‘আরেক ফাল্গুন’–এ জহির রায়হান ‘ফাল্গুন’ বলতে কী বুঝিয়েছেন

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রচিত জহির রায়হানের ‘আরেক ফাল্গুন’।

বাংলা সাহিত্যে ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে লেখা উপন্যাসের সংখ্যা খুব বেশি নয়। কিন্তু যে অল্প কয়েকটি রচনা এই ইতিহাসকে সাহিত্যিক শক্তিতে ধারণ করেছে, জহির রায়হানের ‘আরেক ফাল্গুন’ তার মধ্যে অন্যতম। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক উপন্যাস নয়; বরং প্রেম, সংগ্রাম ও এক প্রজন্মের স্বপ্নের সম্মিলিত কাহিনি। ভাষা আন্দোলনের উত্তাল সময়কে কেন্দ্র করে লেখা এই উপন্যাসে যেমন রাজপথের প্রতিবাদ আছে, তেমনি আছে মানুষের অন্তর্লোকের টানাপোড়েন।

পটভূমি ১৯৫৫ সালের ঢাকা। ভাষা আন্দোলনের রক্তাক্ত স্মৃতি তখনো জাতির মনে তাজা। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারির সেই আত্মত্যাগ তখনো পূর্ণ স্বীকৃতি পায়নি; উল্টো রাষ্ট্রক্ষমতার দমননীতি ছাত্রসমাজকে আরও ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে তরুণেরা আবারও নতুন করে সংগঠিত হচ্ছেন, শহীদদের স্মৃতি ধারণ করে প্রতিবাদের পথ বেছে নিচ্ছেন। সেই সময়ের উত্তেজনা, আশা ও ক্ষোভকে কেন্দ্র করেই জহির রায়হান নির্মাণ করেছেন ‘আরেক ফাল্গুন’।

কেন্দ্রীয় চরিত্র মুনিম। তার চারপাশে রয়েছে ছাত্রসমাজের আসাদ, কবি রসুল, সালমা, রেনু, নীলা, বানুসহ আরও অনেক তরুণ–তরুণী। তারা কেউ রাজনৈতিকভাবে সক্রিয়, কেউবা সাংস্কৃতিক পরিসরে যুক্ত, কিন্তু সবাই এক অর্থে একই স্বপ্নের অংশীদার। ভাষার অধিকার ও জাতীয় মর্যাদার প্রশ্ন তাদের একসুতোয় বেঁধে রেখেছে। এই বহু চরিত্রের উপস্থিতি উপন্যাসটিকে বাস্তবতার কাছাকাছি নিয়ে যায়, যেন পাঠক সেই সময়ের ছাত্ররাজনীতির ভেতরেই প্রবেশ করতে পারেন।

তবে ‘আরেক ফাল্গুন’ কেবল আন্দোলনের উপন্যাস নয়। এর ভেতরে আছে প্রেমের সূক্ষ্ম আবহ। মুনিমের জীবনে ডলি নামের এক তরুণীর উপস্থিতি সেই আবেগের প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু রাজনৈতিক ব্যস্ততা ও আন্দোলনের দায় তাকে ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রতি অবহেলিত করে তোলে। ফলে প্রেমের জায়গায় জন্ম নেয় দূরত্ব, অভিমান ও অনিশ্চয়তা। ডলি একসময় মুনিমের দেওয়া উপহার ফিরিয়ে দেয়। এই দৃশ্য যেন সময়ের নির্মম বাস্তবতার প্রতীক। তখন এমন এক সময়, যখন প্রেমের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা।

আরও পড়ুন

উপন্যাসে ছাত্র আন্দোলনের দৃশ্যগুলো অত্যন্ত জীবন্তভাবে উঠে এসেছে। শহীদ দিবসকে ঘিরে ছাত্ররা খালি পায়ে রাজপথে নামছে, কালো ব্যাজ ধারণ করছে এবং সভা–মিছিল করছে। তাদের দাবি, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং ভাষাশহীদদের যথাযথ মর্যাদা প্রদান। কিন্তু শাসকগোষ্ঠী এসব কর্মসূচিকে ভয় পায়। মিছিলের ওপর নেমে আসে পুলিশি দমন, গ্রেপ্তার হয় অসংখ্য ছাত্রছাত্রী। রাজপথ থেকে জেলখানা সব জায়গাতেই ছড়িয়ে পড়ে প্রতিবাদের উত্তাপ।

এ প্রসঙ্গে উপন্যাসের একটি সংলাপ বিশেষভাবে স্মরণীয়। অসংখ্য ছাত্রছাত্রীকে জেলে বন্দী করা হয়েছে। বন্দীদের সংখ্যা এত বেশি যে জেল কর্তৃপক্ষ বিরক্ত হয়ে ওঠে। তখন এক বন্দী উচ্চারণ করে, ‘এতেই ঘাবড়ে গেলেন নাকি? আসছে ফাল্গুনে আমরা কিন্তু দ্বিগুণ হবো।’ এই কথা একটি প্রজন্মের অদম্য বিশ্বাসের প্রতীক। দমন–পীড়নের মুখেও তারা বিশ্বাস করে প্রতিবাদ থেমে থাকবে না; বরং আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসবে। ফাল্গুন তাই এখানে কেবল একটি ঋতুর নাম নয়; এটি নবজাগরণের প্রতীক ও সংগ্রামের প্রতীক।

জহির রায়হানের লিখনশৈলী এই উপন্যাসে অত্যন্ত সংযত, কিন্তু শক্তিশালী। তিনি ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে সরাসরি রাজনৈতিক বক্তৃতায় পরিণত না করে ছোট ছোট দৃশ্য, সংলাপ ও চরিত্রের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সেই সময়ের আবহ নির্মাণ করেছেন। ফলে পাঠকের কাছে এটি ইতিহাস অনুভবের এক জীবন্ত জগৎ তৈরি করে। ‘আরেক ফাল্গুন’ নামটিও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। ফাল্গুন মানেই বসন্ত, নতুন সূচনা। কিন্তু এই উপন্যাসে ফাল্গুনের অর্থ আরও বিস্তৃত—এটি প্রতিরোধের ঋতু, সাহসের ঋতু। যখনই অন্যায় বাড়ে, তখনই ইতিহাসে আরেকটি ফাল্গুনের প্রয়োজন হয়। এই উপন্যাস যেন সে কথাই মনে করিয়ে দেয়।

আজকের সময়েও ‘আরেক ফাল্গুন’ পড়লে মনে হয়, ইতিহাসের সেই উত্তাল দিনগুলো যেন এখনো দূরে সরে যায়নি। কারণ, ভাষা, সংস্কৃতি ও ন্যায়ের প্রশ্নে তরুণদের ভূমিকা সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ।

শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়