বছর ছয়েক পর

ছবি: এআই/বন্ধুসভা

এক.
বছর ছয়েক পর গ্রামে প্রবেশ করে জামিলের শৈশবের কথা মনে পড়ে যায়। ধূলিখেলার সাথিদের সঙ্গে বেড়ে ওঠা সেই চিরচেনা পথঘাটগুলো কেমন যেন অচেনা মনে হলো তার। গ্রামের মেঠোপথ, ফসলি খেত আর বাড়িঘরগুলোর চেহারা পরিবর্তন হয়ে নতুন রূপ ধারণ করেছে। শৈশব-কৈশোরের অনাবিল আনন্দের কথা মনে পড়ে, আর হৃদয়টা মোচড় দিয়ে ওঠে অদৃশ্য মায়ায়।

জামিল গ্রাম ছেড়ে যাওয়ার পর কেউই জানত না, সে কোথায় থিতু হয়েছে। মূলত জামিলই কাউকে জানতে দেয়নি। এবার মনের কোথাও থেকে সায় দিয়েছে এ পথ মাড়ানোর—তা কেবল সে-ই জানে।

বছর ছয়েক আগের এক পৌষের সকালে, ঘন কুয়াশা কেটে গেলে ঘাসের ডগায় ঝলমলে শিশির জমে থাকে। আর মৃদু ঘাসের শিশিরবিন্দু মাড়িয়ে ফেরারির মতো কোথায় চলে যায় জামিল। গৃহহারা, উদ্দেশ্যহীন পথিক জামিলের আর কেউ খোঁজ নেয়নি।

লম্বা গঠনের সরু চেহারার সেই জামিল আর আজকের জামিল এক নয়। কেমন বাবুয়ানা পোশাক-পরিচ্ছদ হয়েছে তার, নাদুসনুদুস দেহের গঠন। সঙ্গে নিটোল চেহারার বিবাহিত স্ত্রী, আর কোলজুড়ে চতুর্দশীর চাঁদের মতো ফুটফুটে একটি বাচ্চা—কেমন উজ্জ্বল হয়ে আছে। দেখে কে বলবে, মামা সালাম সাহেবের করুণায় বড় হওয়া সেই জামিল!

কেউ বিশ্বাস করুক আর না-ই করুক, সে শহর থেকে নিজেকে জাহির করতে আসেনি। এসেছে নাড়ির টানে—যেখানে তার মায়ার শিকড় গভীরভাবে গ্রথিত আছে।

মামা মারা যাওয়ার পর মাঝবয়সী মামিকে রেখে চলে গিয়েছিল জামিল। হাজার হোক, সে মামির হাতেই মানুষ। মামির অনুশাসনই তাকে আজ এত দূর এনেছে। নয়তো সদ্য জন্ম নেওয়া নামহীন শিশু জামিলের কী হাল হতো!

মাতৃসুতিকায় তার জন্মের কয়েক দিন পরই মা মারা যায়। চিকিৎসার অভাবে মারা গেল বলে প্রশ্ন তুলে বড় মামা। বিচার-সালিসের মাধ্যমে জামিলকে নিয়ে যান মামার বাড়ি। প্রথম কয়েক বছর জামিলের বাবা হাতে তোলা কিছু টাকা পাঠাত খোরাকি হিসেবে। তবে এসবের আশাও করত না নানার বাড়ির লোকজন।

বড় মামা মারা যাওয়ার এক সপ্তাহ পর জামিল তার জিনিসপত্র গুছিয়ে নিজেকে তৈরি করে নিল। কেন এসব পাগলামো—নিজেও বুঝতে পারল না। আদৌ কি তার যাওয়ার মতো কোনো জায়গা আছে? কোন কূলে সে আশ্রয় নেবে, মাথা গুঁজবেই–বা কোন ছাদের নিচে? এসব নিয়ে কিঞ্চিৎও ভেবে দেখেনি। সে এটুকুই জানে—ছেলেদের এত কিছু ভাবতে নেই।

সকালে বেরিয়ে পড়ার আগে মামার কবর জিয়ারত করতে গেল। নানা-নানি, মামা—সবার কবরের পাশে তার মায়ের কবর হয়েছে, পারিবারিক গোরস্তানে। জামিল সেখানে নিয়মিত যাওয়া-আসা করে। শুনেছিল, নানার কবরের পাশেই তার মায়ের কবর। কিন্তু কখনো মাকে দেখেনি বলে তার ভীষণ দুঃখ হয়। সে কথা কোনো দিন কাউকে মুখ ফুটে বলতে পারেনি।

