ময়মনসিংহে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আগমনের শতবর্ষ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরছবি: সংগৃহীত
রবীন্দ্রনাথের ময়মনসিংহ সফর ছিল সময়ের বিচারে স্বল্প, কিন্তু প্রভাবের দিক থেকে সুদীর্ঘ। এক শ বছর পরও তাঁর নাম উচ্চারিত হয় গভীর শ্রদ্ধায়।

আজ থেকে ঠিক ১০০ বছর আগে, ১৯২৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পা রেখেছিলেন ময়মনসিংহের মাটিতে। সময়ের হিসাবে এক শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও সেই আগমনের স্মৃতি এখনো ছড়িয়ে আছে শহরের স্থাপত্যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, নদীর হাওয়ায় এবং মানুষের বয়ানে।

আগমনের প্রেক্ষাপট ও ঐতিহাসিক দিন
ঢাকা থেকে ট্রেনে যাত্রা করে কবি যখন ময়মনসিংহ রেলস্টেশনে নামেন, তখন তাঁকে ঘিরে ছিল বিপুল জনসমাগম। স্থানীয় শিক্ষাবিদ, জমিদার, সংস্কৃতিমনা ও সাধারণ মানুষ তাঁকে স্বাগত জানান গভীর শ্রদ্ধায়। সে সময় ময়মনসিংহ ছিল পূর্ববঙ্গের এক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাকেন্দ্র। কবির আগমন ঘিরে শহরে তৈরি হয়েছিল উৎসবমুখর আবহ। দ্য ডেইলি স্টার বাংলায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, কবির সফর সংক্ষিপ্ত হলেও তা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ, বিশেষত শিক্ষা ও সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য। সেই সফরের বিভিন্ন স্মৃতি আজও ছড়িয়ে আছে শহরের কয়েকটি ঐতিহাসিক স্থাপনায়।

বিদ্যাময়ী ও আনন্দমোহন প্রাঙ্গণে কবির স্মৃতি
ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় তখনো ছিল নারীশিক্ষার অগ্রদূত প্রতিষ্ঠান। স্থানীয়ভাবে জানা যায়, কবির সফরকালে বিদ্যাময়ীর শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে গভীর উৎসাহ দেখা দিয়েছিল। নারীশিক্ষা, মানবিক মূল্যবোধ ও সাম্যের বিষয়ে কবির দৃষ্টিভঙ্গি এই প্রতিষ্ঠানের আদর্শের সঙ্গে গভীরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। তাই তাঁর আগমন শুধু আনুষ্ঠানিক সফর ছিল না; এটি ছিল এক চিন্তার সেতুবন্ধন।

একইভাবে উপমহাদেশের প্রাচীনতম উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি আনন্দমোহন কলেজ, কবির উপস্থিতিতে বিশেষভাবে আলোকিত হয়েছিল। তৎকালীন ছাত্রসমাজের কাছে রবীন্দ্রনাথ শুধু নোবেলজয়ী কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক মানবতাবাদী দার্শনিক কণ্ঠস্বর। কলেজের প্রাঙ্গণে তাঁর আগমন তরুণদের মধ্যে সাহিত্য ও সমাজভাবনার নতুন আলো জ্বালিয়েছিল বলে প্রবীণদের বয়ানে পাওয়া যায়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

স্থাপত্যে লুকিয়ে থাকা পদচিহ্ন
ময়মনসিংহ শহরের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যেও রবীন্দ্রস্মৃতি ছড়িয়ে আছে। আলেকজান্ডার ক্যাসেল, টাউনহল প্রাঙ্গণ, শশী লজ কিংবা আঠারবাড়ীর জমিদারবাড়ি—এসব স্থানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পদচারণের স্মৃতি স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখিত। যদিও সময়ের সঙ্গে অনেক স্থাপনা জীর্ণ হয়েছে, তবু তাদের দেয়ালে লেগে আছে শতবর্ষ আগের এক আলোকিত দিনের ছাপ।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এসব স্থাপনা শুধু ইট-পাথরের কাঠামো নয়; এগুলো একটি সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার সাক্ষ্য। রবীন্দ্রনাথের আগমন সেই ধারাকে দৃশ্যমান করেছিল।

শিক্ষা, মানবতা ও ময়মনসিংহ
রবীন্দ্রনাথের দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল মানুষ; তার মুক্তচিন্তা, শিক্ষা ও মানবিক বিকাশ। ময়মনসিংহের মতো শিক্ষানগরীতে তাঁর সফর তাই ছিল প্রতীকী গুরুত্বসম্পন্ন। বিদ্যাময়ী স্কুলে নারীশিক্ষার অগ্রযাত্রা এবং আনন্দমোহন কলেজে উচ্চশিক্ষার বিস্তার—এই দুই ধারার সঙ্গে কবির মানবতাবাদী আদর্শের গভীর মিল রয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য যেমন ব্যক্তি মানুষকে জাগ্রত করেছে, তেমনি তাঁর উপস্থিতি এক শতাব্দী আগে এ শহরের শিক্ষার্থীদের জুগিয়েছিল আত্মবিশ্বাস। ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে দেখা যায়, সে সময়ের ছাত্রসমাজ রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য ও ভাবধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে সাহিত্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হয়ে ওঠে।

আরও পড়ুন

শতবর্ষের প্রেক্ষাপটে পুনর্মূল্যায়ন
আজ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আগমনের শতবর্ষে প্রশ্ন জাগে,আমরা কি সেই স্মৃতিকে যথাযথভাবে ধারণ করতে পেরেছি? বিদ্যাময়ী ও আনন্দমোহনের প্রাচীন ভবনগুলো এখনো শিক্ষা দিচ্ছে; কিন্তু সেগুলোর দেয়ালে ঝুলে থাকা ইতিহাসের অনুচ্চারিত গল্পগুলো কতটা উচ্চারিত হচ্ছে?

রবীন্দ্রনাথের ময়মনসিংহ সফর ছিল সময়ের বিচারে স্বল্প, কিন্তু প্রভাবের দিক থেকে সুদীর্ঘ। এক শ বছর পরও তাঁর নাম উচ্চারিত হয় গভীর শ্রদ্ধায়। শহরের বাতাসে, ব্রহ্মপুত্রের স্রোতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঘণ্টাধ্বনিতে—সবখানেই যেন লুকিয়ে আছে সেই দিনের প্রতিধ্বনি।

শতবর্ষপূর্তির এই দিনে ময়মনসিংহ ফিরে তাকায় নিজের ইতিহাসের দিকে। কারণ, রবীন্দ্রনাথের আগমন ছিল এক মানসিক জাগরণের মুহূর্ত, যার আলো আজও দ্যুতি ছড়িয়ে যাচ্ছে।

উপদেষ্টা, ময়মনসিংহ বন্ধুসভা