অপরিচিত আমি

ছবি: এআই/বন্ধুসভা

রাত ১২টা বাজতে ঠিক ৩ মিনিট বাকি।
আরিফ নিজের ঘরের ল্যাপটপ স্ক্রিনের আবছা আলোয় বসে আছে। শীতকালের মধ্যরাত, স্টাডি টেবিলের কোণে রাখা চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া ওঠা বন্ধ হয়েছে অনেক আগেই। বাইরে একটা কুকুর ডেকে উঠেই থমকে গেল। পুরো বাড়িটা এমন নিঝুম হয়ে এসেছে, যেন দেয়ালের টিকটিকিটার টিক-টিক শব্দটাও হৃৎস্পন্দনের মতো ভারী শোনাচ্ছে।

মোবাইলটা টেবিলের ওপর রাখা। স্ক্রিনটা কালো।
আরিফ জানে, ঠিক রাত ১২টা ১ মিনিটে একটি নোটিফিকেশন আসবে। কোনো নম্বর থাকবে না, কোনো প্রেরকের নাম থাকবে না। শুধু একটা ভয়েস মেসেজ। সাত দিন ধরে এই এক অদ্ভুত খেলার মধ্যে পড়েছে সে। প্রথম দিন যখন মেসেজটা এসেছিল, আরিফ ভেবেছিল বন্ধুদের কোনো সস্তা প্র্যাঙ্ক; কিন্তু ভয়েস মেসেজের অডিও ক্লিপটা প্লে করার পর গায়ের পশম খাড়া হয়ে গিয়েছিল।
স্পিকার থেকে ভেসে আসা প্রতিটি শব্দ, টোন, নিশ্বাসের ওঠা-নামা—সবকিছু হুবহু তার নিজের মতো। একদম নিজের গলা। পার্থক্য শুধু এক জায়গায়—অডিওর লোকটা বলে ভবিষ্যতের কথা।

প্রথম দিন মেসেজে বলেছিল, ‘কাল সকালে উঠে দেখবি, তোদের বারান্দায় একটা মরা শালিক পাখি পড়ে আছে। আর ঠিক দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে অফিস থেকে বের হওয়ার সময় তোকে পেছন থেকে একটা কালো স্কুটি ধাক্কা মারবে। বাঁ পায়ে চোট পাবি।’
পরদিন সকালে বারান্দায় সত্যি মরা পাখি পড়ে ছিল; আর দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে অত্যন্ত সতর্ক থাকা সত্ত্বেও ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় একটা কালো স্কুটি এসে জোরে ধাক্কা মারে। আরিফ বাঁ পায়ে প্রচণ্ড আঘাত পায়।
পরের দিনগুলোতেও ঠিক তা-ই ঘটেছে। অডিও যা বলেছে, তা এক চুলও এদিক-ওদিক হয়নি। প্রতিটি রাত তাকে জানান দিয়েছে, আগামীকাল কেমন হতে চলেছে। ভাগ্য যেন নিজের কণ্ঠেই রেকর্ড হয়ে তার কাছে প্রতিদিন ফিরে আসছে।
রবীন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত বাক্যটা আরিফের মনে ভেসে উঠল, ‘আমারই চেতনার রঙে পান্না হলো সবুজ, চুনি উঠল রাঙা হয়ে।’
কিন্তু তার চেতনার রং এখন শুধুই ছাইরঙা এক অন্ধকার। নিজের চেতনা যখন নিজেরই ভবিষ্যতের ঘাতক হয়ে ওঠে, তখন মানুষ কোথায় লুকাবে?