জিয়ারত শেষে চৌহদ্দি পেরিয়ে উঠোনে পা পড়তেই হাসি-তামাশার স্বর শুনে কিছুটা আঁতকে উঠল জামিল। সে ভাবতে লাগল—সঙ্গে খানিকটা বিরক্তও হলো। সকালের নাশতা সেরে সবাই গোল হয়ে বসে গল্পে মেতে উঠেছে। যে যার মতো হল্লা করছে। যেন এই বাড়িতে কিছুই ঘটেনি; সবাই শুধু আমেজে মজে আছে। কারও চেহারা দেখে মনে হয় না যে তারা শোকে ভারাতুর।

জামিল মনে মনে বলল, কুলখানি বলেই কি এমন বেহায়ার মতো আনন্দমুখর পরিবেশ তৈরি করতে হবে? সপ্তাহখানেক আগেও এ বাড়িতে সবাই শোকে আচ্ছন্ন ছিল। অথচ দিন দুয়েকের ব্যবধানে মানুষ এভাবে সব ভুলে যেতে পারে? ভাবল—সে কোথাও হারিয়ে গেলে বোধ হয় কারও কিছুই যায়-আসবে না। হয়তো রিতুর একটু খারাপ লাগবে। মিতুও হয়তো দু-চার দিন খুঁজবে। মেয়েটাকে কোলে-পিঠে করে মানুষ করছে জামিল—পিতৃহারা, অবুঝ মেয়ে।

নীরবে দরজার সামনে এসে হাত নামিয়ে, ঈষৎ কুঁজো হয়ে ঘরে ঢুকল সে। তারপর রুমে গিয়ে চিত হয়ে শুয়ে রইল কিছুক্ষণ। রিতু একটু পর রুমে ঢুকল। জামিলের স্তব্ধতায় সে দরজার চৌকাঠের কাছে দাঁড়িয়ে ক্ষণিক চেয়ে রইল তার দিকে।
অন্য সবার মতো রিতুও বাবার কুলখানিতে এসেছে। বাপের বাড়িতে এলে সে জামিলের তোয়াজ করে বেশ।
রিতু জানে, জামিলের কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমানোর স্বভাব। কিন্তু আজ সকাল থেকে সে রুমে ছিল না। রিতু সকাল থেকে খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত প্রায়। বাড়ির আনাচেকানাচে আর পাঁচিলের ওপাশে গলা বাড়িয়ে খুঁজে এসেছে বহুবার। কোথাও পায়নি। একঘর মানুষ হইহুল্লোড় করে সকালের নাশতা সারছে, আর জামিল সকাল সকাল হাওয়া হয়ে যায়।

একটু নিশ্চুপ থেকে রিতু দ্রুত বলে উঠল,
—সকাল থেকে খুঁজছি তোকে, জিন-পরীর মতো কোথায় মিলিয়ে গেছিস?
জামিল থতমত খেয়ে একবার স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল, তবু কিছুটা ব্যর্থ হলো। তখনো তার চোখজোড়া টকটকে লাল—একেবারে বাসন্তী কোকিলের মতো জ্বলছে।
রিতু কিছুটা আহত হলো। হঠাৎ জামিলের চেহারা এত বিমর্ষ কেন! তাকে বকাঝকা করার তো মানুষ নেই। কিছু জিজ্ঞেস করবে কি না, ভেবে পেল না। পরে আবছায়া সুরে রিতু বলে উঠল,
— কীরে! কী হয়েছে তোর?
— না, কিছু না।
তিন অক্ষরে জবাব দিল জামিল।
রিতুর মনে কিছুটা খটকা লাগল। প্রায় সতেরো-আঠারো বছরে ছেলেটির এমন রূপ কখনো দেখেনি সে। সেদিনের সেই জামিল—সে-ও এত রাগ-অভিমান দেখাতে পারে? রিতুর মনে পড়ে গেল, সেদিনই তো চওড়া উঠানের বুকে ধূলি খেলেছিল তারা। আজ কত বড় হয়েছে! তাদের তৈরি হয়েছে আলাদা জগৎ।

