কিছু বই পড়া শেষ হয় শেষ পৃষ্ঠায়, কিছু বইয়ের শেষ পৃষ্ঠা পেরিয়েও পাঠকের ভেতরে সেগুলোর যাত্রা চলতে থাকে। কাজী লাবণ্যের ‘আরুশি ও একটি মিছরিদানা আংটি’ তেমনই একটি গল্প সংকলন। ১৬টি গল্পের এই ছোট্ট বইটি আয়তনে খুব বড় নয়; কিন্তু এর গল্পগুলোর আবেগ ও অনুরণন বেশ দীর্ঘ। একটানা পড়ে যাওয়ার মতো বই হয়েও বইটি আসলে একটানা পড়ে ফেলার নয়। একটি গল্প শেষ করার পর খানিকটা থামতে হয়, চরিত্রগুলোর দিকে ফিরে তাকাতে হয়, কখনো নিজের দিকেও। বেশ দীর্ঘ সময় নিয়েই একেক দিন একেকটি গল্প পড়া হলো।
লেখক যদি সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের নানা বাস্তবতা থেকে গল্প তুলে এনে পাঠকের মনে বিষণ্নতার একটি দীর্ঘস্থায়ী আবহ তৈরি করতে চেয়ে থাকেন, তবে বলতে হয়—সেই প্রচেষ্টায় সফল কাজী লাবণ্য। তবে এই বিষণ্নতা নিছক মন খারাপের নয়। কোথাও তা করুণ, কোথাও অস্বস্তিকর, কোথাও প্রশ্নবিদ্ধ, আবার কোথাও গভীর মানবিক মমতায় ভেজা। অনেকটা শরৎচন্দ্রের গল্পের মতো—যেখানে মানুষের ব্যক্তিগত দুঃখ কখনো কেবল ব্যক্তিগত থাকে না; তার সঙ্গে সমাজ, সম্পর্ক ও সময়ের একটি বৃহত্তর বাস্তবতা জড়িয়ে যায়। তবে কাজী লাবণ্যের গল্পের স্বর স্বতন্ত্র। তিনি বৃহৎ সামাজিক বক্তব্যের চেয়ে ছোট ছোট মানবিক মুহূর্তের ভেতর দিয়েই পাঠককে বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করান।
‘নুরবানু ও একটি সূর্যাস্ত’ গল্প দিয়ে বইটির শুরু। কক্সবাজারের প্রেক্ষাপট ও স্থানীয় জীবনের আবহ গল্পটিকে নিজস্ব স্বাদ দিয়েছে। আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহারও সেই আবহ নির্মাণেরই অংশ। ব্যক্তিগত পাঠ-রুচির জায়গা থেকে মনে হয়েছে, ভাষার আঞ্চলিক টানটি অন্যভাবে বিন্যস্ত হলে হয়তো গল্পটির সঙ্গে সংযোগ আরও সহজ হতো। তবে এটি একান্তই পাঠকের অনুভব। গল্পটির সামগ্রিক আবহ বা উদ্দেশ্যকে তা ছাপিয়ে যায়নি।
এরপরের গল্পগুলোতে যেন বইটি ক্রমশ নিজের শক্তি আবিষ্কার করে। ‘চার্লির বোন’-এ দুই বোনের জীবনের সঙ্গে একটি বিদেশি কুকুরের অদ্ভুত সম্পর্ক এবং একটি দুর্ঘটনা গল্পের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ‘আবলুশ হাহাকার’ মৃত্যুর পরের এক কৌতূহলোদ্দীপক অস্তিত্বের দরজা খুলে দেয়—মৃত মানুষ কি আপনজনদের প্রতিক্রিয়া দেখতে পারে? ‘অপেক্ষার দৈর্ঘ্য’ দীর্ঘ ৩০ বছরের অপেক্ষাকে সামনে এনে প্রশ্ন তোলে—একজন ফিরে এলে কি অপেক্ষার অবসান ঘটে, নাকি নতুন করে অন্যদের ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়? ‘ঘুড্ডি’তে প্রবাসী সন্তানের জন্য অপেক্ষারত মায়ের নিঃসঙ্গতা যেন খুব পরিচিত এক বেদনা।
