মাঘের শেষ রাত। ঢাকার পুরোনো গলির ভেতর দিয়ে যখন বাতাস বয়, মনে হয় হিমালয় থেকে কেউ এক বস্তা বরফকুচি ছিটিয়ে দিচ্ছে। এই বাতাসে হাড়ের ভেতর একধরনের শিরশিরানি জাগে; যা ঠিক কামড় নয়, বরং একধরনের মিহি করাত দিয়ে হাড় চেঁছে ফেলার অনুভূতি। হাশেম আলী তার তিনতলার ছাদের ঘরে শুয়ে অনুভব করছিল, পাঁজরের হাড়গুলো বোধ হয় আর শরীরের সঙ্গে লেগে নেই, বরং আলগা হয়ে একেকটা একেক দিকে ছুটে যেতে চাইছে।
নিচে নর্দমার ওপর দিয়ে বয়ে আসা বাতাসটা বিচিত্র সব গন্ধ বয়ে আনে। পচা বাঁধাকপির পাতা, দীর্ঘদিনের জমে থাকা কালো জল, আর পাশের বাড়ির মজিদ মিয়ার নোনা ধরা দেয়ালের শেওলার ঘ্রাণ। ইলিয়াস সাহেবের ভাষায় বললে, এই গলিটা হলো শহরের একটা দীর্ঘ অন্ত্র। যেখানে হজম না হওয়া সব অন্ধকার আর আবর্জনা থকথক করছে। হাশেম আলীর ঘরটা সেই অন্ত্রের একদম শেষ প্রান্তের একটা উপবৃদ্ধি।
রতনের এ ধরনের ভারী কথা হাশেমের সহ্য হয় না। সে বুঝতে পারে রতন আসলে আধুনিক যুগের সেই বেকার যুবক, যে কামাই করার মুরোদ রাখে না কিন্তু রাষ্ট্র নিয়ে বিশাল গবেষণা করতে পারে।
হাশেম আলীর স্ত্রী কুলসুম এখন নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। তার নাসিকা গর্জনে একটা ছন্দ আছে, অনেকটা দূরপাল্লার বাসের ইঞ্জিন স্টার্ট নেওয়ার চেষ্টার মতো। কুলসুমের নাক ডাকার শব্দে মাঝেমধ্যে ঘরের জানালার আলগা কাঁচটা থরথর করে কেঁপে ওঠে। হাশেম আলী অন্ধকারেই বিড়বিড় করে বলল, ‘মানুষ নাকি ডিজেল ইঞ্জিন? শীতকালে লুব্রিকেন্ট শুকিয়ে গেলে এমন আওয়াজ হয়!’
হাশেম আলীর মেজাজটা আজ খিটখিটে। বিকেলে মহল্লার মোড়ে করিম মেম্বারের সঙ্গে একচোট কথা–কাটাকাটি হয়েছে। করিম মেম্বার লোকটা দেখতে অনেকটা লম্বাটে বেগুনের মতো, চিবুকের কাছে একটা জাঁতাওয়ালা তিল। সে যখন কথা বলে, তিলটা এমনভাবে নড়ে যেন ওটা আলাদা একটা জীব। মেম্বার বলছিল, ‘হাশেম ভাই, দেশের যা ইনফ্রাস্ট্রাকচার হচ্ছে, অচিরেই আমাদের এই গলি হবে সিঙ্গাপুরের অর্চার্ড রোড।’
হাশেম তখন দাঁত–মুখ খিঁচিয়ে বলেছিল, ‘সিঙ্গাপুর নাকি ছাই! আগে ড্রেনের ঢাকনাটা লাগান। কাল রাতে একটা কুকুর পড়ে গিয়ে যে আর্তনাদ শুরু করেছিল, মনে হচ্ছিল নরকের কোনো প্রাণী মুক্তি চাইছে।’
পাশ থেকে মুদিদোকানি মুচকি হেসে বলেছিল, ‘ওটা তো সাংস্কৃতিক বিপ্লব হাশেম ভাই। কুকুরটাও উন্নয়নের গান গাইছে।’
এই যে পরিস্থিতিগত কৌতুক, এটা বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের ধমনিতে মিশে আছে। তারা যখন খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকে, তখনো পা পিছলে পড়ার আগে পকেটের চিরুনিটা ঠিক আছে কি না দেখে নেয়।
পরদিন সকালে কুয়াশা যেন আরও জাঁকিয়ে বসেছে। রাস্তার ওপাশে মকবুল সাহেবের চায়ের দোকানে ভিড়। মকবুল চা বানায় অনেকটা জাদুকরের মতো। এক কাপ চায়ে সে যে পরিমাণ চিনি আর কড়া লিকার দেয়, তা খেলে হার্টের রোগীও মুহূর্তের জন্য অলিম্পিকে দৌড়ানোর শক্তি পাবে।
দোকানের এক কোনায় বসে আছে সলিমুদ্দিন। সলিমুদ্দিন এই মহল্লার এক বিচিত্র চরিত্র। সে সারা জীবন এক জোড়া চটি আর একটা ঘিয়ে রঙের চাদর গায়ে দিয়ে কাটিয়ে দিল। চাদরটা দেখলে মনে হয় ওটা আসলে কোনো কাপড়ের টুকরো নয়, বরং শরীরেরই একটা বর্ধিত চামড়া। সলিমুদ্দিন চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, ‘শুনলেন হাশেম ভাই? বাজারে নাকি নতুন হুজুর আসছে। সে নাকি দোয়া পড়লে শীত কমে যায়!’
হাশেম আলী চাদরটা গায়ে আরও শক্ত করে জড়িয়ে বলল, ‘হুজুরের দরকার নেই সলিম ভাই, এক ছটাক কেরোসিন তেলের দাম কমানোর দোয়া করতে বলেন। আগুন পোহাতে গেলেও এখন ট্যাক্স দিতে হবে।’
ঠিক তখনই হাজির হলো রতন। রতন হলো এই গল্পের সেই চরিত্র যাকে দেখলে মনে হবে সৃষ্টিকর্তা তাকে বানানোর সময় একটু তাড়াহুড়ো করেছিলেন। তার নাক একটু বেশি লম্বা, আর চোখ দুটো সব সময় এমনভাবে পিটপিট করে যেন সে সারাক্ষণ কোনো জটিল গাণিতিক হিসাব মেলাচ্ছে। রতন গম্ভীর গলায় বলল, ‘হাশেম কাকা, আমাদের কালচারটা কিন্তু শেষ হয়ে যাচ্ছে।’
হাশেম বিরক্ত হয়ে বলল, ‘তোর আবার কী হলো? কালচার তোর পকেটে থাকে নাকি?’
রতন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘দেখুন কাকা, আগে শীতের সকালে পিঠা উৎসব হতো। পাড়ায় পাড়ায় রসের হাঁড়ি আসত। এখন কী হয়? কুয়াশার ভেতর দিয়ে কেবল ধোঁয়া ওড়ে। ওটা রসের ধোঁয়া না, ওটা হলো আবর্জনার স্তূপ পোড়ানো ধোঁয়া। আমাদের সোশ্যাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার এখন ওই আবর্জনার স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে।’
রতনের এ ধরনের ভারী কথা হাশেমের সহ্য হয় না। সে বুঝতে পারে রতন আসলে আধুনিক যুগের সেই বেকার যুবক, যে কামাই করার মুরোদ রাখে না কিন্তু রাষ্ট্র নিয়ে বিশাল গবেষণা করতে পারে। হাশেম বলল, ‘শোন রতন, কালচার দিয়ে পেট ভরে না। পেট ভরে ভাতে। আর তুই যে ইনফ্রাস্ট্রাকচারের কথা বলছিস, ওটা হলো একটা তাসের ঘর। বাতাস দিলে নড়ে, আর মেম্বার কাশ দিলে ধসে পড়ে।’
হাশেম আলী যখন কথাগুলো বলছিল, তখন গলি দিয়ে একটা ময়লা ফেলার ভ্যান যাচ্ছিল। ভ্যানচালক গান ধরল—‘ওরে ও নিঠুর দরিয়া...’। গানের সুরটা নর্দমার কালো জলের সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে গেল।
শহরের এই অংশে জীবন আবর্তিত হয় অভাব আর হাস্যরসের এক অদ্ভুত মিশেলে। দুপুরে হাশেম বাড়ি ফিরল। দেখল কুলসুম একটা বড় গামলায় বসে আমসত্ত্ব শুকানোর চেষ্টা করছে। শীতের এই ক্ষীণ রোদে আমসত্ত্ব শুকানো আর মরুভূমিতে বরফ চাষ করা একই কথা।
হাশেম বলল, ‘রোদের যা ছিরি, আমসত্ত্ব হবে নাকি ওটা পাথরের চ্যাপটা সংস্করণ হবে?’