ঘড়ির কাঁটা ১২টা ছুঁলো।
টিং!
মোবাইলের নীল আলোয় অন্ধকার ঘরটা মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল। নতুন অডিও বার্তা এসেছে। অডিও ফাইলটার দৈর্ঘ্য মাত্র ২০ সেকেন্ড।
আরিফের হাত কাঁপছিল। ধীরে ধীরে ফোনটা হাতে নিল। থাম্বপ্রিন্ট দিয়ে লক খুলে প্লে বাটনে চাপ দিল।
স্পিকার থেকে ভেসে এল তার নিজেরই শান্ত, নির্বিকার কণ্ঠস্বর:
‘আরিফ, কাল রাত ৯টা বেজে ৪৫ মিনিটে তুই একজন মানুষকে হত্যা করবি। ভিকটিমের বুকের ঠিক বাঁ পাশে তুই একটা ধারালো কাচের টুকরা ঢুকিয়ে দিবি। তুই চেষ্টা করবি এটা আটকানোর; কিন্তু পারবি না। রক্তে তোর হাত ভেসে যাবে।’
বার্তাটি শেষ হয়ে গেল।
আরিফের চারপাশের বাতাস যেন হঠাৎ থমকে গেল। নিশ্বাস আটকে এল। মাথা ঘুরতে শুরু করল। হত্যা? সে একজন মানুষকে খুন করবে?
না, এটা অসম্ভব! শান্তশিষ্ট একজন মানুষ। ঝগড়াঝাঁটি এড়িয়ে চলাই যার স্বভাব। সে কীভাবে একজন মানুষকে হত্যা করবে?
আরিফ ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ল। মাথার ভেতরে চিন্তাগুলো পাগলের মতো ঘুরতে লাগল। অডিওর লোকটা যদি সে নিজেই হয়, তবে কেন এমন পূর্বাভাস দিচ্ছে? অতীত আর ভবিষ্যতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সে কি নিজের সাজানো কোনো ফাঁদে পা দিতে চলেছে?
কানের কাছে কারা যেন ফিসফিস করে গান গেয়ে উঠল:
আঁধার রাতে নিজের আলোয় দেখছ নিজের মুখ,
যে হাত কাল রক্ত ছোঁবে, সে হাত খোঁজে সুখ।
নিয়তি এক গোলকধাঁধা, পথ হারিয়ে যায়,
যে নিজেরে বাঁচাতে চায়, সে-ই তো ফাঁদে পায়।
মোবাইলটা ছুড়ে ফেলে তোশকের ওপর। ঠিক করল, কাল সে ঘরের বাইরে এক পা-ও বাড়াবে না। দরজায় তালা দিয়ে বসে থাকবে। একা থাকলে কাউকে খুন করবে কীভাবে?

পরদিন সকাল।
সূর্যের আলো উঠে এলেও আরিফের মনের ভেতরের রাত কাটল না। অফিসে ছুটি নিয়ে নিল। ঘরের সব জানালা বন্ধ করে দিল, ভারী পর্দা টেনে দিল। প্রধান দরজায় ভেতর থেকে দুটি বড় তালা লাগিয়ে দিল। রান্নাঘর থেকে সব ধরনের ছুরি, কাচ ও সুচালো জিনিসপত্র এনে একটা প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে বারান্দার এক কোণে লক করে রেখে এল।
যে ঘরে কাচের তৈরি কিছু নেই, যেখানে কোনো মানুষ নেই, সেখানে সে কীভাবে কাউকে কাচের টুকরা দিয়ে আঘাত করবে?
দুপুর পার হয়ে বিকেল হলো। ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা যেন গ্রাস করছে তাকে। ঘরের দেয়ালগুলো ঘনিয়ে আসছে বলে মনে হচ্ছে। আরিফ পায়চারি করতে লাগল। প্রতিমুহূর্তে ঘড়ি দেখছে। সময় যেন তার জন্য থেমে আছে, আবার যেন খুব দ্রুত শেষ হয়ে আসছে।

সন্ধ্যা ৭টা।
হঠাৎ ল্যান্ডলাইন ফোনটা বেজে উঠল। এই ল্যান্ডলাইন অনেক পুরোনো, প্রায় কেউ ফোন করে না। ইতস্তত করে রিসিভারটা তুলল।
অপর প্রান্ত থেকে ছোট বোনের গলা ভেসে এল। বোন শুভ্রা থাকে শহরের অপর প্রান্তে।
‘দাদা! তুই কোথায়? তোর মোবাইলে রিং হচ্ছে; কিন্তু তুই ধরছিস না!’ শুভ্রার গলায় চরম আতঙ্ক।
‘শুভ্রা? কী হয়েছে? তুই কান্নাকাটি করছিস কেন?’ আরিফ চট করে দরজার দিকের তালাগুলোর দিকে তাকাল।
‘দাদা, বাবা...বাবা হঠাৎ বুকে প্রচণ্ড ব্যথা পেয়ে পড়ে গেছেন। মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছে। অ্যাম্বুলেন্স ডেকেছিলাম; কিন্তু রাস্তায় প্রচণ্ড ট্রাফিক জ্যাম! অ্যাম্বুলেন্স আসতে পারছে না। তুই কি প্লিজ আমাদের বাসার কাছের সেই ডাক্তারবাবুকে নিয়ে তাড়াতাড়ি আসতে পারবি? প্লিজ দাদা, বাবা হয়তো আর বেশিক্ষণ...’ শুভ্রা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
আরিফের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। বাবা!
তার মন থেকে হত্যা, অডিও মেসেজ, রাত ৯টা ৪৫, সব ভয় একমুহূর্তের জন্য উড়ে গেল। সে ছাড়া এখন বাবাকে হাসপাতালে নেওয়ার আর কেউ নেই। শুভ্রা একা অত বড় বিপদে কী করবে?

আরিফ চাবি হাতে নিয়ে দরজার কাছে দাঁড়াল; কিন্তু লক খুলতে গিয়ে থমকে গেল।
রাত এখন ৮টা ৩০ মিনিট। ৯টা ৪৫ হতে আর এক ঘণ্টা ১৫ মিনিট বাকি।
সে কি বের হবে? অডিও মেসেজ তো বলেছিল সে কাল খুন করবে; কিন্তু এখন তো বাবার জীবন–মরণের প্রশ্ন! সে কি নিজের বাবার কথা ভেবে ঘরে বসে থাকবে? নাকি বাইরে বের হয়ে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখবে?
আরিফ নিজের মনকে শক্ত করল। ‘না, অডিওটা যা-ই বলুক, আমি সচেতন থাকব। আমি কাচ স্পর্শও করব না। আমি মানুষকে বাঁচাতে যাচ্ছি, মারতে নয়।’
রবীন্দ্রনাথের গান মনে পড়ে গেল তার—
‘অগ্নিগ্রাস হতে বাঁচাও, হে নাথ!
আমার এ ভয় দূর করো...’
আরিফ ছিটকিনি খুলে দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এল।

আরও পড়ুন

প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়েছে। মুষলধারে বৃষ্টি। রাস্তার লাইটগুলো আবছা দেখাচ্ছে। সে একটা সিএনজি পাওয়ার চেষ্টা করল; কিন্তু বৃষ্টির কারণে কোনো গাড়ি মিলছে না।
অবশেষে একটা অটো পেয়ে উঠে বসল। বাবাকে যে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে, সেখানে পৌঁছাতে অন্তত ৩০ মিনিট লাগবে।
বৃষ্টির ফোঁটাগুলো সিএনজির পলিথিনের গায়ে আছড়ে পড়ছে। আরিফের ভেতরের অস্থিরতা ক্রমেই বাড়ছে। ঘড়ি দেখল, রাত ৯টা ১৫।
ডাক্তারের বাড়ি পৌঁছে দেখল, চাবি বন্ধ। প্রতিবেশী বলল, ডাক্তারবাবু আধা ঘণ্টা আগেই হাসপাতালে চলে গেছেন। আরিফ আর একমুহূর্তও নষ্ট না করে শুভ্রাদের বাসার দিকে ছুটল। যখন পৌঁছাল, তখন রাত ৯টা ৩৫ মিনিট।
বাসার ভেতরে ঢুকেই আরিফ থমকে গেল। দরজার লক ভাঙা। ভেতরের আসবাব সব তছনছ হয়ে পড়ে আছে। ডাইনিং টেবিলের ওপর একটা কাচের দামি শোপিস ভেঙে গুঁড়া গুঁড়া হয়ে ছিটিয়ে আছে মেঝেতে।
‘শুভ্রা! বাবা!’ আরিফ চিৎকার করে উঠল।
ভেতরের ঘর থেকে একটা গোঙানির শব্দ পাওয়া গেল। সে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল মাস্টার বেডরুমের দিকে।
সেখানে গিয়ে সে যা দেখল, তাতে গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল।
বাবা মেঝেতে পড়ে আছেন অজ্ঞান হয়ে; আর শুভ্রাকে চেপে ধরে আছে এক অচেনা লোক। লোকটার পরনে কুচকুচে কালো রেইনকোট, মুখ কাপড়ে ঢাকা। তার হাতে একটি ধারালো চাকু, যা সে শুভ্রার গলায় চেপে ধরে আছে। ড্রয়ার থেকে সব গয়না ও টাকাপয়সা লোকটা ব্যাগে ভরছিল, শুভ্রা বাধা দেওয়ায় সে তাকে হত্যা করার হুমকি দিচ্ছে।
শুভ্রার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। সে ভয়ে কথা বলতে পারছে না।
‘খবরদার! এক পা-ও এগোবি না!’ লোকটা চিৎকার করে উঠল। ‘এগোলেই তোর বোনের গলা কেটে দেব!’
আরিফ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। ঘড়ির দিকে তাকাল, রাত ৯টা ৪২।
তার মনের ভেতরের সব হিসাব ওলটপালট হয়ে গেল। সে তো ভেবেছিল, অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো নির্দোষ মানুষকে হত্যা করবে; কিন্তু পরিস্থিতি তাকে এমন এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে বোনের জীবন বিপন্ন!
চোখের সামনে ঘরের মেঝের ভেঙে যাওয়া কাচগুলো দ্যুতি ছড়াচ্ছে।
বুকের মধ্যে একটা অদ্ভুত ঝড় উঠে এল। এক অনাস্বাদিত বিষাদ আর তীব্র ক্রোধ এসে ভর করল আরিফের শরীরে। বুঝল, সে যে পথেই হেঁটেছে, সেই পথটাই তাকে এই জায়গায় নিয়ে আসার জন্য নির্ধারিত ছিল। নিয়তি কোনো বাহ্যিক শক্তি নয়; নিয়তি হলো মানুষের পরিস্থিতি ও সিদ্ধান্তের এক নিখুঁত যোগফল।
কবিতার লাইনগুলো যেন আবার ব্যাকগ্রাউন্ডে বেজে উঠল—
‘যে পথে পালাবি ভাবিস, সে পথেই মৃত্যু দাঁড়িয়ে,
নিজেরে বাঁচাতে গিয়ে, নিয়তিকে আনিস বাড়িয়ে।
কাচের ধার নয়কো কঠিন, কঠিন তো তোর মন,
রক্তের নদী বইবে যেখানে, শেষ হবে এ জীবন।’
‘দাদা! বাঁচাও আমাকে!’ শুভ্রা ডুকরে কেঁদে উঠল।
ডাকাত লোকটা ছুরিটা গলায় আরও একটু চেপে ধরল। গলার চামড়া কেটে এক ফোঁটা রক্ত বেরিয়ে এল।

