প্রিয় সমরেশ

প্রথমবারের মতো অনলাইনে চিঠি লেখা প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে প্রথম আলো বন্ধুসভা। এতে অসংখ্য চিঠি এসে জমা হয়। প্রতিযোগিতায় সমন্বয়ক ছিলেন ঢাকা মহানগর বন্ধুসভার সাংগঠনিক সম্পাদক তানভীর হাসান। বিচারকদের যাচাই বাছাইয়ের পর সেরা চিঠিগুলো প্রকাশ করা হলো।

অলংকরণ: এস এম রাকিবুর রহমান

প্রিয় সমরেশ,

দৃষ্টির ওপারে কেমন আছ? সে বছর ৮ মে চলে গেলে সবাইকে একেবারে ছেড়ে। তার পর থেকে অমোঘ শূন্যতার সঙ্গে আমরা দিন কাটাচ্ছি।

বাংলা থ্রিলার লেখকদের প্রতি আমার বরাবরই কম ভরসা ছিল জানো তো। এ জন্য অনুবাদ করা কিংবা অনুবাদ ছাড়াই অন্য ভাষার থ্রিলার বই পড়তাম। হঠাৎ কারও ফেলে রাখা আট কুঠুরি নয় দরজা বই চোখে পড়ল, নাম দেখেই কৌতূহল হওয়ার সম্ভাবনা মেটাতে কয়েকটা পাতা পড়লাম। পড়েই মনে হলো সেযাবৎকালের আমার পড়া সব সিনেমাকে হার মানিয়েছে এই বইখানা। তারপর আর কী! আরও খুঁজতে থাকলাম সাহিত্যের প্রিয় ধারা উপন্যাস। খুঁজতে গিয়ে দেখি, তুমি ইতিমধ্যে বিখ্যাত লেখক, তোমার খ্যাতি আমার কাছে পৌঁছাতেই দেরি হয়ে গেছে।

করোনাকালে আড়াই দিন পিডিএফে চোখ অনবরত রেখে পড়ে ফেললাম কালবেলা। পড়ে বুঝলাম, মাধবীলতা আর দশজন সাধারণ নারীর মতো—কোমল তবে মুড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়। এরপর মৌষলকাল, সাতকাহন, গর্ভধারিণী, মেয়েরা যেমন হয় ইত্যাদি পড়ে নিলাম। মেয়েরা যেমন হয়–এর কয়েকটা লাইনে মেয়েরা কেমন হয় প্রশ্নের উত্তরে লিখেছিলে, ‘মেয়েরা আসলে যেমন হয়, তারা তেমনই হয়।’ হে হে হে, পুরো বইতে ২০ থেকে ৩০ খানা মেয়ের গল্প শুনিয়ে শেষে এমন উত্তরে খুব হেসেছিলাম।

আচ্ছা, তুমি কি জানো, দীপাবলি আর জয়িতার মধ্যে আমি নিজেকে খুঁজে পেয়েছি! এই দুনিয়ার সব শ্রেণিবৈষম্য কেন জানি ভেঙে ফেলতে মন চায় আমার। কেউ দামি গাড়ির জন্য কাঁদবে; আর কেউ একমুঠো ভাতের জন্য—এটা সহ্য করতে কষ্ট হয় আমার। ইচ্ছা করে জয়িতার মতো সব ছেড়ে পালিয়ে মধ্যবিত্তের সংকটকে পিছু ফেলে চলে যাই কোনো গ্রামে; যেখানে সবার পরিচয় হবে মানুষ। সবাই একই রকম আমিষ-নিরামিষ খেয়ে দুঃখ করবে। এমন কোনো গ্রামের সন্ধান তো লিখে যেতে পারতে, বলো!

যা লিখলাম, খুব ইচ্ছা ছিল পাসপোর্টে নতুন ভিসা লাগিয়ে এরপর যখন কলকাতা যাব, সব তোমায় সামনাসামনি জানাব। অজানা থেকে কী করে মনের সবচেয়ে কাছের লেখক হয়ে উঠলে, সে গল্প নিজে গিয়ে জানাব; কিন্তু তা আর হলো কই, সমরেশ!

ছেলেরা মেয়েদের কোনো দিনই বুঝতে পারে না—এই ধারণা যে তোমার লেখা পড়ে করেছি, এই কথাও জানাতে পারলাম না।

আচ্ছা, তোমার কি শুধু দার্জিলিং বাগান, শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ির চা–বাগান দেখা হয়েছে? আমাদের দেশের শ্রীমঙ্গলেও চা–বাগান দেখতে আমার নিমন্ত্রণ দেওয়া বাকি পড়ে গেল যে। আমি যখন প্রথম শ্রীমঙ্গল যাই, চা–বাগান দেখেই তোমার কথা ভেবেছিলাম। এই চা–বাগান দেখেও কি সমরেশের অতখানি আনন্দ হবে, যতখানি জলপাইগুড়িরটা দেখে হয়েছিল? প্রশ্নটা তোমার কাছে পৌঁছাতে পারলাম না। যেমন করে আরও হাজারটা কথা তোমার মৃত্যুর সঙ্গে হারিয়ে গেল।

বুকের মধ্যে প্রিয় লেখকের শূন্যতা নতুন মানুষের বই দেখলেই খোঁচা দিয়ে ওঠে। অনেকে বলে মানুষ মরলে আকাশের তারা হয়ে যায়। আমি আকাশে তাকিয়ে সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রকে দেখেই ভেবে নিই, ওইটাই তুমি। তোমার চেয়ে বেশি জ্যোতি আর কেউই ছড়াতে পারবে না, এটা আমার বিশ্বাস।

তুমি ভীষণ সুন্দর সব বোধের সুর জাগাও পাঠকদের মনে; আর জানো তো, সুরকে ধ্বংসের অধিকার কোনো অসুরেরও নেই। ভালো থেকো মহাকাশের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র।

ইতি

তোমার চেনা দেশের অজানা নিশি

গ্রিন রোড, ঢাকা