমার কাছে লেখো তুমি কালো কালি–কলম দিয়ে, জাগতিক নিয়মে। সে ভাষা কর্কশ; থাকে অন্যজনের সঙ্গে তুলনা, ছলনা আর বাহানা। রাতুলকে লেখো হৃৎকালি দিয়ে, তোমার সারা অবয়ব যেন ওর জন্য অদৃশ্য ব্লটিং পেপার। এত দিনে আমি বুঝলাম, রাতুল নামের হাতুড়ি–ছেনি তোমার হৃৎপাথরে নিবিড়ভাবে খোদাই করেছে; যা আমার আলতো প্রলেপে মুছে যাবে না। আমি যেন রাতুলের কার্বন কপি; ভালোবাসার মূল দাগটা ওর কাছে থেকে যাচ্ছে আর আমার কাছে আসছে ম্রিয়মাণ ছাপ। এতে ভালোবাসা ও অনুরাগ আছে কি না, ঠাহর করে দেখতে হয়।’
একনাগাড়ে বলে থামল বাঁধন। অন্তিকার চোখ জোড়ায় জলতরঙ্গ দৃশ্যমান, যেন বারিধারা বইবে আরেকটু হলেই।
—রাতুল আমার প্রথম প্রেমিক ছিল, সেটা তো তুমি...
অন্তিকাকে থামিয়ে দিয়ে বাঁধন বলল, ‘সেটা নাহয় মানলাম। কিন্তু সে তোমাকে বিয়ে করেনি কেন, জানো তুমি?’
নিশ্চলভাবে চঞ্চল চোখে উত্তর দিল অন্তিকা, ‘ওর পরিবারের জোরাজুরিতে মা–বাবার পছন্দের মেয়েকে না করতে পারেনি। আমি জানি, রাতুল এখনো আমাকে ভালোবাসে।’
উপহাসের সুরে বাঁধন বলে উঠল, ‘অন্তিকা, মিথ্যা সুখের কল্পনা কেবল দুঃখই বাড়ায়। তুমি বিষাদসিন্ধুতে ভাসবে, কূল–কিনারা পাবে না। তোমার এপার নেই, ওপারও নেই। দিশাহারা মাঝিকে বাঁচতে হলে কোনো এক তীরকে লক্ষ্য করে এগোতে হয়। কতক এ তীর আর কতক ও তীরে নৌযান চালালে পথভ্রষ্ট তো হবেই, বরং দোটানার করালগ্রাসে পড়বে।
‘গত এক বছরে তোমাকে বিয়ের বিষয়ে অনেকবার বলেছি, রাজি হওনি তুমি। মাসখানেক আগেও রাতুলের সঙ্গে তোমাকে দেখেছি বহুবার। যখনই জানতে চেয়েছি, ভিন্নভাবে কথার বাঁক ফিরিয়ে নিয়েছ। যাহোক, তুমি বুদ্ধিমতী, কোনো কিছুই তোমার অজানা নয়। জীবন থেকে শুরু করে যৌবনের উত্তুঙ্গ ঢেউগুলোও জানা। কেবল তোমার কাছে আমিই অজানা।’
অন্তিকা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সম্পর্কের সমাপ্তিরেখা টেনে দিল বাঁধন। অন্তিকা কিছু বলতে চেয়েও পারল না। নিশ্চুপে না বলা কথা গিলে ফেলল দৃঢ় সংযমে।
অন্তিকা নির্নিমেষ চোখে নির্বাক হয়ে শুনছে। এখানে নারীত্বের সহজাত রূপ তর্কের জোরে জেতার সুযোগ রইল না আর। কয়েক মুহূর্ত চুপ হয়ে রইল দুজন। বাঁধন উন্মনা হয়ে মিহি সুরে বলে উঠল, ‘তোমাকে ডেকেছি সৌজন্য সাক্ষাতের জন্য। এতক্ষণ বলতেই ভুলে গেছিলাম লতার কথা। লতা আমার হবু স্ত্রী। মায়ের পছন্দের মেয়ে, শুনেছি বেশ লক্ষ্মী। যদিও ওর সঙ্গে আমার প্রেম ছিল না। কিন্তু ওকে আমি পুরোদমে ভালোবাসতে শুরু করেছি। কিছু কেনাকাটা বাকি ছিল বলে ও আজ আসবে দেখা করতে; হয়তো এতক্ষণে শপিং মলে আমার অপেক্ষায় আছে।
‘চারদিকে গাঢ় অন্ধকার হয়েছে, অন্তিকা। এবার উঠতে হবে আমাদের। ওহ্ হ্যাঁ, এই হলো কার্ড, তোমার নিমন্ত্রণপত্র। বিয়েতে আসবে কিন্তু। অপেক্ষায় থাকব।’
অন্তিকা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সম্পর্কের সমাপ্তিরেখা টেনে দিল বাঁধন। অন্তিকা কিছু বলতে চেয়েও পারল না। নিশ্চুপে না বলা কথা গিলে ফেলল দৃঢ় সংযমে। বাঁধনের কথামালা শুনতে শুনতে অন্তিকার চোখের পাতকুয়া বেয়ে দুফোঁটা জল নিঃশব্দে নেমে গেল নিচের দিকে। বাঁধন তার অনুপম হাতের সুরভিছোঁয়ায় মুছে দিল না; আশ্বস্ত করার সুরে বাহুডোরেও টেনে নিল না। কেবল অন্তিকার সামনে থেকে ধীরে মুছে যেতে লাগল চিরতরে। তখনো অন্তিকার উত্তাপ ছড়ানো সর্বাবয়ব আচ্ছন্ন হয়ে আছে রাতুলের স্মৃতিকাতরতায়।
শূন্যে দাঁড়িয়ে থাকা অন্তিকার সঙ্গে শরৎসন্ধ্যার কোমল হাওয়া সমুদ্রের বুক ছুঁয়ে তীরে উঠে আসছে। নিমজ্জমান সূর্যের গোধূলি আবিরে প্রকৃতি যেন দুঃখবিলাসের ডালা সাজিয়েছে ম্লান আলোর হাতছানিতে।
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়