রাত ৯টা ৪৪ মিনিট।
আরিফের মাথার ভেতরের সব ভয়, সচেতনতা, সতর্কতা একমুহূর্তে ছাই হয়ে গেল। তার চোখের সামনে এখন শুধু ছোট বোনের রক্ত।
আর কিছু ভাবল না। সে নিচু হয়ে একলাফে মেঝের ওপর পড়ে থাকা ভাঙা কাচের শোপিসের সবচেয়ে বড় আর ধারালো টুকরাটি ডান হাতে তুলে নিল। কাচের ধারালো কোণ আরিফের নিজের হাতের তালু কেটে ভেতরে বসে গেল, রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল মেঝের ওপর; কিন্তু সেই যন্ত্রণা সে অনুভব করল না।
‘বললাম না এগোবি না!’ ডাকাতটি চিৎকার করে ছুরি দিয়ে শুভ্রার দিকে আঘাত করতে চাইল।
ঠিক তখনই, রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে, আরিফ হিংস্র পশুর মতো লোকটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
লড়াইটা চলল মাত্র কয়েক সেকেন্ড। ডাকাত লোকটা ছুরি ঘোরাতে চেয়েছিল; কিন্তু আরিফ অন্ধ আক্রোশে কাচের টুকরাটা সমানে চালিয়া দিল।
খস!
কাচের বিশাল ধারালো টুকরাটি সোজা গিয়ে বিঁধল লোকটির বুকের ঠিক বাঁ পাশে। ঠিক যেখানে হৃৎপিণ্ড থাকে।
রক্ত ছিটে এল আরিফের মুখে, চোখে, শার্টে।
লোকটার চোখ দুটি বড় বড় হয়ে গেল। হাতের চাকুটা খসে পড়ল মেঝেতে। সে একমুহূর্ত আরিফের দিকে তাকাল, তারপর ভারী বস্তার মতো লুটিয়ে পড়ল মেঝের রক্তভেজা চাদরে।