রিতু জামিলকে এটা-সেটা বলে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। কিন্তু জামিল কিছুতেই মনোযোগ দিচ্ছে না। সে গুছিয়ে রাখা কাপড়ের ব্যাগটা হাতে নিয়ে বলল,
— রিতু, মামিকে আমার একটা সালাম দিস। আমি এখন আসি; বেলা পড়ে যাচ্ছে। বাইরে আমার জন্য বাকিরা অপেক্ষা করছে।
— কিন্তু কোথায় যাবি তুই?
— শহরে।
— শহরে! শহরের কী বুঝিস তুই? কোনো দিন তো শহরে যাসনি।
— আচ্ছা রিতু, তুই বল তো—আমি কি নিতান্তই ছেলেমানুষ? আমি বুঝি কিছুই চিনি না?
তর্কাতর্কির মধ্যে রিতু দরজা আড়াল করে দাঁড়াল। জামিল পাশ ঘেঁষে অবাধ্যের মতো বেরিয়ে গেল।
রিতু বাজখাঁই গাছের মতো দাঁড়িয়ে রইল—সবকিছু আশ্চর্যের মতো লাগছে তার। কিছু বুঝে ওঠার আগেই জামিল অদৃশ্য হয়ে গেল।

দুই.
আজ দীর্ঘদিন পর জামিলকে বাড়িতে আসতে দেখে রিতুর মনে চৈতালি ঝড় বয়ে গেল। আবেগে আপ্লুত হলেও মনে মনে বলল—ছেলেটা কী পাগলামোটাই না করত! বিনা কারণে বাড়ি ছেড়ে চলে গেল, কাউকে জানাতেও দিল না।

জামিলের সঙ্গে স্কুলে যাওয়ার কথাগুলো মনে পড়লে রিতুর এখনো কেমন হাসি পায়। বোকার মতো সর্বক্ষণ রিতুর খুব কাছাকাছি থাকতে চাইত সে। কোনো বন্ধুদের সঙ্গে সেধে কথাসুদ্ধ বলতে দিত না রিতুকে।

বাল্যকাল থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত রিতুকে নিয়ে জামিল এতটা উদ্বিগ্ন ছিল না। পিঠাপিঠি ভাইবোনের মতো থেকেছে তারা; বেড়ে উঠেছে একই সঙ্গে। কখনো তাদের তাল কেটে যায়নি।
রিতুকে নিয়ে পুরো কলেজজীবন ভাবনার ওপর পার করে দিয়েছে জামিল। তখনো রিতুকে কিছুই বুঝতে দেয়নি। সে জামিলের অনুনয়-বিনয় কিছুটা বুঝত; তবে পুরোপুরি বিশ্বাস করে উঠতে পারেনি।
রিতু ভাবত—জামিল তাকে এত খাতির-যত্নের ওপরে রাখতে চায়; এর মানে কি এটাও হতে পারে যে সে তাকে পছন্দ করে? কিন্তু তা কেমনে সম্ভব! হয়তো রিতুই আগ বাড়িয়ে বেশি বুঝে ফেলেছে।
তার ধারণাই শেষমেশ ঠিক প্রমাণিত হয়েছিল। রিতুর বিয়ের দিন জামিল সারাটা দিন বাড়ি ছেড়ে কোথায় যেন পালিয়ে গিয়েছিল।

রিতুর বিয়ের পর সে কেমন মনমরা হয়ে গিয়েছিল—একেবারে ফাটা দুধের মতো, ছড়া-ছড়া। তবে জামিলের পরিবর্তনটা চোখ এড়ায়নি রিতুর। তার আগের পাগলামো এখন আর নেই। চলনে-বলনে অনেক মার্জিত ভাব এসেছে।

রিতু আর মিতু উঠান থেকে জামিলদের গ্রহণ করে সামনের ডাইনিং টেবিলে বসিয়েছে। জামিলের কোল থেকে মিতু ছেলেটাকে নিয়ে আদর করতে করতে রুমে চলে গেল। মিতুর রুমটা একসময় জামিলেরই ছিল।

হঠাৎ জামিলদের পেয়ে হইচই পড়ে গেল ঘরজুড়ে। তবে মিতুকে দেখে জামিল অদ্ভুত বনে গেল। সেদিনের মিতু কত বড়ই না হয়ে গেছে—দেখে যেন চেনাই যায় না।
কিন্তু রিতুর পরিবর্তন দেখে জামিল শিউরে উঠল। মনে মনে ভাবল—একসময় কেমন লক্ষ্মীর মতো মেয়ে ছিল! সুগোল চেহারার ধবধবে, ষোড়শী সেই মেয়েটা—মজে গিয়ে এমন কঙ্কালসার হতে পারে!
কথোপকথনের একপর্যায়ে জামিল সকৌতূহলে জিজ্ঞেস করল,
— রিতু, দুলাভাই কেমন আছেন?
জামিলের প্রশ্ন শুনে আমতা-আমতা করে কিছু বলতে চেয়েও পারল না। কথাটা পাশ কাটিয়ে যেতে চাইল সে; কিন্তু বাধ্য হয়ে বলল,
— জানি না কেমন আছে।

রিতু কখনোই তার দৈন্যদশার কথা জামিলকে জানতে দিতে চায় না। জামিল ঘর ছাড়ার পর রিতুরও ফিরে আসতে হয়েছিল। কী সুদর্শন জামাই! প্রতি রাতে নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে। একটু হেরফের হলেই রিতুকে অযাচিত মারধর করত।
রিতু মেয়ে মানুষ, নয়তো জামিলকে তার শরীরের ক্ষত দেখাতে পারত। অদৃশ্য পর্দা ভেদ করা তার পক্ষে সম্ভব নয় বলেই শরীরের ক্ষত আর মনের ক্ষত—কোনোটাই দেখাতে পারছে না।

শেষমেশ ‘বন্ধ্যা’ তকমা নিয়ে শ্বশুরবাড়ি ছাড়তে হলো তাকে। অতিরিক্ত মাদক সেবনের ফলে পৌরুষত্ব হারিয়ে ফেললেও রিতুর ওপরই দোষ চাপিয়ে দেয় স্বামী। দুই বছরের মাথায় কলঙ্কের তিলক কাটা পোড়া কপাল নিয়ে ফিরতে হলো বাপের বাড়ি।
রিতু এসব নাটকীয় কাহিনি কখনোই জামিলকে জানতে দিতে চায় না—ঘুণাক্ষরেও নয়। কিন্তু জামিলের কোলে চাঁদমুখো ছেলেসন্তান দেখে তার হৃদয়টায় শূন্যতা প্রখর হয়ে ওঠে।
জামিলকে কী বলবে ভেবে না পেয়ে শেষে জিজ্ঞেস করে বসল,
— তুই কেমন আছিস রে?
রিতুর মেঘরঙা চেহারার দিকে তাকিয়ে জামিল বুঝে গেল—সে ভালো নেই। তার ভালো থাকার বৃথা চেষ্টা মিথ্যার আড়ালে উজ্জ্বল হয়ে ধরা দিচ্ছে।

বহু বছর পর জামিল বাড়িতে আসায় রাতে ভরপুর আয়োজন হয়। রিতু-মিতু দুই বোন পুরোনো দিনের সখাকে খুঁজে পেয়ে যেন আত্মহারা হওয়ার উপক্রম হলো।
সাড়ম্বরে রাতের খাবার শেষে হল্লা করতে করতে যে যার মতো চলে যায় শোবার ঘরে। চারদিকে ঝিঁঝি পোকার শব্দ—শুকতারার মতো উঠানের অন্ধকার ভেদ করে জোনাকিরা মিটমিট করে জ্বলছে।

উঠানের মাঝে বেতের মোড়ায় বসে জামিল আনমনা হয়ে যায়। অসীম আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে অপলক চোখে। আকাশে একফালি চাঁদ—কখনো মেঘে ঢেকে যায়, আবার উজ্জ্বল মুখখানি বের করে হাসে।
অজস্র নক্ষত্রখচিত রাত, তবু জামিলের খুব একা লাগে। মৃদু বাতাসে বাড়ির চারদিকের গাছগাছালির পাতা ঈষৎ নড়ে ওঠে, আবার নীরব হয়ে যায়। ইতিমধ্যে রিতুদের বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়ে। মাঝরাতে জামিল চাঁদকে সঙ্গী করে বসে থাকলেও তখন পাড়াসুদ্ধ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। জামিল অবচেতনে ভাবে—কিছু কিছু ভালোবাসা ফিরে পাওয়ার জন্য নয়, শুধু বেঁচে থাকার জন্য।

ভাবতে ভাবতে সে মোড়ায় পিঠ কুঁজো করে বসে থাকে। হঠাৎ কাঁধে নরম হাতের স্পর্শ পেয়ে পেছনে ফিরে তাকায়। চাঁদের আবছা আলোয় রিতুকে দেখতে পেল। সে নিশ্চুপে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে জামিলের পাশ ঘেঁষে। কেউ কাউকে কিছু বলছে না। এভাবে মৌনতায় কেটে যায় কয়েক মুহূর্ত। স্তব্ধতা ভেদ করে পরে রিতু বলে ওঠে—
— তুই আবারও চলে যাবি?
জামিল মৃদু হেসে বলে, সব জায়গায় থাকা যায় না রে... কিছু জায়গা শুধু মনে রাখতে হয়।

শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়