দূরে কোথাও হয়তো প্রতিমা তুলসীগাছের তলায় প্রদীপ জ্বালছে। সেই আলো ভেসে আসছে রাতুলের হৃদয়ে।
নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ের কথা।
পদ্মা নদীর পাড়ে নিরিবিলি একটি গ্রাম। পাখির কূজন আর গাছের ছায়ায় নির্মল প্রকৃতি। গ্রামের মাঝ দিয়ে আঁকাবাঁকা একটি কাঁচা রাস্তা জেলা শহর পর্যন্ত চলে গেছে। সহজ–সরল মানুষের জীবনাচার। বিনোদন বলতে বিকেলবেলা গ্রামের মাঠে জড়ো হয়ে খেলাধুলা করা। শীতকালে যাত্রা–নাটকের উৎসব। টেলিভিশন তখনো খুব একটা পৌঁছায়নি। তবে ঘরে ঘরে রেডিও ছিল। রেডিওতে বেজে উঠত—
‘বেদের মেয়ে জোছনা আমায়...’
এ গ্রামেরই দুই তরুণ-তরুণী, রাতুল আর প্রতিমা। ধনী ঘরের সন্তান। রাতুল শহরের কলেজে পড়ে, প্রতিমা গ্রামের হাইস্কুলে। ছোটবেলা থেকেই তাদের বন্ধুত্ব। একসঙ্গে বই পড়া, কবিতা আবৃত্তি করা, পুকুরঘাটে বসা, চাঁদ দেখা। এসবের মধ্য দিয়েই তাদের জীবন কেটে যাচ্ছিল।
একদিন বিকেলে প্রতিমা বলল—
‘রাতুলদা, আমাদের গ্রামে একটা পাঠাগার করলে কেমন হয়? ছেলেমেয়েরা বই পড়তে পারবে। সাহিত্যচর্চা করতে পারবে। এদের মধ্য থেকে ভবিষ্যতে হয়তো নতুন করে কেউ একজন সরদার জয়েনউদ্দীন বা আবদুল গণি হাজারীর মতো সাহিত্যিক হয়ে উঠবে। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা এঁদেরকে আদর্শ মেনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা পাবে। তাঁরাও তো ছিলেন এ গ্রামেরই সন্তান। এ গ্রামেই তাঁরা বড় হয়েছেন।’
রাতুল হেসে বলল, ‘হ্যাঁ, ভালো উদ্যোগ। তুমি শুরু করো। আমি আছি তোমার সঙ্গে।’
দুই.
দুজন মিলে শুরু করল ‘আলো পাঠাগার’ নামের ছোট্ট একটি বইঘর। বটগাছের নিচে বাঁশের দেয়াল, টিনের ছাউনি, মাটির মেঝে। দেয়ালে রং দিয়ে লেখা—
‘বইয়ের আলোয় জেগে উঠুক গ্রাম।’
গ্রামের ছেলেমেয়েরা প্রতিদিন আসে। কেউ গল্প পড়ে, কেউ কবিতা পড়ে। কেউ আবার লেখে। ছেলেমেয়েদের নিয়ে প্রতিমা পাঠচক্রের আয়োজন করে। মাঝেমধ্যে কুইজ প্রতিযোগিতা হয়। কুইজ প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের হাতে সাধারণত সরদার জয়েনউদ্দীন বা আবদুল গণি হাজারীর লেখা বই তুলে দেওয়া হয়। আবার শীতকালে আয়োজন করা হয় মঞ্চনাটকের।
রাতুল কলেজ থেকে ফিরলে পাঠাগারে বসে নিজের লেখা গল্প পড়ে শোনায়। প্রতিমা এগিয়ে এসে বলে, ‘তুমি একদিন অনেক বড় লেখক হবা রাতুলদা। এই পাঠাগারই হবে তোমার শুরু।’
তিন.