কুলসুম ঝঝিয়ে উঠল, ‘সংস্করণ বোঝেন না নাকি? আপনি তো বোঝেন শুধু ওই চায়ের দোকানের আড্ডা। বাজার থেকে এক পোয়া শর্ষের তেল আনতে বলেছিলাম, তা তো আনেননি। সারা শরীর চুলকাচ্ছে শীতে।’
হাশেম কাঁচুমাচু হয়ে বলল, ‘ভুলে গেছি। আসলে সলিমুদ্দিন যা শুরু করল না...’
‘রাখেন আপনার সলিমুদ্দিন। ওই লোকটার চাদর ধুলে এক বালতি কাদা বের হবে। আর আপনি চলেন তার সঙ্গে।’
বিকেলে হাশেম আলী বের হলো শর্ষের তেলের সন্ধানে। বাজারের অবস্থা আরও ভয়াবহ। মানুষের ভিড়ে মনে হয় একটা সমুদ্র উথলে উঠছে। কিন্তু এই সমুদ্রের জল নোনতা নয়, বরং ঘামে ভেজা তিতা। দোকানে দোকানে ঝোলানো প্লাস্টিকের প্যাকেট, রঙিন চিপস আর কৃত্রিম পানীয়র সারি। এগুলোই যেন আধুনিক বাংলাদেশের সংস্কৃতির নতুন নিশান।
বাজারের মাঝপথে দেখা হলো মতিন সাহেবের সঙ্গে। মতিন সাহেব রিটায়ার্ড সরকারি চাকরিজীবী। তাঁর পকেটে সব সময় একটা দাঁতখিলাল থাকে। দাঁত না থাকলেও তিনি ওটা দিয়ে মাড়ি খোঁচান। মতিন সাহেব হাশেমকে পাকড়াও করলেন।
‘হাশেম সাহেব, দেখছেন উন্নয়ন? বাজারের মাঝখান দিয়ে যে কালভার্টটা হচ্ছে, ওটা হলে নাকি আমাদের আর কাদা মাড়াতে হবে না।’
হাশেম দেখল কালভার্ট তৈরির নামে বিশাল একটা গর্ত খুঁড়ে রাখা হয়েছে। গর্তের ভেতর জমে আছে গত বর্ষার পচা জল। সেখানে কয়েকটা মশা রাজকীয় ভঙিতে উড়ছে। হাশেম বলল, ‘কালভার্ট হবে কি না জানি না, তবে এই গর্তে পড়লে নির্ঘাত মশা হয়ে পুনর্জন্ম হবে।’
মতিন সাহেব হো হো করে হাসলেন। ‘আপনি না হাশেম সাহেব—সবকিছুতেই কৌতুক খোঁজেন। এটাই তো আমাদের বাঙালি জাতির বৈশিষ্ট্য। আমরা যখন ডুবি, তখনো পাশের জনকে বলি—ভাই, জলটা কিন্তু বেশ মিষ্টি!’
এই যে মরণকামড়ের মধ্যেও রসিকতা, এটাই সম্ভবত এই ভূখণ্ডের মানুষের বেঁচে থাকার রসদ। এ দেশের মানুষ স্বপ্ন দেখে, কিন্তু সেই স্বপ্নের ভেতর ঢুকে পড়ে নর্দমার কীট।
সন্ধ্যায় হাশেম যখন ফিরছিল, তখন কুয়াশা এতটাই ঘন হয়েছে যে সামনের দুহাত দূরের কিছু দেখা যাচ্ছে না। আচমকা সে দেখল গর্তের ধারে এক ছায়ামূর্তি বসে আছে। কাছে গিয়ে দেখল ওটা সলিমুদ্দিন। সে আপন মনে বিড়বিড় করছে।
‘কী হলো সলিম ভাই? এখানে বসে কী করেন?’
সলিমুদ্দিন মুখ তুলে চাইল। কুয়াশার ভেতর তার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। ‘হাশেম, আমি ইনফ্রাস্ট্রাকচার খুঁজছি।’
‘মানে?’
‘রতনে বলল না আমাদের ইনফ্রাস্ট্রাকচার ভেঙে পড়েছে? আমি ওই ভাঙা টুকরোগুলো খুঁজছি। যদি একটা চাঙড় পাই, তবে ওটা দিয়ে মেম্বারের মাথায় এক বাড়ি দিতাম।’
হাশেম হাসবে নাকি কাঁদবে বুঝতে পারল না। সে সলিমুদ্দিনের হাত ধরে টেনে তুলল। ‘চলুন ঘরে চলুন। এই শীতে ইনফ্রাস্ট্রাকচার পাওয়া যাবে না, নিউমোনিয়া পাওয়া যাবে।’
রাতে শোয়ার আগে হাশেম জানালা দিয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকাল। ল্যাম্পপোস্টের ক্ষীণ আলোয় কুয়াশাকে মনে হচ্ছে প্রেতাত্মার মতো। শহরের এই অন্ধকার গলিগুলোয় কত ইতিহাস চাপা পড়ে আছে। নর্দমার নিচ দিয়ে বয়ে চলা জলগুলো হয়তো একসময় স্বচ্ছ ছিল, কিন্তু মানুষের লোভ আর অবহেলা সেগুলোকে আলকাতরা বানিয়ে ছেড়েছে।
কুলসুম ডাকল, ‘শুয়ে পড়ুন। কাল আবার ভোরে উঠতে হবে। বাজারে নাকি চালের দাম আবার বেড়েছে।’
হাশেম আলী বাতি নিভিয়ে দিল। অন্ধকারে সে অনুভব করল, তার ঘরের দেয়ালগুলো যেন সংকুচিত হয়ে আসছে। এই সংকীর্ণতা শুধু ঘরের নয়, এই সমাজব্যবস্থার, এই সংস্কৃতির। কিন্তু তার মধ্যেই কোথাও একটা ক্ষীণ আশার আলো হয়তো জ্বলে থাকে, ঠিক যেমন মকবুলের চায়ের দোকানের সেই লালচে ধোঁয়া।
মাঘের শেষ রাতটি এভাবেই শেষ হতে থাকে। কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকে এক জনপদ, যাদের পকেটে ফুটো কিন্তু মুখে হাসির কমতি নেই। তারা জানে, কাল সকালে আবার রোদ উঠবে, আর সেই রোদে তারা তাদের ছেঁড়া কাঁথা আর ময়লা চাদরগুলো শুকোতে দেবে। রতন হয়তো আবার কালচারের কথা বলবে, করিম মেম্বার সিঙ্গাপুরের স্বপ্ন দেখাবে, আর সলিমুদ্দিন হয়তো তার ঘিয়ে রঙের চাদরটা গায়ে জড়িয়ে নর্দমার ধারের গর্তে কালভার্টের স্বপ্ন দেখবে।
এটাই আমাদের বাংলাদেশ। এখানে শীতের হাড় কাঁপানি আছে, অন্ধকারের তীব্রতা আছে, আর আছে সেই বিচিত্র করুণ রসিকতা, যা মানুষকে পচাগলা ড্রেনের পাশে দাঁড়িয়েও হাসতে শেখায়। জীবনের এই গভীর অন্ধকার আর বিচিত্র বৈপরীত্যই যেন এই জনপদের আসল পুঁথি।
হাশেম আলী ঘুমের ঘোরে বিড়বিড় করে উঠল, ‘পরের কিস্তিতে যেন অন্তত ড্রেনের ঢাকনাটা হয়...’
তাঁর কথা শেষ হওয়ার আগেই কুলসুমের নাক ডাকার তীব্র আওয়াজে ঘরটা কেঁপে উঠল। সেই শব্দের তালে তালে জানালার কাচটা যেন বলতে চাইল— উন্নয়ন আসছে, উন্নয়ন আসছে!
সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, সিলেট