পুঁথি সংগ্রহ ছাড়াও আর কী করতেন আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ

আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ (১১ অক্টোবর ১৮৭১ - ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৫৩)প্রতিকৃতি: মাসুক হেলাল

চট্টগ্রামের পটিয়া সুচক্রদণ্ডী গ্রামের কীর্তিমান মুন্সী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ। তিনি শুধু পুঁথি সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং সম্পাদনা ও গবেষণা করে বাংলা সাহিত্যে বিশালত্ব তৈরি করেননি, পাশাপাশি কর্মজীবনে নানা পেশায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন।

স্কুল থেকেই তিনি পুঁথির পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করতেন। জীবদ্দশায় আড়াই হাজারের বেশি পুঁথি সংগ্রহ করেছেন। তাঁর সংগৃহীত মধ্যযুগের মুসলমান কবিদের রচিত ৬০০ পুঁথির পাণ্ডুলিপি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত আছে এবং হিন্দু কবিদের রচিত সাড়ে ৪০০ পুঁথির পাণ্ডুলিপি রাজশাহীর বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামকে দেওয়া হয়েছে।

আবদুল করিম কলেজ ত্যাগের পর কর্মজীবন শুরু করেন শিক্ষকতা দিয়ে। চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল স্কুলে কিছুদিন শিক্ষকতা করেন। পরে যোগ দেন সীতাকুণ্ড ইংরেজি স্কুলের অস্থায়ী প্রধান শিক্ষক হিসেবে। স্কুলের চাকরিতে প্রয়োজনীয় অর্থ জুটত না। বাড়তি উপার্জনের জন্য বছর দুয়েক পরে তিনি চট্টগ্রামে প্রথম সাবজজ আদালতে ‘অ্যাপ্রেনটিস’ পদে কাজ শুরু করেন।

১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি পটিয়া দ্বিতীয় মুন্সেফ আদালতে বদলি হন। ১৮৯৮ খ্রিষ্টাব্দে সাহিত্যবিশারদের গুণগ্রাহী চট্টগ্রাম বিভাগের তৎকালীন কমিশনারের পিএ কবি নবীনচন্দ্র সেন আবদুল করিমকে কমিশনার অফিসে কেরানির পদে নিয়োগ দেন।

আবদুল করিমের নেশা ছিল পুঁথি সংগ্রহ করা। একদিন তিনি চট্টগ্রামের দৈনিক জ্যোতিঃ পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেন, ‘কেউ পুঁথির পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করে দিলে তাঁকে এক বছরের জ্যোতিঃ পত্রিকা বিনা মূল্যে উপহার দেওয়া হবে।’

তখন কবি নবীনচন্দ্র সেনের প্রতিপক্ষ কমিশনারের কাছে অভিযোগ করেন যে কবি নবীনচন্দ্র সেন ও আবদুল করিম সরকারি কর্মচারী হয়ে পত্রিকার ব্যবসায়ে লিপ্ত আছেন। কমিশনার অভিযোগটি শোনার পর কবি নবীনচন্দ্রকে অন্যত্র বদলির আদেশ এবং আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেন।

আরও পড়ুন

পরবর্তী সময়ে আবদুল করিম আনোয়ারা থানার একটি ইংরেজি স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। কিছুদিন বিভাগীয় স্কুলে ইন্সপেক্টর পদেও ছিলেন। ২৮ বছর চাকরি করার পর ১৯৩৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তিনি অবসর গ্রহণ করেন।

পটিয়াবাসী আবদুল করিমকে সুচক্রদণ্ডী ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেন। তিনি থানা ঋণ সালিসী বোর্ডের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। পটিয়ায় তখন বিচার–সালিসে তাঁর ডাক পড়ত। নানা পেশায় কাজ করার পাশাপাশি তিনি অনন্তকাল পুঁথি সংগ্রহ এবং সংরক্ষণ ও গবেষণায় কাজ করে গেছেন। বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে তিনিই ছিলেন অগ্রগামী।

সাহিত্যবিশারদ আবদুল করিমের কৃতী ও কীর্তি অতুলনীয়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নায়ক সূর্য সেনপন্থী পটিয়ার ভাটিখাইনবাসী হরিপদ ভট্টাচার্য, চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার খান বাহাদুর আহসানউল্লাহকে নিজাম পল্টনে ফুটবল খেলার মাঠে হত্যা করেন (১৯৩১ সালের ৩০ আগস্ট বিকেলে) এবং পলায়নকালে মাঠেই ধৃত হন। এ ঘটনায় একটি মামলা করা হয়। মামলায় একজন জুরি বোর্ডের সদস্য ছিলেন আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ। তিনি হরিপদকে নির্দোষ বলে মত দেন এবং আরেকজন জুরি বোর্ডের সদস্যকে অনুনয় করে স্বমতে নিয়ে আসেন। ফলে সংখ্যাগুরুর মতে হরিপদ নির্দোষ সাব্যস্ত হন। তবু সংখ্যাগুরুর মতো অগ্রাহ্য করে ১৬ বছর বয়স্ক হরিপদকে ফাঁসির বদলে জেল দেওয়া হয়।

এদিকে জুরি বোর্ডের অন্যান্য মুসলিম সদস্য এবং শহরের মুসলমানরা আবদুল করিমের প্রতি ক্ষুব্ধ ও ক্রুদ্ধ হন। কয়েক মাস তাঁকে ভয়ে ভয়ে পথ চলতে হয়। তিনি একসময় চট্টগ্রাম শহরের আলকরণে থাকতেন। সে সময় পটিয়া থেকে কেউ চিকিৎসার জন্য এলে তাঁর বাসায় উঠতেন। এলাকার গরিব–দুঃখী মানুষের জন্য সব সময় তিনি ভালোবাসার হাত প্রসারিত করতেন।

আজ ৩০ সেপ্টেম্বর, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের মৃত্যুবার্ষিকী। এই দিনে কর্তৃপক্ষের কাছে একটাই দাবি—পটিয়ার সুচক্রদণ্ডী গ্রামে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের নামে পুঁথি গবেষণা ইনস্টিউট, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ একাডেমি ও পুঁথি জাদুঘর স্থাপন করা হোক। পুঁথিসাহিত্যের মধ্যে অনন্তকাল বেঁচে থাকুন এই গুণী মানুষ।

তথ্যসূত্র: আবদুল হক চৌধুরীর রচনাবলি ও আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ: আহমদ শরীফ

বন্ধু, চট্টগ্রাম বন্ধুসভা