স্মৃতির ঝাঁপিতে অমলিন ছড়াসম্রাট সুকুমার বড়ুয়া

একুশে পদকপ্রাপ্ত ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়াছবি: সৌরভ দাশ

পল্লিবাংলার সৃজনশীল মানুষেরা সব সময় অবহেলা, উৎসাহ ও অনুপ্রেরণাবিহীন পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। অনেকে তাঁদের দিকে মুখ তুলেও তাকায় না। অনেক সময় দেখা যায়, সৃষ্টিশীল মানুষগুলো একসময় তাঁর জিয়নকাঠির আলো ছড়িয়ে কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন। সাহিত্য-সংস্কৃতিকে অমরত্ব দান করতে হলে তাঁদের নতজানু হয়ে শ্রদ্ধা করতে হয়, ভালোবাসতে হয়। তাঁদের জীবনের বিস্মৃত অধ্যায় স্বজাতির সাহিত্য-সংস্কৃতির অতীত উপলব্ধি করতে হয়। অধ্যয়ন জীবন থেকে ছড়ার আইকন সুকুমার বড়ুয়ার ছড়া পড়ে বড় হয়েছি।

অনেক পড়ে জানলাম, কীর্তিমান ছড়ার জাদুকর সুকুমার বড়ুয়ার জীবনকথা। তাঁকে জানার তৃষ্ণার্ত পিপাসা পেয়ে বসল। গুণী মানুষটির সঙ্গে কিছু স্মৃতিও রয়েছে।

শৈশব ও ব্যক্তিগত জীবন
সুকুমার বড়ুয়া ১৯৩৮ সালের ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার বিনাজুরি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা সর্বানন্দ বড়ুয়া, মা কিরণবালা বড়ুয়া। বাবা ছিলেন খেটে খাওয়া সরল মানুষ। নিষ্পেষিত পরিবারে বেড়ে ওঠা শিশু সুকুমার বড়ুয়ার পড়ালেখার হাতেখড়ি মামাবাড়িতে প্রথম শ্রেণি পর্যন্ত। পরবর্তী সময়ে বৌদ্ধবিহারে, সেখানে তৃতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হতে পারেননি। তিনি বলতেন, ‘আমি আড়াই ক্লাস পর্যন্ত পড়ালেখা করে পড়ালেখা করেছি।’

বৌদ্ধবিহারে একটু এদিক-সেদিক হলে শিক্ষার্থীদের প্রহার করা হতো। অধ্যক্ষের মার খেয়ে সেখান থেকে মায়ের কাছে ফিরে যান সুকুমার বড়ুয়া। পেটের সন্তানকে কেউ মারুক, পৃথিবীর কোনো মা সহ্য করতে পারেন না। মা শিখিয়ে দিয়েছিলেন, ‘বিহার থেকে কেউ নিতে এলে তুই বলবি, অনাহারে মরে যাব, তবু বিহারে যাব না।’

গ্রামের বাড়িতে চুলোয় আগুন জ্বলত না। অনেকটা নুন আনতে পানতা ফুরানোর মতো অবস্থা। পরিবারে অভাব-অনটন দেখে সুকুমার বড়ুয়া ১৯৪৯ সালে রাউজান থেকে চট্টগ্রাম শহরে চলে আসেন। অভাবে তাড়নায় পেটে-ভাতে অনেকটা থাকা-খাওয়ার বিনিময়ে মানুষের বাসায় কাজ শুরু করেন। শিশুদের দেখাশোনা, মেসে রান্নাবান্না করা, চা দোকানে বয়ের চাকরি, মাটি কাটা, লবণের মিলে কুলিগিরি, পত্রিকা ও আইসক্রিম বিক্রিসহ নানা কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বিবাহিত। স্ত্রী ননী বালা বড়ুয়া, এক পুত্র অরূপ রতন বড়ুয়া এবং তিন মেয়ে চন্দনা বড়ুয়া, রঞ্জনা বড়ুয়া ও অঞ্জনা বড়ুয়া।

