বই আলোচনা
গুরু-শিষ্যের যুগলবন্দী আহমদ ছফার ‘যদ্যপি আমার গুরু’
সম্প্রতি হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে হাবিপ্রবি বন্ধুসভার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছে চার দিনব্যাপী বইমেলা। এ উপলক্ষে বই রিভিউ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নেন। প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করেছেন সুপর্ণা কুণ্ডু। তিনি লিখেছেন আহমদ ছফার যদ্যপি আমার গুরু বইয়ের রিভিউ।
প্রখ্যাত চিন্তাবিদ ও লেখক আহমদ ছফার যদ্যপি আমার গুরু মূলত একটি স্মৃতিচারণামূলক গ্রন্থ। ছফা এবং আবদুর রাজ্জাক স্যারের অর্থাৎ গুরু-শিষ্যের এক দুর্দান্ত যুগলবন্দী বইটি।
১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমির পিএইচডি ফেলোশিপ পাওয়ার পর সুপারভাইজার হিসেবে ছফা বেছে নেন জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাককে। তবে তিনি সরাসরি লেখকের শিক্ষক ছিলেন না। থিসিসের সুপারভাইজার হওয়ার সুবাদে রাজ্জাক সাহেবের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন ছফা। প্রচণ্ড রকমের জ্ঞানী, প্রতিভাবান একজন মানুষের সাহচর্যে থেকে ছফা এই স্মৃতিচারণামূলক বইটি লিখে ফেলেন।
বইয়ের প্রতিটি পাতায় রয়েছে নতুন তথ্য বা কোনো বইয়ের রেফারেন্স বা কোটেশন বা বরেণ্য ব্যক্তিদের পরিচয়। আহমদ ছফার মতো আমিও পুরোটা সময় যেন রাজ্জাক সাহেবের কথাগুলো মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলাম। সময় নিয়ে পড়তে পারলে চমৎকার লাগবে বইটি। বইটিতে মুনীর চৌধুরী থেকে শুরু করে বসওয়েল, একারম্যান, মহাকবি গ্যোটে, অমর্ত্য সেন, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, হ্যারল্ড লাস্কি, শেক্সপিয়ার, নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, জসীমউদ্দীন, রামমোহন, বিদ্যাসাগর, লেনিন, কার্ল মার্ক্স, হেনরি কিসিঞ্জার, ডিক উইলসন, মহাত্মা গান্ধী প্রমুখ বরেণ্য ব্যক্তির নাম এবং তাঁদের মতাদর্শের কথা উঠে এসেছে। এ ছাড়া রুশ বিপ্লব, ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভোল্যুশন, ফিউডালিজমের মতো অসংখ্য বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।
বইটির শুরুর দিকে ছফার অভিমান প্রকাশ পেয়েছে নিজের বিশ্ববিদ্যালয়, নিজের বাংলা বিভাগের প্রতি। শিক্ষকদের যে স্নেহ তিনি আশা করেছিলেন, তা পাননি। তবে আব্দুর রাজ্জাকের মতো প্রফেসরের সান্নিধ্যে এসে তিনি সেই স্নেহই শুধু পাননি, পেয়েছিলেন তাঁর অভিমানের ভাষা বোঝা একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষকে। তিনি এক পর্যায়ে ছফাকে বলেছিলেন, কোনো নতুন জায়গা সম্পর্কে ধারণা পেতে হলে সে অঞ্চলের মানুষ কী খায় আর কী পড়ালেখা করে, তা জানা প্রয়োজন। তারপর জসীমউদ্দীনের ‘জীবনকথা’, বজ্র-বিদ্যুৎ আর ফুল মিলে নজরুলের বর্ণনা, হ্যারল্ড লাস্কির সঙ্গে সাক্ষাতের সময়কার কথোপকথন, এককালের গ্র্যান্ডমাস্টার নিয়াজ মোর্শেদের দাবার চাল, শেক্সপিয়ারের অঘটনঘটনপটীয়সী প্রতিভা, লেনিন, মার্ক্সের তত্ত্ব বিশ্লেষণসহ বহুবিধ তথ্যের অবতারণা করেন তিনি। আহমদ ছফার প্রতিটি কথার পিঠেই রাজ্জাক সাহেব একেকটা উদাহরণ বা বইয়ের রেফারেন্স দিয়েছেন। ইন্টেলেকচুয়াল বিউটি বা মনীষার কান্তি বলতে আমরা যা বুঝি, সেটা নিঃসন্দেহে রাজ্জাক সাহেবকে বলা চলে।
এত বড় নন্দিত একজন প্রফেসর, যাঁকে নিয়ে দেশ-বিদেশের মানুষ লিখেছেন, জাতীয় অধ্যাপকে ভূষিত হয়েছেন, যাঁকে বলা হতো শিক্ষকদের শিক্ষক; তিনি তাঁর জীবনে অল্প কিছু প্রবন্ধ ছাড়া কিছুই রচনা করেননি। চরম প্রজ্ঞাবান মানুষ হয়েও স্রোতের বিপরীতে চলার মানসিকতা তাঁকে অসামান্য করে তোলে। তাঁর চরিত্রের প্রণিধানযোগ্য বৈশিষ্ট্যটি হলো নিজের দেশ ও সমাজের প্রতি নিঃশর্ত অঙ্গীকার। এমন নিভৃতচারী, অনাড়ম্বর জ্ঞানসাধক মানুষটির প্রজ্ঞা, পাণ্ডিত্য এবং ধীশক্তির অনন্যতা কিছুটা অনুভব করতে চাইলেও বইটি পড়া উচিত বলে মনে করি।
শিক্ষার্থী, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়