‘ফানুশ’, ‘সোনামুখী সুঁই’, ‘মুল্লুকখাওয়া’ ও ‘নটেগাছ’—প্রতিটি গল্পেই সম্পর্ক, অভাব, নৈতিকতা ও পারিবারিক বাস্তবতার ভিন্ন মুখ দেখা যায়। বিশেষ করে ‘মুল্লুকখাওয়া’য় ক্ষুধা কীভাবে মানুষের নৈতিক বোধকে সংকটের মুখে ঠেলে দিতে পারে, তা তীব্রভাবে উঠে এসেছে। চরিত্রটির প্রতি পাঠক হিসেবে আমার অনুভূতি একেবারে সরল সহানুভূতিতে থিতু হয়নি; ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও হয়তো সেই পাঠকে প্রভাবিত করেছে। তবু চরিত্রটির অবস্থান ও তার নির্মাণ পাঠককে ভাবায়—আর সেটিই গল্পের সার্থকতার একটি জায়গা।
‘নেপথ্যে’, ‘অজুফা’ ও ‘পোর্ট কী’ বইটির আবেগঘন কেন্দ্রের দিকে নিয়ে যায়। ‘অজুফা’র আগুন কেবল ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয় না, পাঠকের ভেতরেও একধরনের অসহায়তা জ্বালিয়ে যায়। ‘পোর্ট কী’ এসে সেই বেদনাকে আরও ঘনীভূত করে। ‘শেকড়’-এ মৃত্যুপথযাত্রী বাবার একটি সত্য রেহানের পরিচিত পৃথিবীকেই বদলে দেয়। আর ‘নয়নতারা’ যেন এত বিষণ্নতার ভেতর হঠাৎ একটু আলো—নয়নতারা ও মামুদের জন্য পাঠকের মনও স্বতঃস্ফূর্তভাবে শুভকামনা জানায়।
সবচেয়ে ভালো লেগেছে নামগল্পটি—‘আরুশি ও একটি মিছরিদানা আংটি’। দুই নিঃসঙ্গ মানুষের পরিচয় হয় বিমানে, নিজেদের সন্তানদের কাছে কানাডা যাওয়ার পথে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দুজন মানুষ যেন আবার ভালোবাসা, সঙ্গ ও আশ্রয়ের সম্ভাবনা খুঁজে পায়। অথচ গল্পের শেষে বাস্তবতা আর কল্পনার সীমারেখাটি এমনভাবে অস্পষ্ট হয়ে যায় যে প্রশ্ন জাগে—এ কি সত্যিই ঘটেছিল, নাকি নিঃসঙ্গ হৃদয়ের এক সুন্দর হ্যালুসিনেশন?
সব মিলিয়ে, ‘আরুশি ও একটি মিছরিদানা আংটি’ এমন বই নয়, যা পড়ে উঠে হালকা লাগে। বরং শেষ পৃষ্ঠাটি পড়ার পর কিছুক্ষণ চুপ করে থাকতে ইচ্ছা করে। লেখিকার বিষয় নির্বাচনের তীক্ষ্ণতা, মানুষের ভেতরের অপ্রকাশিত বেদনার প্রতি দৃষ্টি এবং জীবনের ছোট ছোট গল্পকে বড় অনুভূতিতে পরিণত করার ক্ষমতা বইটির প্রধান শক্তি। দ্রুত পড়ে শেষ করলে হয়তো গল্পগুলো জানা হবে; কিন্তু সেগুলোর ভেতরের কথাগুলো অনুভব করা হবে না। কারণ, এ বইয়ের গল্পগুলো শেষ হয়—তাদের রেশ শেষ হয় না।
রাজারহাট, কুড়িগ্রাম