চলচ্চিত্র আলোচনা
ছাত্ররাজনীতির নির্মম বাস্তবতার এক রূপক চিত্র ‘দ্য ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল’
‘দ্য ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল’ নামটি প্রথম শুনেই মনে হয়েছিল, হয়তো ছবিটি পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী চানখাঁরপুল এলাকা, তার ইতিহাস কিংবা সেখানকার কৃতী মানুষদের নিয়ে নির্মিত। এমনকি মনে ভেসে উঠেছিল আজম খানের সেই বিখ্যাত গান—‘চানখাঁরপুলে প্যাডেল মেরে পৌঁছে বাড়ি...’। কিন্তু কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই ছবিটি দেখতে বসে ধীরে ধীরে উপলব্ধি হলো, এটি আসলে একটি ভিন্ন বাস্তবতার গল্প। জুলাই ২০২৪-এর পূর্ববর্তী সময়ের ছাত্ররাজনীতির নির্মম, অন্ধকার ও ব্যঙ্গাত্মক প্রতিচ্ছবি।
নামকরণ
ছবিটি কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যঙ্গচিত্র নয়; বরং দেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একসময়কার ছাত্ররাজনীতির সামগ্রিক বাস্তবতাকেই প্রতীকীভাবে তুলে ধরেছে। ক্ষমতা, লোভ, অর্থ, সহিংসতা ও ব্যক্তিসত্তার বিলুপ্তি—সব মিলিয়ে শিক্ষাবিমুখ ছাত্ররাজনীতির এক নগ্ন উপস্থাপনাই যেন ‘দ্য ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল’।
তবে ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে, ছবিটির নাম ‘ভাই’ কিংবা ‘ইউনিভার্সিটি অব ভাই’ হলেও খুব একটা অযৌক্তিক হতো না। পুরো ছবিতে ‘ভাই’ শব্দটি সম্ভবত হাজারের বেশিবার উচ্চারিত হয়েছে। প্রায় প্রতিটি সংলাপের শুরু বা শেষে এই সম্বোধন ব্যবহৃত হয়েছে। এর ফলেই দর্শক কোনো চরিত্রকে তার নিজস্ব নামে মনে রাখে না; বরং সবাই এক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়—‘ভাই’। এই একটি শব্দই ক্ষমতার কাঠামো, আনুগত্য, পরিচয়হীনতা ও ছাত্ররাজনীতির সাংগঠনিক সংস্কৃতিকে অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে প্রতীকায়িত করেছে।
নির্মাণে পরিচালকের দৃষ্টিভঙ্গি
ছবিটি মূলত একটি নির্দিষ্ট সময়, নির্দিষ্ট প্রজন্ম এবং নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সংস্কৃতির গল্প বলেছে। সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এটি দেখিয়েছে কীভাবে ছাত্রাবাসের একটি আবদ্ধ পরিবেশ মানুষের স্বাধীন চিন্তাশক্তিকেও বন্দী করে ফেলে। শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, শিক্ষকেরাও যেন সেই ক্ষমতার বলয়ের বাইরে দাঁড়াতে পারেন না। ফলে শিক্ষকের সামনেই ছাত্ররা ক্ষমতা প্রদর্শন করে।
চরিত্রগুলোর নৈতিক অবক্ষয় পরিচালক অত্যন্ত নির্দয়ভাবে তুলে ধরেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণেই মাদক গ্রহণ, চাঁদাবাজি কিংবা অসামাজিক কর্মকাণ্ড তাদের কাছে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে; বিবেকের কোনো বাধা যেন আর কাজ করে না।
ছবিটির সবচেয়ে বড় কোর কম্পিটেন্সি বা সেলিং পয়েন্ট হলো একটি ঘোড়ার উপস্থিতি। প্রথম দিকে এর উপস্থিতি কিছুটা আকস্মিক মনে হলেও পরবর্তী সময়ে এটি ক্ষমতার প্রতীক, পরিবর্তনের পূর্বাভাস এবং ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার এক শক্তিশালী রূপক হিসেবে কাজ করেছে। একটি সাধারণ ছাত্ররাজনীতির গল্পকে এই প্রতীকী উপস্থাপনাই আলাদা মাত্রা দিয়েছে। দর্শকের কৌতূহল, বিনোদন ও ভাবনার জায়গা—সবকিছুকে এই ঘোড়া নতুন অর্থ দিয়েছে।