আরও পড়ুন

সাহিত্যাঙ্গনে বিচরণ
সুকুমার বড়ুয়া মামার বাড়িতে ছেলেবেলায় যোগীন্দ্রনাথ সরকারের ‘হাসি-খুশি’ বই পড়ে বেশ আনন্দ পেয়েছিলেন এবং বইটি মুখস্থ করে ফেলেন। চট্টগ্রামে যখন বাসাবাড়িতে কাজ করতেন, কাজের ফাঁকে একটু অবসর পেলে বই নিয়ে বসে যেতেন। সুনির্মল বসুর ‘হুলুস্থুল’, দৈনিক আজাদ পত্রিকার ‘মুকুলের মাহফিল’ এবং বিভূতিভূষণ, শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কবি কাজী নজরুল ইসলামের বইসমূহ পড়ে একসময় সাহিত্যাঙ্গনে নিজেকে বিস্তৃত পরিসরে প্রকাশ করেন।

১৯৫৮ সালে দৈনিক সংবাদের খেলাঘর পাতায় ‘বৃষ্টি নেমে আয়’ ছড়া প্রকাশিত হয় এবং ছড়া লেখা প্রতিযোগিতায় তৃতীয় পুরস্কার লাভ করেন। পরে লেখেন ছড়া ‘ঠিক আছে’।

একসময় সুকুমার বড়ুয়া তৎকালীন সাবরেজিস্ট্রার ও দৈনিক জমানা পত্রিকার সম্পাদক কথাশিল্পী মাহাবুব উল আলমের কাছে একটি দীর্ঘ ছড়া নিয়ে যান। মাহাবুব উল আলম তাঁকে উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন, ‘যখন বাবুর্চির কাজ করবে, তখন ঠিকঠাকমতো করবে। আর যখন লিখতে বসবে, তখন তুমি পৃথিবীর আর সব বড় কবির মতোই।’

১৯৬০ সালের দিকে সুকুমার বড়ুয়া ঢাকায় চলে আসেন। প্রথম দিকে সাংবাদিক দেবপ্রিয় বড়ুয়ার রুমমেটসহ বেশ কয়েকজনের মেসে রান্নার কাজ করতেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র ৬৪ টাকা মাসিক বেতনে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী পদে যোগদান করেন। ছোট পদে চাকরি করলেও তাঁর যে প্রজ্ঞা এবং ভালো ছড়া লেখার গুণ, সেটি অনেকের নজরে আসে। তার পর থেকে সবাই তাঁকে সম্মান করতেন। পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিভবনের সহকারী স্টোরকিপার পদে চাকরি থেকে ১৯৯৯ সালে অবসর গ্রহণ করেন।

সদা হাস্যোজ্জ্বল সহজ–সরল বিনয়ী মানুষটি তাঁর জিয়নকাঠির আলোয় জাদুকরের মতো একের পর এক ছড়া লিখে চারদিকে বেশ হইচই ফেলে দেন। শিশুতোষ ছড়া লিখেও কবি–সাহিত্যিক ও পাঠকের কাছে তিনি বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।

ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়ার ১৮টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ‘পাগলা ঘোড়া’ (১৯৭০), ‘ভিজে বেড়াল’(১৯৭৬), ‘চন্দনা রঞ্জনার ছড়া’, ‘এলোপাতাড়ি’, ‘নানা রঙের দিন’, ‘সুকুমার বড়ুয়ার ১০১টি ছড়া’, ‘চিচিং ফাঁক’, ‘কিছু না কিছু’, ‘প্রিয় ছড়া শতক’, ‘ঠুসঠাস’, ‘ছড়া সমগ্র’ প্রভৃতি। তাঁর লেখা কয়েকটি ছড়া প্রাথমিক পাঠ্যপুস্তকে স্থান পেয়েছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘এমন যদি হতো’, ‘শব্দদূষণ’, ‘মুক্তিসেনা’ প্রভৃতি।

সমগ্র বাংলাদেশে সুকুমার বড়ুয়া পরিচিত হন একজন জনপ্রিয় ছড়াশিল্পীর কারিগর হিসেবে। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় তিনি বেশ কিছু ছড়া লিখেছেন। ‘কোয়াল খাইয়ে’(২০০৬) নামে তাঁর একটি আঞ্চলিক ছড়াগ্রন্থও রয়েছে।

