মায়া

অলংকরণ: তুলি

কুট কুট করে কাঠবিড়ালি ডাকার শব্দ। দোয়েল পাখি লেজ নাচিয়ে শিস দিচ্ছে। সাতসকালে পাখির কলরব শোনার মজাই আলাদা। উঠানে কাদামাটি দিয়ে বানানো হাঁড়িপাতিল, বালু, গাছের পাতা দিয়ে মনের আনন্দে খেলছে নিশু। রান্নাও করছে চুলা বানিয়ে, এ যেন এক হেঁশেলঘর।

নিশুরা পাঁচ ভাইবোন। তার বাবা কাঠুরিয়া। রোজ সকালে পাহাড়ে যান, কাঠ কেটে এনে বাজারে বিক্রি করে চাল-ডাল কিনে নিয়ে যান। কাঠ না পেলে মাঝেমধ্যে পাহাড় থেকে পেয়ারা, লেবু, কলা, জাম্বুরা কিনে এনে বিক্রি করেন।
একদিন পাহাড়ে কাঠ কাটতে গেলে নিশুর বাবার পিছু নেয় হাতির পাল। দৌড়ে পালাতে গিয়ে পাহাড়ের পাদদেশে পড়ে পঙ্গু হয়ে যান। সেদিন থেকে নিশুর বাবা বাবুল মিয়া আর কখনো পাহাড়ে যাননি। বাবুল মিয়া তাঁর স্ত্রীকে বলেন, ‘পাহাড়ে হাতিরা আছে বলে বন রক্ষা হচ্ছে। আমি তো পাহাড় থেকে রাতের অন্ধকারে কাঠ কেটে নিয়ে আসি। চোরাই কাঠ বাজারে বিক্রি করে সংসার চালাই। গাছ কথা বলতে জানলে আমার বিরুদ্ধে মামলা দিত। নিজেকে বড় অপরাধী মনে হয়। গাছপালা, পাহাড় সব আল্লাহর দান। পঙ্গু হয়ে শুধু খারাপ হয়নি, ভালো হয়েছে, গাছপালা অন্তত রক্ষা পেয়েছে।’

নিশু ক্লাস ওয়ানে পড়ছে। বাবুল মিয়ার পরিবারে রাজ্যের অভাব-অনটন। একমুঠো ভাতও জোটে না।  নিশু ছেঁড়া জামা, খালি পায়ে স্কুলে যায়। ক্লাস টিচার নাজমা আপা তাকে খুব মায়া করেন।
নাজমা টিচার টিফিনের ছুটিতে নিশুকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘কী রে, তোর কী হয়েছে। মন খারাপ কেন?’ নিশু বলে, ‘আপা, পেটব্যথা। দুদিন ধরে কিছুই খাইনি।’
নিশুকে তার শিক্ষক মাথায় হাত বুলিয়ে কেক–বিস্কুট কিনে দিলেন।

নিশু লেখাপড়ায় ভালো। একদিন শিক্ষক নাজমা শিশু জরিপের কাজে তাদের বাড়িতে যান। বাড়িতে গিয়ে দেখেন, নিশুরা পাহাড়ের পাদদেশে ঝুপড়ি ঘরে থাকে; ওরা ঢের জাতিগোষ্ঠীর মানুষ। ওদের পূর্বপুরুষেরা একসময় ব্রিটিশদের চা–বাগানে কাজ করত। নিশুর আসল বাবা–মায়ের নাম জানা যায়নি। তবে সে চা–শ্রমিকের মেয়ে ছিল। ওর বয়স যখন এক বছর, মা–বাবা তাকে চা–বাগানে ফেলে মিয়ানমারের মংডু শহরে চলে যান।
‘আমাদের যখন বাচ্চাকাচ্চা হচ্ছিল না, তখন এক চা–শ্রমিকের কাছ থেকে নিশুকে দত্তক নিই। পরে আমাদের সন্তান হয়’— জানায় তার বর্তমান মা। নিশুর জীবনের গল্প শুনে শিক্ষক নাজমার মায়া হয়। নিশু শিক্ষকের জন্য গাছ থেকে পেয়ারা পেড়ে আনে। তার মা ইশারায় শিক্ষককে বলেন, নিশু যে পালক মেয়ে, সেটা যাতে সে না জানে। শাড়ির আঁচলে মুখ মুছতে মুছতে বলেন, ‘আপা, আমরা খুব গরিব। নিশু লেখাপড়া করতে চায়। ওর বাবা তাকে বিক্রি করে দিতে চেয়েছিল, আমি না করেছি। নিশু বলেছে, আপনি নাকি খুব মায়া করেন। মেয়েটা সকালে কটা জল-মুড়ি খেয়ে তিন মাইল পথ হেঁটে স্কুলে যায়।’

একসময় শিক্ষক নাজমা নিশুকে তার পালক বাবা-মায়ের কাছ থেকে দত্তক নেন। নিষ্পেষিত পরিবারের মেয়েকে দত্তক নেওয়ার বিষয়টি নাজমার শ্বশুরবাড়ির লোকজন ভালোভাবে মেনে নেননি। পরিবারের অশান্তি শুরু হলে নিশুকে শিক্ষক তাঁর বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। নাজমার মা নূর আক্তার স্কুলের প্রধান শিক্ষক। নিশুকে পেয়ে তিনি খুব খুশি হলেন। নিজের মেয়ের মতো করে আদর-স্নেহ মায়া দিয়ে লালনপালন করতে লাগলেন। নতুন স্কুলেও ভর্তি করে দিলেন, জামাকাপড়ও কিনে দিলেন। নিশু পড়ালেখার পাশাপাশি নূর আক্তারের হেঁশেলে টুকুটাকি কাজ করে। একসময় সে প্রাথমিক পাঠ শেষ করে।

