মালজোড়া গান ও রশিদ উদ্দিন সরকার: যে গানে কথা বলত হাওরের মানুষ

ছবিতে থাকা ভাস্কর্যটি মালজোড়া গানের অন্যতম প্রধান প্রবর্তক ও সাধক রশিদ উদ্দিন সরকারের।

হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ ও আত্মজিজ্ঞাসার সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশে আছে লোকগানের সুর। ভাটির জনপদে একসময় রাতভর বসত গানের আসর। নৌকা, উঠান কিংবা গ্রামের খোলা প্রান্তরে জমে উঠত ‘মালজোড়া’ গানের আসর। দুই পক্ষের গায়েন বা শিল্পী প্রশ্ন-উত্তরের মাধ্যমে গান পরিবেশন করতেন। সেই গানে থাকত যুক্তি, রস, আধ্যাত্মিকতা ও জীবনবোধ। এই মালজোড়া গানের অন্যতম প্রধান প্রবর্তক ও সাধক ছিলেন রশিদ উদ্দিন সরকার।

১৮৮৯ সালের ২১ জানুয়ারি ভাটি বাংলার বাউলকুলের অন্যতম শিরোমণি বাউল কবি রশিদ উদ্দিনের জন্ম। নেত্রকোনা সদর উপজেলার বহিরচাপড়া গ্রামের এক সাধারণ কৃষক পরিবারে মা ফজর বানু ও বাবা মশ্রব উদ্দিনের কোল আলো করে আসেন তিনি। মল্লিক উদ্দিন ও নিজাম উদ্দিন নামে তাঁর আরও দুই ভাই ছিলেন।

বড় ভাই মল্লিক উদ্দিন এন্ট্রান্স পাস করে গৌরীপুর জমিদারের কাছারিতে কেরানির চাকরি করতেন। বাউল রশিদ উদ্দিনের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। বড় ভাইয়ের কাছেই তাঁর বাল্যশিক্ষার হাতেখড়ি হয়। রশিদ উদ্দিনের দাদা আজম আলী মোড়ল ছিলেন তৎকালীন নামকরা পালোয়ান ও কুস্তিগির। কুস্তিগির হিসেবে তিনি গৌরীপুরের জমিদারের কাছ থেকে বসতবাড়িসহ একখণ্ড লাখেরাজ কৃষিজমি উপহার পান। পরবর্তী সময়ে সেই জমিতেই রশিদ উদ্দিনের বাবা তাঁর তিন ছেলেকে নিয়ে সংসার গড়ে তোলেন।

রশিদ উদ্দিন সরকার ছিলেন ভাটির মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ এক গীতিকার ও সাধক। তাঁর গানের বিষয়বস্তু ছিল মানুষের অতি চেনা জীবনপ্রবাহ, সংসার, সমাজ, প্রেম, বিচ্ছেদ, দুঃখ-কষ্ট, নৈতিকতা ও আত্মপরিচয়ের নানা ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ প্রশ্ন। সহজ-সরল ভাষায় গভীর ভাব প্রকাশের অসাধারণ ক্ষমতাই তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় করে তোলে।

মালজোড়ার আসর
মালজোড়া মূলত দুই পক্ষের গায়েন বা শিল্পীর গানে গানে কথোপকথনের এক বিশেষ লোকজ রীতি। এক পক্ষ কোনো বিষয় নিয়ে গান ধরলে অন্য পক্ষ গানের সুর ও কথায় তার জবাব দেয়। কখনো প্রশ্ন, কখনো যুক্তি, আবার কখনো রসিকতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে পরিবেশনা। এতে শিল্পীর গায়কীর পাশাপাশি প্রয়োজন হয় তাৎক্ষণিক বুদ্ধি, শব্দের দক্ষ প্রয়োগ ও গভীর ছন্দজ্ঞান।

হাওরাঞ্চলে একসময় মালজোড়ার আসর ছিল বিনোদনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ নৌকায় করে এসব আসরে ছুটে আসত। সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলত গানের রেশ। শ্রোতারা কখনো এক পক্ষের বক্তব্যে মুগ্ধ হতেন, আবার পরক্ষণেই প্রতিপক্ষের তাৎক্ষণিক জবাবে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠতেন।

রশিদ উদ্দিন সরকার এই ধারাকে কেবল বিনোদনের ফ্রেমে সীমাবদ্ধ রাখেননি। মানুষের জীবন, সমাজের নানা অসংগতি, সম্পর্কের টানাপোড়েন ও আধ্যাত্মিক প্রশ্নকে তিনি গানের প্রধান অনুষঙ্গ করেছেন। তাঁর মালজোড়া হয়ে উঠেছিল ভাটির মানুষের জীবন ও ভাবনার এক অনন্য সাংস্কৃতিক দলিল।

মাটির মানুষের ভাষায় দর্শন
রশিদ উদ্দিনের গানের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সরল ভাষা। তিনি সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায় গান রচনা করেছেন। ফলে কঠিন ও জটিল আধ্যাত্মিক দর্শনও খুব সহজে সাধারণ শ্রোতার হৃদয়ে পৌঁছে যেত। হাওরের মানুষের জীবন প্রকৃতিনির্ভর। বর্ষায় চারদিকে অসীম জলরাশি, শুকনা মৌসুমে বিস্তীর্ণ মাঠ, নদী-হাওরের ভাঙাগড়া আর জীবিকার অনিশ্চয়তা—এসবই তাদের নিত্যদিনের বাস্তবতা। সেই বাস্তবতার বাইরে ছিলেন না রশিদ উদ্দিনও। তাঁর গানে তাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে জীবনসংগ্রামের নানা চিত্র।

তবে কেবল দৈনন্দিন জীবনই নয়, রশিদ উদ্দিনের সৃষ্টির একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে আত্ম–অনুসন্ধান ও মানবিকতার বোধ। ‘মানুষ কে?’, ‘জীবনের উদ্দেশ্য কী?’, ‘মানুষে মানুষে সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত?’ এমন বহু মৌলিক প্রশ্ন তাঁর গানের কথায় বারবার ফিরে এসেছে।

আরও পড়ুন

মানুষের মুখে মুখে ছড়ানো গান
সেকালের লোকসংগীতশিল্পীদের বড় কোনো মঞ্চ বা আধুনিক প্রচারমাধ্যম ছিল না। গ্রামের উঠান, সাধারণ আসর আর হাওরের নৌকাই ছিল তাঁদের মূল মঞ্চ। সেখান থেকেই গান ছড়িয়ে পড়ত এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে। রশিদ উদ্দিন সরকারের গানও একইভাবে মানুষের মুখে মুখে প্রসার লাভ করেছে। তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে স্থানীয় মানুষের আত্মিক সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত নিবিড়। কৃষক, জেলে, মাঝি ও শ্রমজীবী মানুষ নিজেদের জীবনের গভীর অনুভূতি ও সুর খুঁজে পেয়েছেন তাঁর গানে। ফলে তাঁর গান কেবল বিনোদন নয়, হয়ে উঠেছিল সাধারণ মানুষের মনের ভাষা।

হারিয়ে যাচ্ছে মালজোড়ার ঐতিহ্য
কালের বিবর্তনে গ্রামীণ সংস্কৃতির রূপ বদলে গেছে। একসময় হাওরাঞ্চলের গ্রামে গ্রামে নিয়মিত মালজোড়ার আসর বসলেও এখন তা বিলুপ্তপ্রায়। টেলিভিশন, মুঠোফোন, ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের বিনোদনের ধরন আমূল বদলে দিয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে শিল্পীসংকট, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে লোকসংস্কৃতি চর্চার প্রতি উদাসীনতা। ফলে রশিদ উদ্দিন সরকারের মতো মহাজনদের গানও ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যাচ্ছে। অথচ এসব গান কেবল বিনোদন নয়, এগুলো একটি জনপদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির স্মারক। একটি অঞ্চলের মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস, সম্পর্ক ও জীবনযাত্রার বহু ঐতিহাসিক উপাদান লোকগানের ভেতরেই সুরক্ষিত থাকে।

সংরক্ষণ জরুরি
সাধক রশিদ উদ্দিন সরকারের গান সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ব্যাপকভাবে প্রচারের উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। প্রবীণ শিল্পীদের কাছ থেকে তাঁর গানগুলো সংগ্রহ করে ডিজিটাল অডিও-ভিডিও আর্কাইভ গড়ে তোলা যেতে পারে। পাশাপাশি স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে লোকসংগীতের আসর, উৎসব ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে এই ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত করানো প্রয়োজন। মালজোড়া গান ভাটির মানুষের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আর এই ধারাকে বিকশিত ও জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে সাধক রশিদ উদ্দিন সরকারের অবদান চিরস্মরণীয়।

কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার হুমায়ূন আহমেদ তাঁর ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ চলচ্চিত্রে রশিদ উদ্দিনের বিখ্যাত গান ‘মানুষ ধর, মানুষ ভজ, শুন বলি রে পাগল মন/ মানুষের ভেতরে মানুষ করিতেছে বিরাজন’ ব্যবহার না করলে হয়তো এই অনন্য সৃষ্টি সাধারণ মানুষের কাছে অনেকটাই অজানাই থেকে যেত। এই গানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাউল কবি রশিদ উদ্দিনকে ১৯৯৯ সালে মরণোত্তর শ্রেষ্ঠ গীতিকার হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত করে বাংলাদেশ সরকার। এর পর থেকেই নতুন প্রজন্মের কাছে বাউল কবি রশিদ উদ্দিন ও তাঁর কালজয়ী গান নিয়ে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি হয়।

সময় বদলেছে, বদলেছে বিনোদনের মাধ্যমও। কিন্তু মানুষের প্রেম, বিরহ, দুঃখ ও আত্মজিজ্ঞাসার মৌলিক গল্পগুলো বদলায়নি। সেই চিরন্তন গল্পই রশিদ উদ্দিন সরকার ফুটিয়ে তুলেছিলেন তাঁর গানে। তাই তাঁর সৃষ্টি কেবল অতীতের স্মৃতি নয়, ভাটির লোকসংস্কৃতির এক জীবন্ত উত্তরাধিকার। অসংখ্য কালজয়ী গানের এই স্রষ্টা ১৯৬৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর সকালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর পর তাঁকে তাঁর নিজ বাড়ির আঙিনায় পুকুরপাড়ে সমাধিস্থ করা হয়।