নদীপারের অসমাপ্ত গল্প

ছবি: এআই/বন্ধুসভা

হিজলা উপজেলা পরিষদের সামনে দিয়ে বয়ে গেছে মেঘনার একটি শাখা নদী। দূর থেকে দেখে শান্ত মনে হলেও কাছে গেলে বোঝা যায়, নদীটি আসলে শান্ত নয়, ভীষণ অস্থির। এখানে সারা দিন নৌকা চলে, জেলেরা জাল ফেলে, বালুবাহী ড্রেজারগুলো বুকফাটা আর্তনাদে ছুটে বেড়ায়।
সন্ধ্যায় আকাশের রং নদীর ঘোলা জলে মিশে যায়। সকাল হলে আবার গর্জে ওঠে। এই নদীর একটা স্বভাব আছে—সে যেমন দেয়, তেমনি নিয়েও নেয়।

নদীর পাড় ঘেঁষে ছিল সেলিনাদের ছোট্ট টিনের ঘর। মাটির উঠান, দুটো নারকেলগাছ, একটা আমড়াগাছ আর পেছনে বাঁশঝাড়। বাবা নদীতে মাছ ধরে সংসার চালাত। ঘরে অভাব ছিল, সুখও ছিল।
সেলিনার পড়াশোনা বেশি দূর এগোয়নি। তবে হাতের কাজে ছিল অসাধারণ দক্ষতা। নকশিকাঁথা, পাটের ছিকা, রুমালে ফুল তোলা—সব কাজেই সে পারদর্শী ছিল। তার তৈরি আমড়ার আচার আর নারুর সুনাম ছিল এলাকাজুড়ে।

গাঁয়ের উত্তর পাড়ায় ছিল ফিরোজদের বাড়ি। বয়সে সেলিনার সমান। নদীতে মাছ ধরা কিংবা অন্যের জমিতে কাজ করা ছিল তার পেশা। সুযোগ পেলেই সেলিনাদের বাড়ির আশপাশে ঘুরঘুর করা ছিল নেশা।
প্রথম প্রথম ফিরোজকে দেখে সেলিনা বিরক্ত হতো। কিন্তু কখন যে ঝাঁকড়া চুলের ছেলেটার প্রতি সেই বিরক্তিই মায়ায় পরিণত হলো, তা সে নিজেও জানে না।

দুপুরে নদীর ধারে বসে ফিরোজ বাঁশি বাজাত। সেলিনা কলসি কাঁখে পানি আনার ছলে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত।
একদিন বাঁশি থামিয়ে ফিরোজ বলল,
—পানি নিতে এসেছ?
সেলিনা মুচকি হেসে বলল,
—না।
—তাহলে?
—তোমার বাঁশি শুনতে।
সেলিনার সেই হাসি ফিরোজের মনে আঠার মতো গেঁথে গেল।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নদী বদলে যাচ্ছিল।
নদী থেকে বালু তোলার জন্য একের পর এক ড্রেজার আসতে থাকল। জল ঘোলা হয়ে উঠল। নদীর তলায় তৈরি হলো গভীর গর্ত।
একদিন নদীর দিকে তাকিয়ে সেলিনার বাবা বলল,
—নদীটা আর ভালো নেই রে মা।
সেলিনা হেসে বলল,
—নদী আবার খারাপ হয় নাকি?
বৃদ্ধ বলল,
—মানুষ যখন নদীর স্বভাব বদলাইতে চায়, নদীও তখন তার জবাব দেয়।
ফিরোজও ভয় পেয়ে গিয়েছিল।
—এভাবে বালি তুললে পাড় টিকবে না, সেলিনা।
—আমাদের বাড়িও?
ফিরোজ চুপ থেকে বলল,
—হয়তো।
সেলিনার মুখ মলিন হয়ে গেল। তাকে স্বাভাবিক করার জন্য ফিরোজ মৃদু হেসে বলল,
—ভয় পাও কেন? তোমার জন্য আমি আছি না!
সেলিনা কথাটা বিশ্বাস করেছিল।

কিন্তু নদী মানুষের প্রতিশ্রুতি বোঝে না।
এক সকালে নদীর পাড়ে সরু ফাটল দেখা দিল। দুপুরে ফাটল চওড়া হলো। নারকেলগাছ দুটো নদীর দিকে ঝুঁকে পড়ল। পরদিন আমড়াগাছের পাশের মাটি ধসে গেল।
কাঁদতে কাঁদতে সেলিনা বলল,
—ফিরোজ, নদী কি সত্যিই আমাদের বাড়ি কেড়ে নেবে?
ফিরোজ কোনো উত্তর দিতে পারল না।