পরিচালক আকাশ তাঁর নির্মাণে বেশ কিছু সূক্ষ্ম ও বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যেমন পুরো একটি প্রজন্মের মানসিকতা বোঝাতে মাত্র একজন ছাত্রকে ফজরের নামাজ পড়তে দেখানো হয়েছে, যা নিছক দৃশ্য নয়—একটি প্রতীক। ছবিতে কোথাও শ্রেণিকক্ষ, লাইব্রেরি, পাঠদান কিংবা শিক্ষা কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থাই অদৃশ্য হয়ে গেছে; দৃশ্যমান হয়েছে কেবল ক্ষমতার রাজনীতি। সমসাময়িক সময়ের ভাষা ও সংলাপ ব্যবহারে পরিচালক কোনো কার্পণ্য করেননি। তবে ‘মদ’ শব্দটির ব্যবহার কিছুটা সরলীকৃত মনে হয়েছে। বাস্তবে বিভিন্ন ছাত্রগোষ্ঠী বা বিশেষ মহলে এই শব্দের প্রচলিত বিকল্প নাম রয়েছে, যা ব্যবহার করলে বাস্তবতার মাত্রা আরও বাড়তে পারত।
টেকনিক্যাল বিশ্লেষণ
চিত্রগ্রহণে প্রাকৃতিক আলো ব্যবহারের সিদ্ধান্তটি প্রশংসার দাবিদার। দিনের দৃশ্যগুলো অত্যন্ত প্রাণবন্ত এবং ভোরের দৃশ্যগুলো নান্দনিকভাবে আরও বেশি আকর্ষণীয়। তুলনামূলকভাবে রাতের দৃশ্যগুলো কিছুটা দুর্বল মনে হয়েছে।
ছবিতে নারী চরিত্রের উপস্থিতি প্রায় নেই বললেই চলে। প্রচলিত অর্থে কোনো নায়িকাও নেই। যদিও এটি সচেতন নির্মাণ-সিদ্ধান্ত হতে পারে, তবু সাধারণ দর্শকের জন্য এটি ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা তৈরি করে।
আবহসংগীত আরও পরিমিত ও ভারসাম্যপূর্ণ হতে পারত। র্যাপসংগীতের ব্যবহার আবারও নির্দিষ্ট প্রজন্মের রুচিকেই সামনে নিয়ে এসেছে। কিছু জায়গায় শব্দের ওঠানামা অপ্রয়োজনীয় মনে হলেও কয়েকটি দৃশ্যে সাউন্ড ডিজাইন ছিল অসাধারণ। বিশেষ করে কৃষকের ছেলেটি চড় খাওয়ার পর তার কানে যে দীর্ঘস্থায়ী ‘ঝিঁঝিঁ’ ধরনের শব্দ শোনা যায়, সেই একই অনুভূতি দর্শকের মধ্যেও সৃষ্টি করতে পরিচালক সফল হয়েছেন। এটি ছবির অন্যতম স্মরণীয় সাউন্ড ডিজাইন।
ছবিটি কার বা কাদের জন্য
এই ছবিতে প্রচলিত অর্থে কোনো নায়ক-নায়িকা নেই, নেই রোমান্টিক উপকাহিনি কিংবা সর্বজনীন বিনোদনের উপাদান। এটি মূলত একটি নির্দিষ্ট সময়ের ছাত্ররাজনীতি এবং তার সামাজিক অভিঘাত নিয়ে নির্মিত।
তাই প্রশ্ন থেকেই যায়—এই ছবি কি সাধারণ দর্শককে প্রেক্ষাগৃহে টানতে পারবে? এটি কি মূলত চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের জন্য, নাকি বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের জন্য? বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী, শ্রমজীবী মানুষ কিংবা প্রবীণ দর্শক—তাঁরা এ ছবিতে নিজেদের কতটা খুঁজে পাবেন? ছবিটি আসলে কাদের উদ্দেশে বার্তা দিচ্ছে—রাজনীতিবিদদের, শিক্ষার্থীদের, নাকি অভিভাবকদের? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর হয়তো প্রত্যেক দর্শক নিজ নিজ অবস্থান থেকে খুঁজে নেবেন।
সব প্রশ্নের উত্তর হয়তো এই ছবি দেয় না। কিন্তু প্রশ্ন তুলতে বাধ্য করে—আর সেখানেই এর সার্থকতা।
‘দ্য ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল’ নিছক একটি ছাত্ররাজনীতির চলচ্চিত্র নয়; এটি ক্ষমতা, আনুগত্য, নৈতিক অবক্ষয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংকট নিয়ে নির্মিত এক সাহসী সামাজিক দলিল।
সমসাময়িক বাংলা চলচ্চিত্রে এটি নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রমধর্মী সংযোজন। আত্মসমালোচনা, আত্মোপলব্ধি এবং আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবতাকে নতুন করে ভাবার জন্য ছবিটি সবারই দেখা উচিত।
উপদেষ্টা, প্রথম আলো বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদ, এবং সহযোগী অধ্যাপক, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি