আমাদের লোকসমাজে, বিশেষ করে গ্রামে বিভিন্ন কুসংস্কারের প্রচলন ও ভূতের কাহিনি রয়েছে। নুহাশ হুমায়ূন তাঁর পরিচালিত ওয়েব সিরিজ ‘ষ’তে এই কুসংস্কারগুলোকে অসাধারণভাবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি কেবল লোকজ ভূতের গল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি। নুহাশের পরিচালনার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো তাঁর বিশদ বর্ণনা। প্রতিটি দৃশ্যে এমন সব মেটাফোর বা রূপক ব্যবহার করেছেন, যা দেখার পর দর্শকদের মনে অনেকক্ষণ থেকে যায়।
নুহাশ হুমায়ূন পরিচালিত ‘ষ’ (পেট কাটা ষ) বাংলা ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকির ইতিহাসে একটি বৈপ্লবিক কাজ। ছোটবেলা থেকে শুনে আসা লোকজ ভূতের গল্পগুলোকে আধুনিক ও আরবান প্রেক্ষাপটে নতুন করে তুলে ধরেছেন তিনি। সিরিজটি ২০২২ সালে চরকিতে প্রচার করা হয়। সিরিজটি মোট চারটি পর্ব নিয়ে তৈরি। এ লেখায় প্রতিটি পর্বের সংক্ষেপে আলোচনা থাকবে।
‘এই বিল্ডিংয়ে মেয়ে নিষেধ’; এটি সিরিজের প্রথম এবং অন্যতম আলোচিত পর্ব। লৌকিক গল্প ‘মেছো পেত্নী’র আধুনিক সংস্করণ এটি। একটি অ্যাপার্টমেন্টে একা থাকা এক যুবকের মাছ রান্নার প্রতি আকর্ষণ এবং সেখান থেকেই শুরু হওয়া অদ্ভুত কিছু ঘটনা নিয়ে এই গল্প। নুহাশ এখানে সরাসরি কোনো বীভৎস ভূত না দেখিয়ে নিস্তব্ধতা এবং সিনেমাটোগ্রাফি দিয়ে যে অস্বস্তি তৈরি করেছেন, তা ছিল অনবদ্য। শেষ দৃশ্যের চমকটি দর্শকদের দীর্ঘক্ষণ স্তব্ধ করে রাখে।
সিরিজের দ্বিতীয় পর্ব ‘মিষ্টি কিছু’; ‘রাতে মিষ্টি নিয়ে বাইরে বের হতে নেই’—বহু পুরোনো এই কুসংস্কারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এই পর্ব। একজন মিষ্টির দোকানের কারিগর এবং একজন রহস্যময় ক্রেতার মধ্যকার কথোপকথনই গল্পের মূল ভিত্তি। নুহাশ এখানে দেখিয়েছেন কীভাবে অতিপ্রাকৃত শক্তি মানুষের লোভকে পুঁজি করে হানা দেয়। গল্পের মেজাজ ছিল ধীরস্থির, কিন্তু পরতে পরতে ছিল টানটান উত্তেজনা। অন্ধকার নির্জন রাস্তায় মিষ্টির প্যাকেটের সেই দৃশ্যটি ভোলা অসম্ভব।
‘লোকে বলে’; এই পর্বটি মূলত কুসংস্কার এবং লোকজ বিশ্বাসের একটি সংকলন। একটি গ্রামের প্রেক্ষাপটে তৈরি এই গল্পে দেখানো হয় কীভাবে মানুষের মুখে মুখে ফেরা কথাগুলো বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করে। এটি সিরিজের সবচেয়ে শৈল্পিক পর্বগুলোর একটি। এখানে রঙের ব্যবহার এবং গ্রামীণ আবহে অতিপ্রাকৃত উপাদানগুলোকে খুব সূক্ষ্মভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এটি দর্শককে ভাবায়—যা আমরা কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দিই, তা কি আসলেই মিথ্যে?
‘নিশি ডাক’ বা গভীর রাতে নাম ধরে ডাকার সেই প্রচলিত ভয়কে কেন্দ্র করে সিরিজটির সমাপনী পর্ব। শহর থেকে দূরে একটি পাহাড়ি বা নির্জন রাস্তায় এক ব্যক্তির ভ্রমণের মধ্য দিয়ে গল্পটি এগিয়ে যায়। শব্দবিন্যাস ছিল এই পর্বের আসল নায়ক। কে ডাকছে আর কেন ডাকছে—এই রহস্য নুহাশ এত চমৎকারভাবে সাজিয়েছেন যে দর্শক নিজেও একসময় সেই গোলকধাঁধায় হারিয়ে যান। এটি ছিল পুরো সিজনের সবচেয়ে মনস্তাত্ত্বিক পর্ব।
নুহাশ হুমায়ূন প্রমাণ করেছেন যে ভূতের গল্প মানেই কেবল মেকআপ নয়, বরং আলো-ছায়া এবং শব্দের সঠিক ব্যবহারই আসল ভয় তৈরি করে। প্রতিটি পর্বের সিনেমাটোগ্রাফি ছিল আন্তর্জাতিক মানের।
সাবেক সভাপতি, নারায়ণগঞ্জ বন্ধুসভা