কয়েক দিনের মধ্যেই ঘর, উঠান, নারকেলগাছ, আমড়াগাছ—সব নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেল।
সেলিনাদের আশ্রয় হলো দূরের এক চরে। অজানা অচেনা নতুন চরের নতুন জীবনে সংসারের অভাব বেড়ে গেল। বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ল। সেলিনার নকশিকাঁথা, আচার, নারুর কদরও কমে গেল।
গ্রাম ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফিরোজের সঙ্গেও তাদের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেল। কারণ, সেলিনারা যখন গ্রাম ছেড়েছিল, তখন ফিরোজ পাশের জেলায় ধান কাটতে গিয়েছিল। ফিরে এসে শুনল—সেলিনারা চলে গেছে। কোথায় গেছে, কেউ জানে না। যাওয়ার সময় সেলিনারাও জানত না, শেষ পর্যন্ত কোথায় তাদের আশ্রয় হবে। তারপরেও ফিরোজ অনেক খুঁজেছিল। কিন্তু পায়নি কোথাও।

চরের জীবনে অল্পদিনেই সেলিনার রূপগুণের কথা প্রচার হয়ে গেল। অনেকেই বিয়ের প্রস্তাব দিতে থাকল। কিন্তু তার মনে তখনো একজন মানুষ ছিল—নদীর ধারে বাঁশি বাজানো সেই ফিরোজ।

আরও পড়ুন

এদিকে সেলিনাকে হারিয়ে ফিরোজের মনে ক্ষোভের সঞ্চার হলো। সে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে দাঁড়াল। স্থানীয় কিছু লোক নিয়ে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করল।
এতে তার ওপরে হুমকি এল। মিথ্যা অভিযোগের মামলায় হাজতেও যেতে হলো।
হাজত থেকে বেরিয়ে এসে ফিরোজ আর আগের মানুষটি থাকল না। এক রাতে বালু উত্তোলনকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষ হলো। একজন মারা গেল। ফিরোজ পালিয়ে গিয়ে দূরের এক চরে আশ্রয় নিল।
সেখানে সে মাছ ধরত। চুপচাপ থাকত। আর সন্ধ্যা হলে নদীর ধারে বসে বাঁশি বাজাত। চরের মানুষ জানত না, সেই বাঁশির সুরে কার নাম লুকিয়ে আছে।
কয়েক বছর পরের কথা।
এক বিকেলে বাবার জন্য ওষুধ কিনতে সেই চরে গেল সেলিনা।
নৌকা থেকে নামতেই তার কানে এল বাঁশির সুর।
সে থেমে গেল।
এই সুর তার চেনা।
ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। পাড়ে বসে একজন মানুষ বাঁশি বাজাচ্ছে। ঝাঁকড়া চুল। শুকনো মুখ।
সেলিনার ঠোঁট কেঁপে উঠল,
—ফিরোজ?
বাঁশি থেমে গেল।
লোকটি ফিরে তাকাল।
—সেলিনা!
দীর্ঘ বছরের বিচ্ছেদ যেন একটি শব্দে এসে থেমে গেল।
তারা পাশাপাশি বসল। কেউ কিছু বলল না।
শেষে সেলিনা বলল,
—অনেক খুঁজেছি তোমায়।
ফিরোজ নদীর দিকে তাকিয়ে বলল,
—আমিও।
—পাইলা না কেন?
ফিরোজ মৃদু হেসে বলল,
—নদী আমাগো দুইজনরে দুই দিকে ভাসাইয়া নিয়া গেছে।
সেলিনার চোখ ভিজে উঠল।
কিছুক্ষণ পর সে বলল,
—আমড়াগাছটার কথা মনে আছে?
ফিরোজের মুখে হাসি ফুটল।
—তোমার আচারের কথাও মনে আছে।
দুজনেই হাসল। সেই হাসির ভেতরে কত যে কান্না লুকিয়ে ছিল, তা শুধু তারাই জানত।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছিল।
সেলিনা উঠে দাঁড়াল।
—আমাকে যেতে হবে।
ফিরোজ তাকিয়ে রইল।
—আবার আসবা?
সেলিনা উত্তর দিল না। শুধু একবার ফিরে তাকিয়ে নৌকার দিকে চলে গেল।

সে দেখাই ছিল তাদের শেষ দেখা।
কয়েক দিন পর খবর এল, পুলিশ এসে ফিরোজকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেছে।
সেলিনা নদীর কিনারে এসে দাঁড়াল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল পুরোনো বাড়ি, মাটির উঠান, দুটো নারকেলগাছ, আমড়াগাছ আর নদীর ধারে বাঁশি বাজানো ঝাঁকড়া চুলের ছেলেটা।
একদিন এই নদী তার বাড়ি কেড়ে নিয়েছিল। আজ মনে হলো, তার শেষ আশাটুকুও কেড়ে নিয়ে গেল।

নদী তখনো বয়ে চলেছে। দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে নৌকা।
সেলিনা দাঁড়িয়ে রইল সেই নদীর কিনারে—যেখানে একদিন তার শৈশব হারিয়েছিল, আর আজ হারিয়ে গেল তার অসমাপ্ত ভালোবাসা।
নদী থামে না। শুধু তার পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু মানুষের জীবনের গল্প থেমে যায়।

ঢাকা, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