পূজার ছুটিতে নূর আক্তারের মেজ মেয়ে বৃষ্টি গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে আসেন। বৃষ্টি আহমেদ কলেজের প্রভাষক। তিনি তাঁর মাকে বলেন, ‘মা আমি শ্বশুরবাড়িতে কাব্যকে নিয়ে একা থাকি। কলেজে গেলে কাব্য একা থাকে। নিশুকে খুব পছন্দ হয়েছে। প্লিজ মা, ওকে আমাকে দিয়ে দেন।’
বৃষ্টি নিশুকে তাঁর শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য বায়না ধরেন। মেয়ের আবদার বলে কথা, নূর আক্তার রাজি হলেন। শর্ত দিলেন—নিজের মেয়ের মতো করে দেখতে হবে এবং উপযুক্ত বয়স হলে বিয়ে দিতে হবে।
বৃষ্টি তাঁর স্বামী মাহিরকে এ ব্যাপারে জানালে তিনিও রাজি হয়ে যান। নিশুকে মাহির সাহেবের বাড়িতে এনে বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হলো।

নিশু কাব্যকে দেখাশোনা করে, একসঙ্গে স্কুলে যায়, বাড়ির ছাদাবাগানে পানি দেয়, লাভ বার্ড ও কবুতরকে খাবার দেয়, এটা–সেটা করে। মাহিরের বাড়ির সবাই তাকে ছোট বোনের মতো মায়া করে। বৃষ্টিদের ‘মায়ের বাগান’ পরিবারের সদস্য হয়ে গেল নিশু।
মায়ের বাগানে ফুল গাছে প্রজাপতি, ফড়িং, ভোমড়া খেলা করে। নিশু কাব্যকে নিয়ে সে খেলা আনমনে উপভোগ করে।

মায়ের বাগানের দেবদারুবৃক্ষের মতো নিশু একসময় বড় হয়। এখন সে তরুণী। বৃষ্টি ও মাহির নিশুর জন্য পাত্র দেখা শুরু করেন। একদিন নিশু বৃষ্টিকে জানায়, নেত্রকোনার নয়ন নামের এক ছেলেকে সে পছন্দ করে। মুঠোফোনে ওদের পরিচয়। বৃষ্টি বিষয়টি মাহিরকে বললে মাহির প্রথমে রাজি হননি। পরে রাজি হন।
নয়ন খুব পরিশ্রমী, কম্পিউটার মেরামত করে। সপরিবার চট্টগ্রামের হালিশহরে থাকে।

আরও পড়ুন

একদিন মাহির ও বৃষ্টি দম্পতি নিশুর জন্য মহা ধুমধাম করে বিয়ের আয়োজন করলেন। নাজমা নিশুর জন্য সোনার কানের দুল উপহার দেন। নূর আক্তার নিশুর হেঁশেলঘরের ঘরকন্নার জিনিসপত্র কিনে দেন। ১২ রবিউল আউয়াল নয়ন-নিশুর বিয়ের দিন ধার্য হয়।
বিয়ের দিন নিশুকে নয়নের হাতে তুলে দেওয়ার সময় মাহির বলেন, ‘আমাদের ছোট বোন, বড় আদুরে, কখনো কষ্ট দিও না ভাই। ওর মনের যত্ন নিও। ওকে আমরা দুধে-ভাতে বড় করেছি। দেবে আর নেবে, মিলাবে আর মিলবে, যাবে না কভু ছেড়ে দুজন দুজনা থেকে অনন্তকাল।’
মাহির ও বৃষ্টিকে জড়িয়ে নিশু কাঁদতে থাকে—‘ভাইয়া-আপু, আমি তোমাদের ছেড়ে কীভাবে থাকব শ্বশুরবাড়িতে।’
মাহির বৃষ্টিকে বলেন, ‘দেখো, মানুষের সম্পর্ক আবেগের। রক্তের সম্পর্ক না হয়েও মাঝেমধ্যে মানুষ রক্তের চেয়েও বেশি আপন হয়ে যায়। খুব কাছের হয়ে যায়, টেরও পাওয়া যায় না। মায়ের বাগানের হিজলগাছের লতার মতো মায়ার বাঁধনে জড়িয়েছিল নিশু।’
মাহির ও বৃষ্টি কাঁদতে থাকেন, তাঁরা একে অপরের চোখের জল মুছে দেন। বিয়ের শানাই বাজতে লাগল। গয়নাপাতি, কাপড়চোপড়, নানা উপহার বিয়ের সাজানো গাড়িতে তুলে দেওয়া হলো। গাড়ি ছেড়ে দিল। নয়ন নিশুকে নিয়ে ভালোবাসার কুটিরের উদ্দেশে যাত্রা করল।
গাড়ি অদৃশ্য হওয়া পর্যন্ত বৃষ্টি-মাহির দুজনে হাতে হাত ধরে দাঁড়িয়ে রইল।

একমুঠো ভাতের জন্য নিষ্পেষিত পরিবারের নিশুদের যাত্রা কখনো থামে না, আজ এ বাড়ি তো কাল ও বাড়ি।