সম্পর্কের অদৃশ্যে সুতো ও জীবনের ‘লাইফলাইন’

‘লাইফলাইন’–এর প্রধান দুই চরিত্রে অভিনয় করেছেন রেজওয়ান পারভেজ ও বিদ্যা সিনহা মিম। কোলাজ

গল্পের ভিড়ে যখন অপরাধ, অ্যাকশন আর রহস্যের তীব্রতা চরমে, ঠিক তখনই একপশলা বৃষ্টির মতো স্বস্তি নিয়ে হাজির হয় মানবিক অনুভূতির গল্প। কাজী আসাদের নির্দেশনায় চরকির নতুন ওয়েব ফিল্ম ‘লাইফলাইন’ ঠিক তেমনই এক কাজের উদাহরণ। থ্রিলারের যুগে দাঁড়িয়ে জীবনের গভীর দায়বদ্ধতা, প্রগাঢ় ভালোবাসা আর অকৃত্রিম স্নেহের গল্প বোনার এক সাহসী প্রয়াস এই সিনেমা। জীবন যখন সংকটে পড়ে, তখন আত্মজনদের বাঁচাতে মানুষ কতটা পথ পাড়ি দিতে পারে—সেই চিরন্তন প্রশ্নেরই এক আবেগঘন রূপায়ণ এখানে ফুটে উঠেছে।

জীবন কিংবা সম্পর্কের এই গভীর টান যেন রবীন্দ্র-ভাবনারই প্রতিধ্বনি—
‘আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে,
তাই হেরি তায়ে সকল খানে।’

গল্পের শুরুতেই অনন্যাকে (বিদ্যা সিনহা মিম) আমরা দেখি এক নিঃসঙ্গ চরে পা রাখতে। মেঠোপথ, নদীর হাওয়া আর স্থানীয় বাইকচালকদের কোলাহল পার হয়ে সে ছুটতে চায় এক দুর্গম গন্তব্যে—‘জোঁকের চর’। এই অচেনা জায়গায় পৌঁছানো মোটেও সহজ নয়। অনেক দ্বিধা পেরিয়ে টাকার বিনিময়ে বাইকচালক কোরবান (রেজওয়ান পারভেজ) তাকে নিয়ে পা বাড়ায় সেই রহস্যময় চরের দিকে। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর চেয়েও কঠিন হয়ে দাঁড়ায় জনৈক আক্কাস আলীকে (আ খ ম হাসান) খুঁজে বের করা।

কে এই আক্কাস আলী? কেনই-বা এত আকুলতা তাকে খোঁজার পেছনে? গল্প এগোয় একরাশ নীরব প্রশ্ন সঙ্গে নিয়ে। কবি জীবনানন্দ দাশের ভাষায় যেন—
‘সব পাখি ঘরে ফেরে— সব নদী— এ জীবনের সব লেনদেন ফুরোয়;
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।’
অনন্যার এই যাত্রাও যেন অন্ধকারের মধ্য থেকে আলো আর আপনজনকে খুঁজে নেওয়ারই এক ক্লান্তিহীন সংকল্প।

সিনেমার প্রথমার্ধ বেশ কিছুটা ধীরগতির। পরিচালক কাজী আসাদ কোনো কৃত্রিম নাটকীয়তা বা অতি-উত্তেজনা দিয়ে দর্শককে বিভ্রান্ত করতে চাননি। তিনি সময় নিয়েছেন গল্পটিকে নিজের গতিতে মেলাতে। শহুরে যান্ত্রিকতার বাইরে মফস্‌সল ও গ্রামবাংলার যে সজীব রূপ তিনি তুলে ধরেছেন, তা এককথায় মন জুড়িয়ে দেয়।

চিত্রগ্রাহক ড্যানিয়েল হাওলাদারের ক্যামেরায় নদী, নির্জন চর আর সোনালি সূর্যমুখী বাগানের বুকের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলা বাইকের দৃশ্য যেন একেকটি জলরং ছবি। প্রকৃতির এই বিশালতা গল্পের চরিত্রের ভেতরের নীরব হাহাকারকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। সিনেমার দ্বিতীয়ার্ধে এসে রহস্য আর আবেগের জট খুলতে শুরু করলে গল্প গতি পায়।

আরও পড়ুন
কাজী আসাদ পরিচালিত চরকি অরিজিনাল ফিল্ম “লাইফলাইন”।’

রুপালি পর্দায় অভিনয় ও চরিত্রায়ণ
• বিদ্যা সিনহা মিম (অনন্যা): চেনা গ্ল্যামারাস রূপ ছেড়ে একেবারে সাধারণ মধ্যবিত্ত মেয়ের চরিত্রে মিম এখানে দারুণ পরিণত। অনন্যার ভেতরের উদ্বেগ, আকুলতা ও হতাশা তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন অত্যন্ত সাবলীলভাবে।
• আ খ ম হাসান (আক্কাস আলী): কৌতুক অভিনয়ের গণ্ডি পেরিয়ে এক নিঃসহায় বাবার চরিত্রে আ খ ম হাসানের রূপান্তর এক বড় চমক। স্বল্প সময়ের উপস্থিতিতেই তিনি দর্শকের হৃদয়ে আলোড়ন তুলেছেন।
• অন্যান্য চরিত্র: অনন্যার বাবার ভূমিকায় খায়রুল আলম সবুজ ছিলেন অনবদ্য। যদিও পর্দায় তাঁকে আরও কিছুটা সময় দিলে সম্পর্কের গভীরতা আরও জমাট বাঁধত। গাইড হিসেবে বাইকচালক কোরবান চরিত্রে রেজওয়ান পারভেজ চমৎকার। পাশাপাশি শিশুশিল্পী আনিসা নুর আয়াত ও খল চরিত্রে গাজী রাকায়েত গল্পের বুননকে মজবুত করেছেন।

‘লাইফলাইন’-এর অন্যতম শক্তি এর পরিমিত আবহ সংগীত। দেবাশীষ দাসের কণ্ঠে ‘খুঁজতে খুঁজতে’ এবং ঐশীর গাওয়া ‘আমারে নাও’—গান দুটি কাহিনির মেজাজের সঙ্গে যেন মিশে একাকার হয়ে গেছে।

লাইফলাইন আমাদের বার্তা দেয়, নিজের জীবনের চেয়ে প্রিয়জনের জন্য কিছু করতে পারাটাই জীবনের বড় সার্থকতা।

বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা