বই আলোচনা
নৌকমান্ডোর বীরত্বগাথার জীবন্ত দলিল ‘মুক্তিযুদ্ধে নৌ সেনানী’
সম্প্রতি হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে হাবিপ্রবি বন্ধুসভার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছে চার দিনব্যাপী বইমেলা। এ উপলক্ষে বই রিভিউ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নেন। প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছেন শহিদুজ্জামান সুমন। তিনি লিখেছেন লে. কর্নেল (অব.) জালাল উদ্দিন বীর উত্তমের মুক্তিযুদ্ধে নৌ সেনানী বইয়ের রিভিউ।
মুক্তিযুদ্ধে নৌ সেনানী বইটির লেখক লে. কর্নেল (অব.) জালাল উদ্দিন বীর উত্তম বইটির ভূমিকায় বিনয় ও গৌরবের সঙ্গে বলেছেন তিনি লেখক নন, তিনি একজন যোদ্ধা এবং বইটি লেখার অনুপ্রেরণা তিনি পেয়েছেন রুশ বিপ্লব নিয়ে প্রখ্যাত সোভিয়েত লেখকদের সাহিত্যকর্ম থেকে।
লে. কর্নেল জালাল উদ্দিন বীর উত্তমের জন্ম ১৯৪২ সালে মাগুরা জেলার পলাশবাড়িয়া গ্রামের এক মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারে। অভাবের তাড়নায় ১৯৫৬ সালে ম্যাট্রিক পাসের পর তিনি পাকিস্তান নৌবাহিনীতে যোগদান করেন।
মুক্তিযুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন লেখক চট্টগ্রামের নেভাল ক্যাম্পে ছিলেন। পাকিস্তানি নেভিতে বাঙালিদের প্রতি পশ্চিমাদের সন্দেহজনক দৃষ্টি ও অবিচার লেখককে ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। এই ক্ষোভের চূড়ান্ত পর্যায় আসে যখন ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে তাঁর কাছ থেকে অস্ত্র কেড়ে নিয়ে নিরস্ত্র করে রাখা হয়।
পাকিস্তান নেভাল ক্যাম্প পি এন এস বখতিয়ার থেকে সব সময় পালিয়ে যাওয়ার চিন্তায় মগ্ন থাকা লেখক ২৬ মার্চ সে সুযোগ পেয়ে যান। নেভাল ক্যাম্প থেকে বের হয়ে দক্ষ নাবিক জালাল উদ্দিন সমুদ্র সাঁতরে নিরাপদ দূরত্বে পৌঁছে যান। এরপর তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রানারঘাট মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে চলে আসেন।
পাকিস্তান নেভাল ক্যাম্প থেকে পালিয়ে ভারতের রানারঘাট মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে পৌঁছানোর আগপর্যন্ত লেখক যেসব মানুষের মুখোমুখি হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে এক স্বাধীনতাকামী যুবকের পরমাত্মীয় সুলভ আচরণ এবং পুলিশের এক দেশপ্রেমিক ওসির স্বদেশের প্রতি টানের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
এরপর লেখক রানারঘাট ক্যাম্প থেকে পলাশী ক্যাম্পে পৌঁছে নৌ কমান্ডোদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ রপ্ত করতে থাকেন। প্রশিক্ষণ শেষে ‘আত্মঘাতী আক্রমণ’ দলিলে সই করে ১৯৭১ সালের ৭ আগস্ট লেখকসহ মোট ১৪ জন নৌ কমান্ডো অপারেশন জ্যাকপট সংঘটিত করার উদ্দেশ্যে রওনা দেন।
১৪ আগস্ট আক্রমণের কথা ছিল। তবে পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে নিরাপত্তার জন্য জাহাজগুলোকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। ফলে হিরণ পয়েন্ট নোঙরে অপারেশন জ্যাকপট পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি।
১৪ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গ ফেরার পথে লেখক এবং বাকি নৌ কমান্ডোরা দারুণ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেন। তাঁরা বেশির ভাগ অস্ত্র এবং গোলাবারুদ দেশের অভ্যন্তরে মেজর জিয়াউদ্দিনকে জমা দিয়ে আসেন। কারণ, পশ্চিমবঙ্গে ফিরে ভারতের কাছে এসব জমা দিলে আবার সেসব পাওয়া যাবে কি না, সে ব্যাপারে তাঁরা চিন্তিত ছিলেন।
মুক্তিযোদ্ধাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে ‘পদ্মা’ ও ‘পলাশ’ নামের দুটি লঞ্চকে গানবোটে রূপান্তরিত করার পর ১২ অক্টোবর কলকাতার মেয়র তা মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে হস্তান্তর করেন। গানবোট পেয়ে বাঙালি নৌ কমান্ডোদের আত্মবিশ্বাস, উদ্যম ও শক্তি বহুগুণে বেড়ে যায়। ১০ নভেম্বর গানবোট দুটি অভিযানে বের হয়। পাকিস্তানি শিবিরের ক্ষতি সাধনের উদ্দেশ্যে নৌ কমান্ডোদের ফেলে রাখা গ্রাউন্ড মাইনে ৫টি বাণিজ্য জাহাজ এবং পাক গানবোট ‘তোফায়েল’ ডুবে যায় এবং ৩৫ জন পাকিস্তানি নাবিক প্রাণ হারায়।
চালনা বন্দরের (বর্তমান মোংলা বন্দর) প্রবেশদ্বারে মাইনের আঘাতে বিদেশি জাহাজগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সমুদ্রবন্দরের জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়, যা ছিল মুক্তিযুদ্ধে নৌ মুক্তিযোদ্ধাদের বিশাল এক অর্জন।
১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর গানবোট ‘পদ্মা’ ও ‘পলাশ’ এবং ভারতীয় গানবোট ‘পানভেল’ একযোগে চূড়ান্ত বিজয়ের অভিযান শুরু করে। ৯ ডিসেম্বর লেখক গানবোটসহ বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করেন। লক্ষ্য ছিল খুলনার পাকিস্তানি নৌঘাঁটি তিতুমীর।
খুলনা শহরের কাছাকাছি পৌঁছাতেই লেখকের সিক্সথ সেন্স আসন্ন বিপদের কথা তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেয়। মনকে শান্ত রাখতে লেখক সুরা-আর রাহমান, আয়াতুল কুরসি এবং দোয়া ইউনুস অবিরাম পাঠ করতে থাকেন। তিতুমীর ঘাঁটি থেকে ১০ মিনিট দূরত্বে থাকতেই হঠাৎ চারটি জঙ্গি বিমান মাথার ওপরে ঘুরতে থাকে।
লেখক ভারতীয় কমান্ডার সামন্তর সঙ্গে ওয়াকিটকিতে যোগাযোগ করেন। ভারতীয় গানবোট পানভেলের কমান্ডার সামন্ত গুলি করতে নিষেধ করে দিয়ে জানান বিমানগুলো ভারতীয়। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে বিমানগুলো পদ্মা ও পলাশে আক্রমণ করে।
তবে অদ্ভুত ব্যাপার এই যে বিমানগুলো ভারতীয় গানবোট পানভেলকে অ্যাটাক করেনি। পদ্মা ও পলাশে আক্রমণ হওয়ার পরপরই লেখক বিমানগুলোকে লক্ষ্য করে গোলাবর্ষণ শুরু করেন। তবে সেগুলো নিরাপদে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
বোমার আঘাতে ইতিমধ্যে গানবোট দুটিতে আগুন ধরে যাওয়ায় লেখকসহ বাকি অনেকেই জীবন বাঁচাতে নদীতে লাফ দেন। লেখক বহু কষ্টে সাঁতরে রূপসার পশ্চিম তীরে উঠতে সক্ষম হন।
এরপর তিনি ভারতে চলে আসেন। পরে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যোগ দেন।
বইটিতে লেখকের কণ্ঠে একদিকে যেমন মুক্তিযুদ্ধে নৌ কমান্ডোর অসমসাহস এবং অভাবনীয় সাফল্যের জয়গান গীত হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি গানবোট পদ্মা ও পলাশে নিহত সহযোদ্ধাদের হারানোর অসহনীয় মর্মবেদনার কথাও তাঁর লেখায় উঠে এসেছে, যা যেকোনো বাঙালি মনকে আবেগপ্রবণ করে ফেলবে।
লেখক বইটিতে অল্প কথায় মহান মুক্তিযুদ্ধে নৌ কমান্ডোদের বীরত্বপূর্ণ নৌযুদ্ধের পুরো ইতিহাসটাকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন, যা মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী প্রজন্মের জ্ঞান তৃষ্ণা মেটাতে সক্ষম।
শিক্ষার্থী, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়