সুকুমার বড়ুয়ার সঙ্গে লেখক।

সুকুমার বড়ুয়ার সাহচর্য পাওয়া
২০০৯ সালে সুকুমার বড়ুয়ার সঙ্গে প্রথম পরিচয়। পরে ‘টইটম্বুর’–এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, অমর একুশে বইমেলা, চট্টগ্রাম একাডেমি এবং চট্টগ্রাম সমিতির মেজবান অনুষ্ঠানে দেখা হতো, কথা হতো। ২০১০ সালে সুলতানা কামাল মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্স মাঠে চট্টগ্রাম সমিতির মেজবান ও মিলনমেলায় তিনি লাঠিতে বড় করে গুটি গুটি পায়ে হেঁটে এসেছিলেন। কাছে গিয়ে দাদাজি কেমন আছেন বলে পা ছুঁয়ে সালাম করাতে বুকে জড়িয়ে নিলেন। হাঁটতে পারছিলেন না। আমার হাত শক্ত করে ধরলেন। আমি বললাম, ‘দাদু, আপনার হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে।’ তিনি হেসে বললেন, ‘না।’

সুকুমার বড়ুয়াকে নিয়ে খাবার টেবিলে বসিয়ে দিয়েছিলাম। তিনি অল্প পরিমাণ খাবার খেলেন। রাজধানীর বুকে চাটগাঁইয়াদের মিলনমেলা দেখে চোখেমুখে কী আনন্দ। এ জন্য তিনি লিখেছিলেন, ‘ওরে দেশর ভাই, খুশির সীমা নাই/ জলদি আইয়ু সাজিগুজি মেজ্জান খাইবাল্লাই/ বদ্দা আইবো বদ্দি আইবো, মামু জেডা-জেডি/ ঢাকার ভিতর চাটগাঁইয়া যত বেডাবেডি/ বেয়াগগুনে খুশি হইবা ইষ্টিকুডুম পাই।/ জলদি আইয়ু সাজিগুজি মেজ্জান খাইবাল্লাই।’

সম্মাননা ও অর্জন
সুকুমার বড়ুয়া জীবদ্দশায় পেয়েছেন জাতীয় সম্মাননা। তিনি ১৯৭৭ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার এবং ২০১৬ সালে রাষ্ট্রীয় একুশে পদকে ভূষিত হন। ২০০৬ সালে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব সম্মাননাসহ বিভিন্ন সাহিত্য সংগঠন, ক্লাব, পত্রিকা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একাধিক সম্মাননা ও পুরস্কার পেয়েছেন।

গ্রামের বাড়ি ‘শুভালয়’–এ নিজ উদ্যোগে গড়েছেন একটি নান্দনিক সুকুমার পাঠাগার।

ছড়াসম্রাট সুকুমার বড়ুয়া দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন। ২ জানুয়ারি সকাল ৬টা ৫৫ মিনিটে রাউজানের গহিরায় একটি বেসরকারি হাসপাতালে অগণিত ভক্ত ও পাঠককে কাঁদিয়ে না–ফেরার দেশে চলে যান তিনি। ৫ জানুয়ারি তাঁর জন্মদিনে রাউজানের বিনাজুরি গ্রামে তাঁর শেষকৃত্যানুষ্ঠান হয়।

সুকুমার বড়ুয়া নানা রঙের ফুলের পরে আর কখনো বসবেন না চুপটি করে, খেয়ালমতো নানান ফুলের সুবাসও নেবেন না। তাঁর ছড়ায় বলতে হয়, ‘এমন হবে কি?/ একটি লাফে হঠাৎ আমি চাঁদে পৌঁছেছি’। ওপারে জোছনার ফুল হয়ে ফুটে থাকুন তিনি অনন্তকাল। প্রিয় ছড়া জাদুকর ছড়ার ছবি হয়ে রবেন হৃদয়ে নীরবে–নিভৃতে মম।

বন্ধু, চট্টগ্রাম বন্ধুসভা