সেবার তারা মঞ্চস্থ করল নাটক ‘মানুষের মুখ’। নায়কের চরিত্রে অভিনয় করল রাতুল আর নায়িকা চরিত্রে প্রতিমা।
রিহার্সালের সময় দুজনের চোখমুখে অদ্ভুত এক সম্পর্ক জন্ম নেয়, যেটা তারা নিজেরাও বুঝতে পারে না। নাটকের সংলাপে প্রতিমা বলে, ‘মানুষের ধর্ম মানুষ হওয়া উচিত।’
তার এই সংলাপ বলার ভঙ্গি দেখে দর্শক নীরব হয়ে যায়।
নাটক শেষে দর্শকের হাততালি দেখে বোঝা যায়, নাটক তাদের পছন্দ হয়েছে।
কিন্তু গ্রামের কিছু মানুষ এটাকে ভালো চোখে দেখে না। ছেলেমেয়ে এক হয়ে এসব নাটক-যাত্রা করা ঠিক না—এসব বলে ফিসফাস শুরু করে দেয়।
চার.
প্রতিমার বাবা হরিপদবাবু এলাকার প্রভাবশালী একজন ব্যবসায়ী। তিনি এসব ফিসফাস শুনে প্রতিমার ওপর রেগে গিয়ে বলেন, ‘তুই আর ওই ছেলেটার সঙ্গে মিশবি না। স্কুলেও যেতে পারবি না।’
প্রতিমা কেঁদে ফেলে। খবর পেয়ে রাতুল হরিপদবাবুর দরজায় গিয়ে বলে, ‘আমরা কেবল গ্রামের জন্য কাজ করছি, কাকাবাবু। অন্য কিছু না।’
হরিপদবাবু ঠান্ডা মাথায় বুঝিয়ে দেন, ‘ভালো। গ্রামের জন্য কাজ করো। তবে আমার মেয়ের জীবন নিয়ে নয়।’
এর পর থেকে প্রতিমার পাঠাগারে আসা বন্ধ হয়ে যায়। রাতুল মন খারাপ করে শহরের কলেজ হোস্টেলে চলে যায়। তাদের মধ্যে যোগাযোগের দূরত্ব তৈরি হয়। মনের মধ্যে অদৃশ্য এক বাঁধন গেঁথে রয়। চিঠিপত্র আদান–প্রদান চলে।
পাঁচ.
রাতুল কলেজ হোস্টেলে থাকলেও মন পড়ে থাকে গাঁয়ে। প্রতিমার একরকম গৃহবন্দী অবস্থা। কেউই মনের মধ্যে স্বস্তি পায় না।
এর মধ্যেই প্রতিমার বিয়ের কথাবার্তা চলতে থাকে। প্রথম প্রথম সে এর তীব্র বিরোধিতা করে। কিন্তু পরিবারের অব্যাহত চাপে সেও একসময় ক্লান্ত হয়ে যায়। এভাবে মাস গড়িয়ে বছর আসে। একদিন খবর পাওয়া যায়— প্রতিমার বিয়ে ঠিক হয়েছে।
পদ্মা নদীর ওপারে এক ব্যবসায়ী পরিবারে।
শুনে রাতুল স্তব্ধ হয়ে পড়ে।
গ্রামজুড়ে আলো জ্বলে, ঢাকঢোল বাজে। কিন্তু প্রতিমার মুখে হাসি নেই। বিয়ের আগের রাতে সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে চাঁদ দেখে। তার মনে বারবার উঁকি দেয় পাঠাগারের দিনগুলোর কথা। মনে মনে সে স্বগতোক্তি করে—এই আলো হয়তো এবার অন্য আকাশে জ্বলবে।
বিয়ের দিন রাতুল শহরে বসে ছিল, হাতে খাতা-কলম। অথচ একটা শব্দও বের হলো না।
ছয়.
