প্রেমের তরি ভাসানো মাঝির ‘গলুই’

গলুই ছবিতে পূজা চেরি ও শাকিব খান।

কথিত আছে, তানসেন গান গেয়ে বৃষ্টি নামাতে পারতেন। আর ‘গলুই’ চলচ্চিত্রে আমরা দেখলাম, এক মাঝির ছেলে রাজকন্যার আয়োজিত সমবেত প্রার্থনার আসরে আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করে বৃষ্টি নামিয়ে আনছে। রূপকথার গল্পের মতো সুন্দর এই কল্পনা। বাংলাদেশ তো রূপকথারই দেশ।

লালু নামের এই মাঝিপুত্র সুন্দর ঢোল বাজায়। চলচ্চিত্রের এই দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছিল, সে যদি ঢাকে মাতাল করা একটা তাল তুলত, তাতেও বৃষ্টি নেমে আসত। লালুর ছোটবেলার সখা ছিল একটা গাছ। সেই গাছের সঙ্গে সে কথা বলত। গাছের বুকে তাল ঠুকে ঠুকে সে ঢোল বাজানোর হাত পাকিয়ে ফেলেছে। আমাদের বাংলার ঢাকের বোলে জগৎ নাচে। আব্বাসউদ্দীন তো সেই কবে, ‘আল্লাহ মেঘ দে, পানি দে, ছায়া দেরে তুই...’ গানে গানে আপামর বাঙালির হৃদয়ে তোলপাড় করা ঝড় তুলে দিয়ে গেছেন।

‘গলুই’ চলচ্চিত্রের কাহিনির কল্পনা কাব্যকে ছুঁয়ে থাকে। বাংলা কবিতায় গলুই শব্দটা বারবার ঘুরেফিরে আসে। সাইকেল বা রিকশার যেমন হ্যান্ডেল, তেমনি তরির যাত্রাপথের সম্মুখ দিকনির্দেশক গলুই। জীবনতরির গতিপথ যেমন সর্বমুখী, নৌকারও দুই প্রান্তে দুটি গলুই থাকে। প্রেমের জোয়ারে নাও ভাসানোর এই কাহিনির পরিণতি কিন্তু বিয়োগান্ত। নদীর এপার-ওপার ভাঙা–গড়ার মতো এক তরিতে ভাসা দুটি জীবনের ভাঙা–গড়ার গল্প।

খোরশেদ আলম খসরুর সুন্দর এই গল্পকে অনবদ্য চিত্রায়িত করেছেন পরিচালক এস এ হক অলীক। প্রেমের সৌন্দর্য বিরহে। প্রেমের অপাপবিদ্ধ স্ফুলিঙ্গ না পাওয়ার যন্ত্রণায়। প্রেম ফুলের মতো চির কোমল। কাঁটার আঘাত কোমল হৃদয়ে কঠিন হয়ে বেঁধে। কিন্তু এই আঘাতও যে প্রেমেরই দংশন। শাকিব খান, পূজা চেরী জুটির এই ডুবু ডুবু মিষ্টি প্রেমের বিয়োগান্ত ছোড়া তীর সবারই হৃদয়ে এসে তাই বিদ্ধ করে যায়।

‘গলুই’ এ অভিনয় করেছেন শাকিব খান
ছবি: সংগৃহীত

আবার ‘গলুই’ নামকরণের সার্থকতাও পরতে পরতে ফুটে ওঠে। লালুর বাবা লালুর প্রিয় গাছ কেটে নৌকা বানিয়েছিল। এই কাজকে লালু কখনোই মেনে নিতে পারেনি। গরিব বাবা কিন্তু নতুন নৌকার গলুইয়ে খোদাই করে লিখে রেখেছিল লালুর গাছ। আবার বড় হয়ে এই গরিবের সন্তান লালু প্রেমে পড়বে জমিদারকন্যার। জমিদারকন্যাও সামাজিক, অর্থনৈতিক সব ব্যবধান ঘুচিয়ে মন দিয়ে বসবে লালুকে। লালু নৌকার অন্য গলুইয়ে খোদাই করে রাখবে প্রিয়তমা মালার নাম। ছোট্ট লালু নৌকার গলুইয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে নদীর জলের সঙ্গে খেলা করবে—এই ছিল লালুর বাবার বাসনা। আর লালুর মায়ের কামনা, নতুন বউ হয়ে মালা এই গলুইয়ে বসে স্বামীর বাড়িতে আসবে। মালা নতুন বউ সেজে গলুইয়ে বসে স্বামীর কাছে পৌঁছে গেছে ঠিকই, কিন্তু লালু সেই স্বামী হতে পারেনি।

এই চলচ্চিত্রে শুধু হৃদয় তোলপাড় করা ঢাকের বোল নেই, মন আনচান করা আবহমান কালের বাংলার বাঁশির সুরও আছে। এক পাগল চাচা এই বাঁশি বাজায়। আর ময়না নামের হারানো প্রিয়তমার কবর আগলে রাখে জীবনভর। প্রেমিকার কবরের পাশে প্রেমিকের বাঁশি বাজানো—এই বিরহকাতর উথালপাতাল দংশনজাত রূপকল্পটিও যে চিরন্তন।

আরও পড়ুন

পূজা চেরী অসম্ভব দীপ্তিমান উজ্জ্বল, সুন্দর লেগেছে চলচ্চিত্রে। শাকিব খান একই সঙ্গে শহুরে চকলেট বয় প্রেমিক হওয়ার ক্ষমতা রাখেন, আবার গ্রামীণ আত্মভোলা উড়নচণ্ডী প্রেমিক হওয়ারও ক্ষমতা রাখেন। নদীমাতৃক বাংলাদেশে মাঝি চরিত্রে অভিনয় করতে পারা, যেকোনো নায়কের জন্যই খুবই ভালো একটা বিষয়। বাঙালির অন্তরাত্মায় মিশে যেতে পারার এই সুযোগ শাকিব খান নিজের ষোলো আনা দিয়েই কাজে লাগিয়েছেন।

এই চলচ্চিত্রে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের নৌকাবাইচ আছে। মালাবদল আছে। শাস্তিস্বরূপ, শাস্তির বদলে মিষ্টি খেতে দেওয়ার মতো গান্ধীগিরি, মানবিক চেতনা আছে। সন্তানের মাতৃভক্তির দৃষ্টান্ত আছে। মাঝি ডাক্তারকে পার করে দেওয়ার জন্য পারানি নেয় না। ডাক্তারও মাঝি অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসার খরচ নেয় না—এমন মনুষ্যত্ববোধ আছে। মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলিয়ে দেওয়ার প্রয়াস আছে। যদিও উচ্চবংশীয় জমিদারদের চিরকালীন চরিত্র পাল্টানোর নয়। সব মিলিয়ে গ্রামবাংলার সহজ–সরল এবং শ্রেণিভিত্তিক গরল মনের মানুষের চরিত্র এবং জীবনের চিত্র, সঙ্গে অবশ্যই ভালোবাসার টানাপোড়েন।

চলচ্চিত্রের স্থান নির্বাচন, সেট নির্মাণ, শিল্প নির্দেশনা, ক্যামেরার ভাষা অতুলনীয়। সংলাপ ভালো লাগে। ঘটনার প্রেক্ষাপটে বোনা গান, গানের চলচ্চিত্রায়ণ এবং আবহ সুর ভালো লাগে। গলুইয়ের এক প্রান্তে নববধূর সাজে সজ্জিত অসামান্যা সুন্দরী পূজা চেরীকে দেখে মনে হচ্ছিল একটা আলোর প্রদীপ আর অন্য প্রান্তে মাঝি শাকিব একজন আলোর প্রেমিক। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নিরন্তর আলোর অভিমুখেই গলুইয়ের যাত্রা।

হাওড়া, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত