নিঃশব্দ প্রেমের উপন্যাস ‘তিথিডোর’

বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪)প্রতিকৃতি: মাসুক হেলাল

মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে স্বাতী। সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসু তাঁর উপন্যাস তিথিডোর-এর মাধ্যমে স্বাতীর চিন্তার বিবর্তনের আলেখ্যে তুলে ধরেছেন চল্লিশের দশকের বাঙালি সমাজের মানসচিত্র। এর সঙ্গে ধীরে উন্মোচিত হয় এক অন্য রকম, সংবেদনশীল ও পরিস্ফুটিত প্রেমের গল্প।

উপন্যাসের শুরু রাজেনবাবুকে দিয়ে। শৌখিন রাজেনবাবু, দুহাতে বাজারের ব্যাগ বইতে তার কোনো দ্বিধা নেই, কিন্তু মাথার বালিশে সুগন্ধ চাই-ই চাই। সপ্তাহের পর সপ্তাহ একই জামা গায়ে দিয়ে অফিসে যেতে তার আপত্তি নেই, অথচ কাচের গ্লাস ছাড়া জল মুখে তোলেন না। অর্থ-জৌলুশে নয়, রুচি আর শখেই তাঁর বাবুগিরি। রাজেনবাবুর স্ত্রী শিশিরকণা মাত্র পনেরো বছর বয়সে সংসারে আসেন। স্বামীর এই ছোটখাটো শখগুলোকে তিনি কৌতুকের চোখে দেখতেন, কখনো প্রশ্রয়ও দিতেন। ঝরা বকুল ফুল কুড়িয়ে এনে খাটের নিচে রেখে দেওয়া কিংবা শাড়ির আঁচলে বেঁধে রাখা—এসব ছোট যত্নেই ধরা পড়ে শিশিরকণার স্নিগ্ধ ভালোবাসা।

আরও পড়ুন

প্রথম সন্তান নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর ইচ্ছার দ্বন্দ্বেও শেষ পর্যন্ত রাজেনবাবুর ইচ্ছেই পূরণ হয়। কন্যাসন্তান জন্ম নেয়, নাম রাখা হয় শ্বেতা। তারপর একে আসে মহাশ্বেতা, সরস্বতী, শাশ্বতী, স্বাতী এবং সবশেষে ছেলে বিজন। পাঁচ মেয়ে ও এক ছেলেতে ভরে ওঠে রাজেনবাবু-শিশিরকণার সংসার।

তিথিডোর উপন্যাসের কাহিনিজুড়ে একধরনের ছন্নছাড়া জীবনের আবেশ লেগে থাকে—যেন একাকী দুপুর, তেঁতে রোদে নিঃশব্দ উঠোন, গাছগাছালির একলা ছায়া। উপন্যাসের এই অনুভব ধরা পড়ে লেখকের গভীর মনস্তাত্ত্বিক ভাষায়—
‘মন খারাপ মানুষের কখন লাগে আর কেন লাগে তার কি কোনো নিয়ম আছে?…মন খারাপ হওয়াটাই যে খারাপ তা কিন্তু ঠিক না।’

বুদ্ধদেব বসুর তিথিডোর

এই লাইনগুলো যেন স্বাতীর মনকে সবচেয়ে ভালোভাবে চিহ্নিত করে। বড় বোনদের কিংবা ছোট ভাই বিজনের মতো নয়, সে একটু অন্য ধাঁচে গড়া। বাবার সবচেয়ে আদরের মেয়ে, ভীষণ জেদি, যা চায় তা হাতের কাছেই চায়। পড়াশোনায় মনোযোগী, বইপ্রেমী, নিজের মতো করে ভাবতে ভালোবাসে।

শাড়ি পরতে গিয়ে হোঁচট খাওয়া, বাইরে যেতে লজ্জা পাওয়া স্বাতীই আবার বাবাকে দিয়ে নানা রকম বই কিনিয়ে আনে। কলেজ থেকে ফিরে বিষণ্ন মন নিয়ে চনমনে রোদের দুপুরে মেঝেতে শুয়ে পড়ে কবিতার বইয়ে ডুবে থাকে। ভাবতে থাকে, কবিতার মতো করেই যদি জীবনটাকে উপভোগ করা যেত!

এই জীবনে আসে সত্যেন রায়, স্বাতীর কলেজের নতুন অধ্যাপক। ছোটবেলাতেই বাবাকে হারানো সত্যেন একা থাকে, পড়াশোনা আর আবৃত্তিই যার জগৎ। ক্লাসের অন্য ছাত্রীদের তুলনায় স্বাতীই যেন সত্যেনের কবিতা সবচেয়ে গভীরভাবে অনুভব করে। কবিতা ধার নেওয়া থেকে শুরু করে কবিতার অর্থ বোঝা—এইসব ছোট মুহূর্তে দুজনের মধ্যে তৈরি হয় এক নীরব, সংবেদনশীল সম্পর্ক।

স্বাতী ও সত্যেনের প্রেম আর পাঁচটা প্রেমকাহিনির মতো নয়। এখানে শরীরী টান নয়, বরং কবিতা, বই, আবৃত্তি আর অনুভূতির মধ্য দিয়ে একে অপরকে ছুঁয়ে ফেলার গল্প। বিকেলের নরম রোদের মতো তাদের সম্পর্ক ধীরে মিশে যায় দূরের দিগন্তরেখায়।

শেষদিকে বিয়ের আচার-অনুষ্ঠান নিয়ে গল্পের গতি একটু তাড়াহুড়োর মনে হলেও উপন্যাসের আবেশ কোথাও ভাঙে না। তিথিডোর মূলত ভালো লাগার উপন্যাস—বিশেষ করে স্বাতীকে। এমন এক নারীচরিত্র, যে বারবার প্রেমে পড়ে, আবার বারবার নিজের মনকেও নতুন করে চিনে নেয়।

বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা