কবির মৃত্যুর পর উদ্ধার হওয়া তাঁর গদ্যসাহিত্য আমাদের ধারণাকে আমূল বদলে দিয়েছে। ‘মাল্যবান’ কিংবা ‘সুতীর্থ’র মতো উপন্যাসে তিনি দেখিয়েছেন মধ্যবিত্ত জীবনের অত্যন্ত রূঢ় ও সত্য রূপ।
১৭ ফেব্রুয়ারি। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে দিনটি এক নিভৃতচারী অথচ যুগান্তকারী স্রষ্টার আগমনের বার্তা নিয়ে আসে। ১৮৯৯ সালের এই দিনে বরিশালের এক ছায়াঘেরা পরিবেশে জন্ম নিয়েছিলেন জীবনানন্দ দাশ। তিনি এমন এক শিল্পী যিনি শব্দের তুলিতে কেবল ছবি আঁকেননি, বাংলা কবিতার প্রচলিত ব্যাকরণ ভেঙে এক নতুন মেরু নির্মাণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন একাধারে দার্শনিক, নিসর্গবিদ এবং আধুনিক মানুষের অস্তিত্ববাদী সংকটের নির্মোহ বিশ্লেষক।
জীবনানন্দের কবিতায় প্রকৃতি কেবল পটভূমি হিসেবে আসেনি, প্রকৃতি সেখানে যেন এক জীবন্ত চরিত্র। ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যগ্রন্থ পাঠ করলে বোঝা যায় যে তিনি বাংলার চিরন্তন রূপকে কতটা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। ধানসিড়ি নদীর তীরে শঙ্খচিল কিংবা শালিকের ওড়াউড়ির মাঝে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন এক অপার্থিব সৌন্দর্য। তাঁর দৃষ্টি ছিল অণুবীক্ষণ যন্ত্রের মতো সূক্ষ্ম, যেখানে হিজল, তমাল কিংবা আকন্দ, ধুতরার ফুলও অনন্য মহিমায় ভাস্বর হয়ে ওঠে। তিনি প্রকৃতিকে নাগরিক কৃত্রিমতা থেকে মুক্ত করে তার আদিম রূপে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর কাছে নিসর্গ ছিল এক আধ্যাত্মিক আশ্রয়, যেখানে মানুষ সব ক্লান্তি ভুলে ঘাসের ঘ্রাণে অবগাহন করতে পারে।
জীবনানন্দ ছিলেন বিশ শতকের জটিল মনস্তত্ত্বের শ্রেষ্ঠ রূপকার। তাঁর কবিতায় বারবার ঘুরেফিরে এসেছে ‘বিপন্ন বিস্ময়’ কথাটি। আধুনিক সভ্যতার //যাঁতাকলে পিষ্ট মানুষের একাকিত্ব, হতাশা আর বেঁচে থাকার নিরর্থকতাকে তিনি অত্যন্ত তীক্ষ্ণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধপরবর্তী সময়ের সামাজিক অবক্ষয়, দাঙ্গা ও মূল্যবোধের সংকটকে তিনি এড়িয়ে যাননি। ‘সাতটি তারার তিমির’ গ্রন্থে তিনি এক অন্ধকার সময়ের ছবি এঁকেছেন, যেখানে মনুষ্যত্ব বারবার পরাজিত হয়েছে। তাঁর এই আধুনিকতা কেবল সময়ের প্রতিফলন নয়, বরং মানুষের অন্তর্নিহিত বিষাদবোধের এক দার্শনিক প্রকাশ।
কবির মৃত্যুর পর উদ্ধার হওয়া তাঁর গদ্যসাহিত্য আমাদের ধারণাকে আমূল বদলে দিয়েছে। ‘মাল্যবান’ কিংবা ‘সুতীর্থ’র মতো উপন্যাসে তিনি দেখিয়েছেন মধ্যবিত্ত জীবনের অত্যন্ত রূঢ় ও সত্য রূপ। কবিতার মায়াবী জগৎ থেকে বেরিয়ে গদ্যে তিনি হয়ে উঠেছেন অনেক বেশি রূঢ় ও মনস্তাত্ত্বিক। দাম্পত্য কলহ, যৌনচেতনা এবং মানুষের অবচেতন মনের যে গহিন অন্ধকার গলি, সেখানে তিনি আলো ফেলেছেন অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে। কবির গদ্যশৈলী ছিল তাঁর কবিতার মতোই চিত্রকল্পময়, কিন্তু বিষয়বস্তুর দিক থেকে তা ছিল সমসাময়িক যেকোনো কথাসাহিত্যের চেয়ে বেশি অগ্রসর। তিনি দেখিয়েছেন, মানুষ কতটা একা এবং তার এই একাকিত্বই তাকে বারবার নিজের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
জীবনানন্দের কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর উপমা ও চিত্রকল্প। তিনি কবিতায় এমন সব শব্দ ব্যবহার করেছেন, যা আগে কখনো বাংলা সাহিত্যে সমাদৃত হয়নি। তাঁর কাছে সন্ধ্যা নামে শিশিরের শব্দের মতো কিংবা অন্ধকার হয় স্তনদুগ্ধের মতো সাদা। এই যে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য উপমা, যা পাঠককে একই সঙ্গে দেখতে, শুনতে ও অনুভব করতে বাধ্য করে, এটিই জীবনানন্দ দাশের অনন্য সৃষ্টি। তিনি শব্দের সীমানাকে প্রসারিত এবং সাধারণ শব্দকে অনন্য নান্দনিকতা দান করেছেন। তাঁর কবিতা পাঠ করা মানে এক অন্য জগতে প্রবেশ করা; যেখানে বাস্তব আর কল্পনা মিলেমিশে রহস্যময় আবহ তৈরি করে।
ব্যক্তিজীবনে জীবনানন্দ দাশ ছিলেন অসম্ভব আত্মকেন্দ্রিক ও শান্ত প্রকৃতির। জীবদ্দশায় তিনি যোগ্য সম্মান পাননি, উল্টো বারবার সমালোচকদের রোষানলে পড়েছেন। তাঁর কবিতাকে তথাকথিত সুশীল সমাজ ‘দুর্বোধ্য’ বলে আখ্যা দিয়েছিল। চরম দারিদ্র্য আর কর্মজীবনের অস্থিরতার মধ্যেও তিনি তাঁর কলম থামাননি। এই যে একা লড়াই করার মানসিকতা, এটাই তাঁকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এক অবিসংবাদিত আইকন করে তুলেছে। ১৯৫৪ সালের সেই বিষাদময় ট্রাম দুর্ঘটনা হয়তো তাঁর জীবনের ট্র্যাজিক সমাপ্তি ছিল, কিন্তু তাঁর সৃষ্টির যে যাত্রা, তা আজও বহমান। তিনি দেখিয়ে গেছেন, শিল্পী কতটা একাকী থেকেও একটি গোটা জাতির চেতনার কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে পারেন।
আজকের এই যান্ত্রিক ও গতিশীল পৃথিবীতে জীবনানন্দ দাশ আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। মানুষ যখন প্রযুক্তির ভিড়ে নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলছে, তখন জীবনানন্দের কবিতা তাকে প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার ডাক দেয়। তাঁর ‘সুচেতনা’ কিংবা ‘বনলতা সেন’ কেবল কাব্যিক চরিত্র নয় বরং তারা মানুষের পরম শান্তির একেকটি প্রতীক। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, কীভাবে ইতিহাসের গভীর থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমানকে বুঝতে হয়। জীবনানন্দ দাশ কোনো বিশেষ সময়ের কবি নন, তিনি কালজয়ী। তাঁর সৃষ্টির গভীরতা আমাদের প্রতিনিয়ত উদ্বুদ্ধ করে নতুন করে বাঁচতে এবং নিজের শেকড়কে ভালোবাসতে।
জীবনানন্দ দাশ এক নীরব বিপ্লবীর নাম, যিনি তাঁর কবিতার মধ্য দিয়ে আমাদের চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করেছেন। তাঁর জয়ন্তীতে আমরা যখন তাঁকে স্মরণ করি, তখন কেবল কবির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোই আমাদের উদ্দেশ্য নয়, বরং তাঁর জীবনদর্শনকে আত্মস্থ করাও আমাদের দায়িত্ব। তিনি শিখিয়েছেন নক্ষত্রের সঙ্গে কথা বলতে, ঘাসের বিছানায় শুয়ে আকাশ দেখতে এবং মানুষের ভেতরের মানুষের সন্ধান করতে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য যত দিন টিকে থাকবে, তত দিন জীবনানন্দ দাশ তাঁর ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ আর ‘রূপসী বাংলা’র মায়া নিয়ে আমাদের মাঝে অমর হয়ে থাকবেন।
পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক, চট্টগ্রাম বন্ধুসভা