প্রিয় তিতলি
প্রথমবারের মতো অনলাইনে চিঠি লেখা প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে প্রথম আলো বন্ধুসভা। এতে অসংখ্য চিঠি এসে জমা হয়। প্রতিযোগিতায় সমন্বয়ক ছিলেন ঢাকা মহানগর বন্ধুসভার সাংগঠনিক সম্পাদক তানভীর হাসান। বিচারকদের যাচাই বাছাইয়ের পর সেরা চিঠিগুলো প্রকাশ করা হলো।
প্রিয় তিতলি,
জানো, কিছু কথা সময়মতো বলা হয় না। ঠোঁটের কাছে এসে থেমে যায়, তারপর ধীরে ধীরে হৃদয়ের গভীরে জমতে থাকে। বছর পেরোয়, ঋতু বদলায়, মানুষ দূরে সরে যায়, তবু কিছু কথা থেকে যায় ঠিক আগের মতোই, শুধু আরও ভারী হয়ে। আজ সেই ভার নামাতেই তোমাকে লিখছি।
মনে আছে, কলেজের প্রথম দিনটির কথা? নবীনবরণ অনুষ্ঠানে তুমি কবিতা আবৃত্তি করছিলে। তোমার কণ্ঠে যেন বৃষ্টিভেজা বিকেলের কোমলতা, আর চোখে ছিল অদ্ভুত এক নির্মল আলো। সেদিনের কবিতার সব পঙ্ক্তি মনে নেই, কিন্তু কবিতাটি যে মানুষটি বলেছিল, তাকে আজও ভুলতে পারিনি।
তারপর আমাদের বন্ধুত্ব হলো। ক্লাসের ফাঁকে দু-একটি কথা, ছুটি শেষে পাশাপাশি কিছুটা পথ হাঁটা, ছোট ছোট হাসি—এসবই অজান্তে আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ঋতু হয়ে উঠেছিল। তুমি ছিলে বন্ধু; আর আমি নীরবে তোমার মধ্যেই নিজের আগামী দিনের স্বপ্ন বুনছিলাম।
ভাবছিলাম, ভালোবাসা দিবসেই বলব—‘তিতলি, আমার পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর শব্দটি তুমি।’ কিন্তু জীবন কখনো কখনো অন্য গল্প লিখে রাখে। ভালোবাসা দিবস আসার আগেই তুমি আনন্দভরা কণ্ঠে জানালে, আগামী সপ্তাহেই তোমার বিয়ে। আমি হাসিমুখে অভিনন্দন জানিয়েছিলাম, অথচ ভেতরে–ভেতরে একটি অসমাপ্ত বসন্ত নিঃশব্দে ঝরে পড়ছিল।
তোমার বিয়েতে যাইনি। কারণ, কিছু বিদায় দূর থেকেই সম্মান জানানো ভালো। তবে তোমার পাঠানো ছবিগুলো এখনো দেখি। লাল বেনারসিতে তোমাকে যে কী সুন্দর লাগে! যখনই তোমার ছবিগুলো দেখি, দুচোখ ভিজে আসে। চোখের জল সব সময় দুঃখের ভাষা নয়; কখনো কখনো তা নিঃস্বার্থ ভালোবাসার শেষ স্বাক্ষর।
আজ তুমি সমুদ্রের ওপারে, দূরের একটি দেশে। মাঝেমধ্যে কথা হয় আমাদের। তুমি জানো না, প্রতিবার কথা শেষে আমি একটি বাক্য আবারও অব্যক্ত রেখে দিই।
আজ সেই বাক্যটি বলে দিচ্ছি—আমি তোমাকে ভালোবাসি।
তবে এই স্বীকারোক্তির বিনিময়ে আমার কোনো প্রত্যাশা নেই। কারণ, ভালোবাসা অধিকার নয়, ভালোবাসা একধরনের প্রার্থনা। যে প্রেম পাওয়ার পরও টিকে থাকে, সে সুন্দর; কিন্তু যে প্রেম না পেয়েও মানুষের ভেতর আলো জ্বালিয়ে রাখে, সে-ই অনন্ত।
যদি কোনো দিন কোনো কবিতার বই খুলে হঠাৎ আমার কথা মনে পড়ে, তবে একবার শুধু হাসবে। সেই হাসিই হবে আমার না-বলা ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
ভালো থেকো তিতলি। তোমার জীবনের প্রতিটি সকাল শান্ত হোক, প্রতিটি সন্ধ্যা হোক ভালোবাসায় পূর্ণ। আর আমার এই চিঠিটুকু—তোমার কাছে নয়, সময়ের কাছে রেখে গেলাম। কিছু ভালোবাসা মানুষের নয়, স্মৃতির হয়ে আজীবন বেঁচে থাকে।
ইতি
তোমার কবিতার শ্রোতা
উত্তরা, ঢাকা