ঘরের ভেতরে নীরবতা নেমে এল। শুধু বাইরে বৃষ্টির অঝোর ধারার শব্দ আর দেয়ালঘড়ির টিক টিক।
আরিফ হাঁপাচ্ছে। তার দুই হাত রক্তে ভেসে যাচ্ছে। কিছু রক্ত নিজের তালু থেকে ঝরছে; আর অধিকাংশ রক্ত লোকটার বুক থেকে বের হওয়া।
সে খুন করেছে।
অডিও বার্তাটি সত্যি হয়েছে। একচুলও এদিক-ওদিক হয়নি। রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে সে বুকের বাঁ পাশে কাচ ঢুকিয়ে একজন মানুষকে হত্যা করেছে।
শুভ্রা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে কোনায় গিয়ে সাঁটিয়ে রইল। আরিফ থমকে দাঁড়িয়ে রইল নিথর দেহটার দিকে তাকিয়ে।
হঠাৎ লোকটার পকেট থেকে একটা ফোন বেজে উঠল। খুব চেনা সুর।
আরিফ মন্ত্রমুগ্ধের মতো নিচু হলো। লোকটির মুখ ঢাকা কাপড়টা টান দিয়ে খুলে ফেলল।
যে মুহূর্তে লোকটার মুখ উন্মোচিত হলো, আরিফের পুরো পৃথিবী যেন থমকে গেল। গলার ভেতর থেকে কোনো শব্দ বের হলো না।
ডাকাত লোকটির মুখ...হুবহু তার নিজের মুখ!
একই চিবুক, একই নাকের গড়ন, একই কপালের ভাঁজ। লোকটি আর কেউ নয়, লোকটি আরিফ নিজে!
আরিফ নিজের অজান্তেই পিছিয়ে এল। সে কার মুখোমুখি হয়েছিল? কে এই লোক? সে কি অন্য কোনো সময়ের আরিফ? নাকি তার নিজেরই অবচেতন সত্তার কোনো প্রতিচ্ছবি, যে অপরাধের পথে হেঁটেছিল?
ঠিক তখনই, মৃত লোকটার পকেটে থাকা মোবাইলটার স্ক্রিন জ্বলে উঠল। রাত ১২টা ১ মিনিট।
আরিফ কাঁপতে কাঁপতে মৃতদেহের পকেট থেকে ফোনটা বের করল। ফোনটা লোকটার নয়...ফোনটা আরিফের নিজেরই অন্য একটা ফোন, যা সে কিছুদিন আগে হারিয়ে ফেলেছিল।
ফোনে একটা নতুন নোটিফিকেশন। অডিও বার্তা।
আরিফ রক্তভেজা আঙুলে প্লে বাটনে চাপ দিল।
স্পিকার থেকে ভেসে এল তার নিজেরই কণ্ঠস্বর; কিন্তু এবার সেই কণ্ঠে কোনো সতর্কবার্তা ছিল না। সেখানে ছিল এক ক্রূর, ক্লান্ত হাসির শব্দ।

‘তুমিও ভেবেছিলে না, ভবিষ্যৎ বদলে দেবে? কিন্তু তুমি বোঝোনি, যে নিজের অতীতকে খুন করতে চায়, সে আসলে নিজের ভবিষ্যৎকেই হত্যা করে। এই অডিওটা আমিই রেকর্ড করেছিলাম... সেই সময় থেকে, যখন আমি ভেবেছিলাম, তোমাকে অর্থাৎ আমাকে এই অপরাধ থেকে বাঁচাব; কিন্তু আজ রাতে যে আরিফ মারা গেল, সে ছিল সেই পাপী আরিফ, যে অন্য এক সময়ে ভুল করেছিল। আর যে আরিফ খুন করল...সে আজ থেকে এক নতুন অপরাধী হলো। কাল রাত ১২টা ১ মিনিটে তোর কাছে আবার মেসেজ যাবে। খেলাটা তো কেবল শুরু...’।
অডিও শেষ হয়ে গেল।
ঘরের বাইরে বৃষ্টি থেমে গেছে। এখন শুধু বারান্দার কোণে জমা পানি টুপ টুপ করে পড়ার শব্দ হচ্ছে।
আরিফ আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আয়নায় যে মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে, তার মুখে রক্ত, চোখে এক অসীম শূন্যতা।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষ জীবনের কবিতাটা তার মাথায় ভেসে উঠল—
‘রূপসংকটের মাঝখানে
আপনারে দেখিনু যখন—
চিনিনু তাহারে,
সে যে আমি, সেই তো আমারই অপরিচিত রূপ...’

আরিফ আয়নার দিকে হাত বাড়াল। আয়নার কাচে রক্তমাখা হাতের ছাপ লেগে রইল।
সে আর এখন আগের মানুষ নেই। এখন নিজেরই কাছে এক চিরন্তন অচেনা সত্তা।
টেবিলের ওপর রাখা মোবাইলটা অপেক্ষা করছে আগামীকালের রাত ১২টা ১ মিনিটের জন্য।

ময়মনসিংহ