আনিসুল হকের লেখা আগে কখনো পড়া হয়নি। তবে বন্ধুসভার সুবাদে আমাদের বন্ধুসভাকে স্যারের উপহার দেওয়া ‘কখনো আমার মাকে’ উপন্যাসটি সৌভাগ্যবশত আমার কাছেই ছিল। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর ভাবলাম, বইটি পড়া যাক। যেহেতু শিরোনামটাই মাকে নিয়ে, তাই অনেক মায়া নিয়ে পড়লাম। শেষ করতে বেশি সময়ের প্রয়োজন হয়নি। দুই রাত টানা পড়েই শেষ করলাম। শেষে ইচ্ছা হলো, বইটি নিয়ে কিছু লিখতে।
২০২৪ সালে রচিত আনিসুল হকের ‘কখনো আমার মাকে’ বইটির সূচনা হয় শামসুর রাহমানের ‘কখনো আমার মাকে’ কবিতার মাধ্যমে:
‘কখনো আমার মাকে কোনো গান গাইতে শুনিনি।
সেই কবে শিশু রাতে ঘুমপাড়ানিয়া গান গেয়ে
আমাকে কখনো ঘুম পাড়াতেন কি না, আজ মনেই পড়ে না।’
সূচনাতেই স্নিগ্ধ চিত্রকল্পের দ্বার খোলে, যেখানে তারাগঞ্জের ফাল্গুন রাত, নির্মেঘ আকাশে জোছনার বিস্তার, শিমুলগাছের কালিতে আঁকা ন্যাড়া ডাল, হাসনাহেনার গন্ধে ভরপুর বাগান আর এক নাইটগার্ডের বাঁশির সুরে বিষণ্ন, উন্মাতাল হয়ে ওঠা জগৎ—সব মিলিয়ে এক রূপকথার ভূমিকায় বইটি আমাকে নিমগ্ন করে তোলে। ভাষার সৌন্দর্য, উপমার মাধুর্য আর স্মৃতির কোমলতায় মোড়ানো প্রথম দিকের পাতাগুলো পড়তে পড়তে আমি ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ি একটি শৈশব-স্মৃতিনির্ভর জগতে, যেখানে প্রতিটি বাক্য সযত্নে সংরক্ষিত আছে শৈশবের স্মৃতি নিয়ে। আহ্, কী নস্টালজিক!
গল্পটি মূলত একটি পরিবারকে ঘিরে। বাবা সৎ নিষ্ঠাবান সার্কেল অফিসার, একই সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা। সঙ্গে দুই মায়ের স্নেহ, শাসন ও আত্মত্যাগে ঘেরা এক ঘরোয়া সংসার। আর শিশুর কল্পনার ফাঁকে ফাঁকে ফুটে ওঠে সাত বছরের একটি বালকের চোখে দেখা শৈশব। সে শৈশব কখনো চোরকাঁটাভরা মাঠে দৌড়ায়, কখনো বৃষ্টিতে ভিজে যায় আবার কখনো পুকুরের শেওলায় ঢাকা জলে হারিয়ে যায়। সেই বালকটি মাবলু, অর্থাৎ শহিদুর রহমান।
তবে এই বইটি কেবল ব্যক্তিগত স্মৃতির দলিল নয়, বরং এক প্রজন্মের অনুভব ও ইতিহাসের বহতা ধারাও বটে। মুক্তিযোদ্ধা বাবার অন্যায়ের কাছে নতি স্বীকার না করার অপরাধে চাকরি হারানো, কারাবরণ, বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের টানাপোড়েন আর বড় ছেলের নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে সংসার টেনে নেওয়া। এসব ঘটনা শুধু এক পরিবারের নয়, বরং গোটা জাতির এক নিঃশব্দ দলিল হয়ে ওঠে। সবকিছুর মধ্যে আমার যেটা ভালো লেগেছে, তা হলো সব ভাইবোনদের সফলতা। পরিবারের জন্য বাবলুর আত্মত্যাগ, মাবলুর অ্যাডমিন ক্যাডার হওয়া, ডাবলু এবং বাবলীর রাজশাহী মেডিকেল কলেজে পড়া, বড়মার মৃত্যুর পর বড়মার ছেলে ছোটলুর ছোটমার কাছে থাকার দৃঢ়তা সত্যি মুগ্ধ করেছে।
সবচেয়ে আবেগময় মুহূর্তটি আসে মায়ের গান না গাওয়ার পেছনের করুণ সত্য উদ্ঘাটনে। ছোটমা ১৯৭১ সালের পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতনের শিকার বীরাঙ্গনা এবং বাবলুকে পৃথিবীকে আনার সংগ্রাম এবং ছোটমার মৃত্যুবার্তা—এসব কিছু মুহূর্তেই আমায় ভারাক্রান্ত করেছে। সঙ্গে বাবার মহত্ত্ব।
বইটির শেষ দিকের কাহিনি পড়ে চোখ দিয়ে অনিচ্ছাকৃত জল আসে এবং হৃদয়ের সবকিছু স্তব্ধ হয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট, পারিবারিক সৌন্দর্য এবং বইটির সাবলীল ভাষা সত্যি আমাকে অনেক মুগ্ধ করেছে। এক কথাই বইটি দারুণ।
পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি বন্ধুসভা