বিয়ের পর প্রতিমা শ্বশুরবাড়ি চলে গেল। স্বামী ব্যবসায়িক কাজে ব্যস্ত, সংসারে যান্ত্রিকতা। সুখ বলতে যা বোঝায়, তার ছিটেফোঁটাও সেখানে ছিল না।
প্রতিমা সন্ধ্যাবেলা উঠানে তুলসীগাছের তলে প্রদীপ জ্বালে। মুখে নীরব প্রার্থনা করে—
‘যে আমার জীবনে আলো জ্বেলেছিল, সে যেন সুখেই থাকে।’
সে যখন একা থাকে তখন পুরোনো চিঠিগুলো বের করে পড়ে। রাতুলের হাতের লেখা দেখে নিঃশব্দে বলে, ‘তুমি এখনো লেখো, তাই না?’
সাত.
একদিন হঠাৎ গ্রামের বাজারে গিয়ে রাতুল শুনতে পেল, পাশের গ্রাম হাসামপুরে মেলা হচ্ছে, সেখানে প্রতিমা তার স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে এসেছে।
দূর থেকে রাতুল দেখল—প্রতিমা এখন অন্য ঘরের ঘরনি। শাড়ি-সিঁদুরে আবৃত, তবে চোখে কেন জানি আবেগের স্নিগ্ধতা নেই।
দুজনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য মিলল।
মুখে কোনো কথা নেই, কিন্তু চোখে ছিল উপচে পড়া কথার ভিড়।
সেদিন সন্ধ্যায় প্রতিমার স্বামী কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল, ‘খেয়াল করলাম তোমাদের গ্রামের কেউ একজন মেলার মধ্যে তোমাকে খেয়াল করছে।’
প্রতিমা চুপ করে রইল। শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, ‘হয়তো ভুলে খেয়াল করেছে।’
রাতের অন্ধকারে সে চুপিচুপি তুলসীগাছের নিচে গিয়ে হাত জোড় করে প্রণাম করল—
‘তুমি ভালো থেকো, রাতুলদা...তোমার আলো যেন নিভে না যায়।’
আট.
সময়ের নিয়মে সময় বয়ে যায়।
রাতুল এখন প্রতিষ্ঠিত লেখক। তার গল্পে বারবার ফিরে আসে একটা মুখ—যে পাঠাগার বানাতে চেয়েছিল, নাটকে অভিনয় করেছিল, শেষে একদিন চুপিচুপি চলে গিয়েছিল অন্যের ঘরে।
প্রতিমা পত্রপত্রিকায় রাতুলের লেখা পড়ে। কাঁপা কাঁপা হাতে সেগুলোকে বুকে চেপে ধরে।
রাতে একা হলে বলে, ‘তুমি লিখে যাচ্ছ, তাই আমি এখনো বেঁচে আছি।’
নয়.
আলো পাঠাগারের বার্ষিক অনুষ্ঠানে রাতুল গ্রামে গেল। পাঠাগারের দেয়ালে এখনো ঝুলছে পুরোনো সাইনবোর্ড, প্রতিমার হাতের লেখা স্পষ্ট—‘বইয়ের আলোয় জেগে উঠুক গ্রাম।’
অনুষ্ঠান শেষে কেউ একজন বলল, ‘দিদি জানতে চেয়েছে, আপনি গ্রামে কয় দিন থাকবেন।’
রাতুল বোঝে—প্রতিমা।
সেই রাতে সে বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে চাঁদের দিকে তাকায়।
চোখে জল, ঠোঁটে করুণ হাসি।
সে ফিসফিস করে বলে, ‘প্রতিমা, তোমার আলো এখনো নিভে যায়নি। আমি লিখি। কারণ, তুমি একদিন বলেছিলে—তুমি লিখে যেয়ো।’
দূরে কোথাও হয়তো প্রতিমা তুলসীগাছের তলায় প্রদীপ জ্বালছে। সেই আলো ভেসে আসছে রাতুলের হৃদয়ে।